সমাজ সচেতন কথাশিল্পী মোহিত কামাল

মোস্তফা হায়দার

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
49

আমার সৎ মা খুব সুন্দরী। জোয়ান। পা টিপে টিপে উঠত। দরজা খুলে বাইরে যেত। যাবার আগে একবার ভাল করে দেখে নিত আমাকে। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম বিছানায়।
কাশেম আলী মা কে আগ বাড়িয়ে নিত। চুপি চুপি যেতো গোলাঘরের পেছনে, বেশ সুন্দর নিরিবিলি স্থান। পা টিপে টিপে একদিন আমি আবছা অন্ধকারে কাছ থেকে লুকিয়ে ওদের দেখি। ছি! কী জঘন্য আমার সৎ মা। মা বলে ডাকতে আমার শরীর ঘিন ঘিন করে ওঠে। প্রথম দেখার পর আর কখনো তাকে মা বলে ডাকিনি।
চমৎকার এক অনুষঙ্গের হাত ধরে মানুষ গল্প বলে। গল্পের ভেতর নাতিপুতিদের বসিয়ে রাখার কৃতিত্ব কিন্তু দাদা দাদীর বলন প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। গল্পের রসদ শোনতে শোনতে স্রোতামাত্রই নীরবতার চাদরে আবদ্ধ হতে হতে ডুবে যান নিজেদের প্রাত্যহিক নষ্টালজিয়ার কাননে। এমনসব চরিত্র আশপাশের পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠে। ঘটে যাওয়া অথবা ঘটমান ঘটনার সামিয়ানার নীচে বসে যেকোন গল্পের অবতারণা করা সহজ হলেও পাঠকের ভেতরের অনুরণন জয় করার মানসচিত্র উপস্থাপনই আসল দক্ষতা।
আমাদের লিখিয়ে গল্পের শরীরের যখন ছোট ছোট বাক্যপ্রাণ হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটার মতো দোল খাওয়াই তখনই একজন গল্পকার পাঠককে বসিয়ে রাখে পঠনসারিতে। ছোট বাক্য এবং সহজ শব্দের অবতারণা কিন্তু স্রোতাদের মনরঞ্জনে ভাল ভূমিকা রাখে। পাঠক পুলকিত হন। সঞ্চার হয় দৃঢ়তার এক মন্থনক্রিয়া। গল্পের আদলে গল্প বলা আর পাঠক ও সমাজের দ্বায় নিয়ে গল্প বলার মাঝে ব্যাপক ফারাক পরিলক্ষিত হবেই। গল্পের চিত্রপাঠ দাঁড়িয়ে যায় আপনখোলসে। লেখক মাত্রই কারুশিল্পের একচিত্রকর হয়ে হাজির হয় সময়ের কাছে। উপরের লাইনগুলো চাঁদমুখ লেখক কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল এর বিষ নামক গল্পের একটি অনুষঙ্গ। উক্ত গল্পে মানুষ ও পরিবারের বিষাক্ত ছোবলের ঈঙ্গিত করেছেন লেখক। সাপের বিষের চেয়ে সহধর্মিণীর পরকীয়ার বিষাক্তছোবল হলো কাল নাগিনী অথবা গোঘরার চেয়ে বিষাক্ত। স্ত্রীর নিজের যৌন স্বার্থ চরিতার্থতার মানসে স্বামীকে কত নির্মমভাবেই না হত্যা করে। ছলনার কোন আপোস নেই। মৃত্যুর সাথেও তারা ছলনার আশ্রয় নেয়। সাপের কামড়ের কথার সুযোগ নিয়ে কাশেম আলী আর গল্পের সৎ মা দুজনে ব্লেড দিয়ে উরুর নীচে পুরোটাই কুচি কুচি কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সময়ের কিছুটা ক্ষেপণ দেখে কিশোরীর বুঝতে বাঁকি থাকে না যে, নিতান্তই এক বিষকাটালীর বিষের কাছে গল্পের নায়ক তথা বাবার মৃত্যু হয়।
প্রতিটি মানুষ গল্পের হাত ধরে বেড়ে ওঠে। আর গল্পকার মাত্রই মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কথার পিঠে চড়িয়ে আদর যত্নের সাথে গতিশীল করে সময়ের আয়নার তোলে দেন। এ দেয়ার মাঝে লেখকের কৃতিত্বের চেয়ে পাঠককূল এবং সময় সচেতনতার বিষয়ও নির্ভর করে। কথা সাহিত্যিক মোহিত কামাল তাঁর প্রতিটি গল্পের চরিত্রের বয়ানে এক ধরনের পার্শ্বতা রাখতে চেষ্টা করেছেন। নীতিবাক্যের মতো সমাজ পরিবর্তনের রূপরেখা অংকন যেন তাঁকে ভর করে আছে। প্রযুক্তির উচ্ছ্বাস আর দূরবর্তী প্রভাব যেন অনেক সময় মানুষের নেগেটিভ আচরণের সমীকরণ হয়ে দাঁড়ায় এবং নিতান্তই দায়ভার নিয়ে নুয়ে যায় সমাজের কাছে। ুশোনো, আমরা ভ্রূণ ব্যাংক করব। প্রয়োজনীয় ভ্রূণ কিংবা ভ্রূণাংশ থেকে সৃষ্ট নতুন ভ্রূণ সংরক্ষণ করব। ক্লায়েন্টরা পছন্দমাফিক ভ্রূণ নিয়ে নিজেদে জরায়ুতে স্থাপন করে অভিন্ন সন্তান লাভ করতে পারবে।অভিন্ন অসংখ্যরসন্তান লাভের ফলে চারদিকে গ্যাঞ্জাম লেগে যেতে পারে। লোকালয়ে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে। চড় গল্পটিতে লেখক মূলত বিজ্ঞানের প্রভাবে মানুষ যে কৃত্রিমতার দিকে ধাবিত হয়ে একিভূত সময়কে ভাঙছে সেটাই যেন ক্লীয়ার করতে চেয়েছেন। যেমন একই পিতা মাতার ঔরসের সন্তান কত রকমের খাচলত বহন করে চলে! সেখানে বিজ্ঞানের প্রভাবে টেস্টটিউব বেবীর জন্মদান পরবর্তী সময় নিশ্চিত বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হচ্ছে এমনটাই লেখকের অন্তর্দৃষ্টি। লেখক মানে সময় ও সমাজ সচেতন হতেই হয়। যেহেতু সে সমাজে বসবাস করা এক প্রাণী। সময়কে ধারণ করা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের এক বাহুবল। তাই লেখক ভাবতে বাধ্য হন পরিবর্তন অথবা বিবর্তনের চালচিত্র আঁকতে।
লেখক যখন একজন ডাক্তার হন তখন নৈতিকতার মননে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বলয়ে থেকে সমাজের চিকিৎসার উপশম খোঁজেন। খোঁজেন কথার পিঠে কথার এন্টিবায়োটিক আবিস্কার করে। নিরাময়ের আবিস্কারে এক্সরে করার মানসে তোলে ধরেন আসল অথবা বাস্তবতার লেশমাত্র।যেটুকু হলেই সিমটমে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে একটি মাধ্যম।সমাজের অসঙ্গতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ালে একজন লেখক তাঁর প্রফেশনাল বিষয়ের সাথে দ্বন্দ্ব করে বসেন। সত্যকে লালনের প্রয়াস হয়ত বলতে বাধ্য করে। ওরা বেঁচে থাক্থে গল্পের ভেতর লেখকের অন্তর্জ্বালা হলো- মারণাস্ত্র হাতে একদল বেপরোয়া তরুণ হাসপাতালের পেছন থেকে ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েছে,বিভিন্ন পয়েন্টে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। নিমিষেই ত্রাস সৃষ্টি করে পুরো এলাকার দখল নিয়েছে তারা।
সন্ত্রাস অথবা রাজনীতির বাহুবল যখন চতুর্পাশ গ্রাস করে সম্মুখে শেষ করে দেয় একটি জীবন্ত স্বপ্নের পৃথিবী তখন আর আইন কানুনরা কথা বলতে পারে না, পারে না ফিরিয়ে দিতে বিশ্বাসের থলে। শুধু আশ্বাসের ধ্বনি কাঁধে নিয়ে বেঁচে থাকাটাই বাস্তবতা। এ রকম অযাচিত ঘটনা অহরহ প্রাত্যহিক কাজের মতো সমাজের আনাচে কানাচে ঘটেই চলেছে। এসব নিস্তার না হলেও লেখক নিজের দায়ভার আদায় করতে সচেষ্ট ছিলেন সমাজের আয়নায় তোলে ধরতে।
একজন গল্পকার সমাজের মাঝে বসবাস করা জীবও বটে। পঞ্চইন্দ্রিয় অনুভূত প্রাণী বলে সে সমাজের যাপিত ঘটনার নীরব স্বাক্ষ্য বহন করতেই হয়। আর সে ঘটনাগুলোর ভেতর নির্যাস অনুধাবনক্রিয়ার তরিতে বহন করে প্রজন্মের কাছে জানান দিতে জানার নামই একটি শিল্প। শিল্পের কাছে কোন না কোন ভাবে আমাদের দ্বারস্থ হতেই হয়। ভর করা সময়গুলো হেসে ওঠে লেখকের ভাষা আর বুননশৈলির উপর। স্রস্টার দেখানো লীলার ঘরে বসবাস করে মানুষ যখন সীমালঙ্ঘনের হাতিয়ার তোলে নেন তখন প্রকৃতির অভিশাপ! ু প্রকৃতির রুদ্ররোষ সইতে পারে না কোমল মাটি, ঝপাৎ করে ভেঙে পড়ে। দানবীয় নদী গিলে খায় জনপদ, লোকালয়, স্কুল, কলেজ, হাট-বাজার-বন্দর। ঘোলাটে পানির ঘূর্ণির টানে চলে যায় সব, সমূলে উৎপাটিত হয় বুকের শেকড়চ ্তুচারপাশ যখন ভাঙতে থাক্থে গল্পটি নেহায়াত একটা জনপদের কথা হলেও নিতান্তই লেখকের জন্মস্থান সন্দ্বীপের পশ্চিমপাড় তথা মেঘনার ভয়ালগ্রাসটার কথা বলতে চেয়েছেন। গল্পের ভেতর চরিত্রে লেখক চারপাশে ভেঙ্গে যাওয়া, ক্ষতে হওয়া, বিলীন হওয়া জনপদের কথা বলতে গিয়ে একজন মাস্টার মোশারফ ভূইয়ার হাত ধরে অংকন করেন প্রতিবাদ ও অধিকারের রেখাচিত্র। গল্পে মাষ্টারের বউ মা সন্দ্বীপ ফেরিঘাটে কোন জেটি নেই বলে সে ঘাট থেকে ফেরত যেতে বাধ্য হয়। ছেলে আজাদ নির্দয়ের মতো অসুস্থ বাবার কাছে পত্রের মাধ্যমে বউ এর ফেরত যাওয়া কাহিনী তোলে ধরার মাধ্যমে একটি জনপদের করুণ চিত্রই বলে গেলে। বলে গেলেন অধিকারের কথা। আজাদের চিঠি পাঠের পর বাবার অনুভূতি – বুকের ভেতর আবারও মোচর টের পেলেন মোশারফ ভূইয়া। একটু পর চোখ উপচে দরদর করে নামতে থাকল অশ্রুধারা। না, ছেলের প্রতি রাগ আর নেই। বউমার প্রতিও নেই। সত্যিই তো, কী আদিম যুগের কাছে দ্বীপবাসী। আহ!কবে দ্বীপটির উন্নয়ন হবে? ু
এখানেই লেখকের স্বার্থকতা। লেখক নিশ্চয় বিশবছর আগের ঘটনাকে তাঁর গল্পে জায়গা দেয়ায় আজকের মতো সময়ে সন্দ্বীপে জেটির কাজ চলছে। হয়ত প্রজাতন্ত্রের কর্তাবাবুদের চোখে লেখকের ্তুচারপাশ যখন ভাঙতে থাকে ্তুএর করুণ চিত্র পড়ে। তখন লেখকরাই অধিকার আদায়ে সারথি হয়ে উঠেন। গল্প পায় স্থায়িত্ব। লেখক পায় পাঠক ও স্বজনপদের ভালোবাসা। লেখকতো ভালোবাসায় টিকে থাকেন।
লেখক মাত্রই স্বজাতির ভাষা,স্বাধীনতা ও জনপদের চালচিত্র বহন করাই তাঁর প্রধান কাজ। তখন সে জনপদের মানুষ লেখককে ভালবাসতে শেখে। বুকে টেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। গল্পকার মোহিত কামাল গল্পের ভেতর নিপুণহাতে স্বকীয়তা প্রকাশ করতে ভুল করেননি।তাঁর চাঁদমুখ্থ গল্পের পটভূমি জাপানের ভূমি হলেও সেখানে নায়কের চরিত্রের বয়ানে নিজদেশের পরিচয় বহন করিয়ে জানান দিলেন দেশপ্রেম। নায়িকা টিওসা ও ভিন্নদেশের পতাকা হাতে জাপানের একটি প্রোগ্রামে আসলেও সে তাঁর পৈতৃক ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার মতো চিত্র গল্পে অবতারণা করে লেখক দেশের পরিচয়ের প্রকাশ এবং দেশপ্রেমের পরিচয়ও তোলে ধরতে সক্ষম হলেন। গল্পটিতে জাপানের বাস্তবতা, অনুকরণপ্রিয়তা এবং সৌন্দর্যবোধের মাধ্যমে এদেশের পাঠকদের শিক্ষা দেয়ার মতো বেশকিছু তথ্য সন্নিবেশিত। জাপানের এগিয়ে যাওয়া এবং তাঁদের নিয়মানুবর্তিতাসহ দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের অনেকচিত্র তোলে ধরে এ দেশের জনপদের শিক্ষা নেয়ার উপকরণও বটে।
এ লেখকের অসংখ্য সুখপাঠ্য গল্প আছে, যেগুলো পাঠ করলে নিশ্চিত পাঠক উপলব্ধিতে মেতে ওঠে জাগতিক পরিধির কাছে সমৃদ্ধ হবে। যেমন-এক দিনের বউ, কালো মেয়ে, জোছনা রাতে বাড়িয়েছি হাত, লালবাতি, দুই পা, বিয়ে, এসো আমার ঘরে এসো এবং লটারি’র মতো মজাদার বেশ কিছু গল্প সময় সচেতন এবং বাস্তবদিনের খোলস বহন করা।
গল্পগুলোর আয়নায় ভাসতে থাকে নিত্যদিনের খুনসুট এবং জীবনপ্রণালীর সূত্রনালি। মানুষ বেঁচে থাকে মনোবিলাসের হাত ধরে। চোখাচোখি সময়ের পিঠে ভর করে লেখকরা তোলে ধরেন ভুলত্রুটি এবং শোধরানোর মানসক্রিয়া।গল্পের আদলে বলতে বলতে এ লেখক লিখে গেছেন ক্রোধ এবং ছলনার যতো রূপরেখা। যেখানে আছে পরিবর্তনশৈলীর এক নতুন চিত্রসমূহ । মানুষ বাঁচে আশায় এবং ভালোবাসায়। আমাদের এ লেখক চেষ্টা করেছেন মানুষকে আশায় এবং ভালোবাসার মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে ।
কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল ছোট ছোট ও সহজবাক্যে গল্পের বয়ান ভালই চালাতে পারেন। তাঁর গল্পগুলোতে সমাজের চিত্র, বাস্তবতার মিশেল এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়ে আসছে। ছোটগল্পের প্রাণ হচ্ছে শেষ হইয়াও হইল না শেষ। তাঁর গল্পগুলোতে আমরা সেরকমটাই গন্ধ পাই। তাঁর গল্পের আর একটি বিশেষত্ব আমার ভাল লেগেছে যে, মেয়ে – ছেলেদের বেশীদূর এগুতে দেন না। গল্পের সৌন্দর্যে তিনি থিতু হতেন। যৌনতার সুরসুরির লাগাম টানতে সচেতন ছিলেন। নিজেকে সংযত রাখতে পারার মাঝে পাঠকের আস্থা,সুন্দরের চর্চা এবং প্রজন্মের বেড়ে ওঠা।

x