সমাজ বাস্তবতার অনুপম চালচিত্র বদরুননেসা সাজুর গল্পগ্রন্থ ‘জেগে ওঠার দিন’

বিপুল বড়ুয়া

শুক্রবার , ২৬ জুলাই, ২০১৯ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
30

জাগতিক জীবনের সৌরভ-মৌতাত, স্মৃতি-বিস্মৃতি অতসব নিয়ে মানুষের পথচলা। কখনো প্রাপ্তি-কখনো অপ্রাপ্তি, নিজের ভেতর নানা টানাপোড়েন মানুষকে জীবনের অর্থময়তার যখন মুখোমুখি করে তোলে-তখন তার বুক জুড়ে জেগে থাকে মধুরতা কিংবা দীর্ঘশ্বাসের অধীর ব্যাকুলতা। আর একজন লেখক যখন জীবনের এই বর্ণ-বিবর্ণ চালচিত্রের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন তার লেখনিতে-তার অবলোকন-বিশ্লেষণে, তখন সে লেখককে সাধুবাদ জানাতেই হয়। জীবনের নানা রং-নির্যাস তুলে উপস্থাপন করার যে শ্রম সাধনা তার প্রেক্ষিত নিয়ে সত্যি ভাবতে হয়।
আমাদের লেখালেখির অঙ্গনের প্রিয়মুখ বদরুননেসা সাজু’র সামপ্রতিক প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘জেগে ওঠার দিন’ এর সুপাঠ্য গল্পগুলো পাঠ করে উপরোক্ত বিষয় বক্তব্যের যথার্থ সাক্ষ্য মেলে। এ গল্পগ্রন্থে সময়-সময়কালের বিষয় ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চলমান সমাজের নানা দিকপ্রান্তের বেশ কিছু প্রতীকী মুখের জীবনযাপনের-যাপিত জীবনের কথামালার সঙ্গে পাঠককে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন লেখক। যেসব ঘটনা-ঘটনাপ্রবাহ চিন্তা কিংবা অনুচিন্তা নিয়ে আমরা প্রায়শ ভাবিত হই- যে সবের সমাধান খুঁজতে বাদ প্রতিবাদ করতে আমরা প্রতিনিয়ত বিশ্রস্তও হই।
কুশলী গল্পকার বদরুননেসা সাজু’র জেগে ওঠার দিন’ গল্পগ্রন্থে এই তো জীবন, গ্রাম প্রতিবেশ ও সায়মাদের এগিয়ে চলা, ঝড়োপাখির সমুদ্র হৃদয়, অদেখা কলমী বন্ধু ও পরদোষ আসক্তির বক্রদৃষ্টি, জীবন কথা, বাড়ির পাশে, বিবর্ণ দহন, যাত্রাপথ-জলসূর্যের বর্ণময়তা ও প্রবাল রাজ্যের গল্প, সুখ দুঃখের ভ্যালেন্টাইন সংবাদ, জেগে ওঠার দিন, রোদেলা এখন কলেজে- শিরোনামে এগারোটি গল্প রয়েছে। যে স্বপ্ন নিয়ে মৃত্তিকা অলোকের সংসারে এসেছিলো তা আজ ধূসর সেই মৃত্তিকার জীবনে। মৃত্তিকা যেনো হাঁপিয়ে উঠছে এ আর এক অলোককে দেখে। (এই তো জীবন)। পুরানো ধ্যান-ধারণার সমাজ জীবনের তিক্ততা পেরিয়ে আলোর ভুবনে পৌঁছতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সায়মা। সে হারবে না। হারাবে ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে। (গ্রাম প্রতিবেশ ও সায়মাদের এগিয়ে চলা)। একজন হিমেল বিজুর স্বপ্নসাধকে ভেঙে- চুরমার করে দিয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে। এখন আর একজন হিমেল বিজুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক বর্ণিল প্রত্যাশা নিয়ে। এ মুহূর্তে কী করবে বিজু। (ঝড়ো পাখির সমুদ্র হৃদয়) জীবনের রঙিন সময়কালের কিছু অগোছালো লেখালেখি স্বর্ণা সৌরভের জীবনকে হঠাৎ কেমন যেনো তছনছ করে দেয়-দুটো জীবনকে ভাবিত করে তোলে। (অদেখা কলমী বন্ধু ও পরদোষ আসক্তির বক্রদৃষ্টি)। শ্বশুর বাড়িতে ফাহিমা অচ্যুৎ। কারো পছন্দ নয় ফাহিমার লেখালেখি উদার মানসিকতা। সবাই চায় সে শুধু ঘরের কাজ নিয়ে থাক। ফাহাদের উদ্ভট আচরণের কাছে হেরে যায় ফাহিমা – জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায়। (জীবন কথা)
রাদিয়া নুর শহরে এসে বিপর্যস্ত। তাকে গ্রামের চেনা পৃথিবী হাতছানি দিয়ে ডাকে। রাদিয়া হাঁপিয়ে ওঠে শহরের ধরাবাঁধা জীবর্নে। তার প্রাণ পড়ে থাকে-গ্রামীণ খোলা আকাশ আলো হাওয়ার পৃথিবীতে। তারপর রাদিয়া সব ছেড়ে ছুঁড়ে ফিরে যায় আবার সেই ছায়াছন্দের মধুর ভুবনে। (বাড়ির পাশে)। হীরার জীবন হতে একসময় হারিয়ে যায় তার প্রিয় মানুষ সোহেল। শিউলি সোহেলের জীবনে এসে ওলাটপালট করে দেয় হীরার অনেক স্বপ্ন। হীরা নিজকে সযত্নে সরিয়ে নেয় সোহেলের জীবন থেকে। আঁকড়ে ধরে থাকে সোহেলের কিছু পুরনো চিঠি। (বিবর্ণ দহন)। জন কোলাহল হতে কিছুটা স্বস্তি পেতে দূরে কোথাও নীল জলরাশির রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির কাছে গভীরভাবে নিজকে সঁপে দেওয়ার কী আনন্দ তা মন প্রাণ ভরে উপভোগের কী কোনো তুলনা আছে ?
বাহার-জান্নাত লাভলী-ছোটমনিরা আজ এক অন্য পৃথিবীতে। ভাসছে আনন্দের জোয়ারে। (যাত্রাপথ, জলসূর্যের বর্ণময়তা ও প্রবাল রাজ্যের গল্প)। রেজু-রেজাকে মনে প্রাণে ভালোবেসেছিলো। রেজাকে নিয়ে ঘর বাঁধার মধুর স্বপ্নও দেখেছিলো। কিন্তু সমাজ সংস্কার তার কিছুই হতে দেয়নি। দীর্ঘ সময় পর রেজা যখন রেজুর জীবনে ফিরতে ব্যাকুল-রেজু তখন তার ভালোবাসাকে গলা টিপে মেরে ফেলে-প্রতিশোধ নেয় অপমানের আর অবহেলার। এই তো মানুষের জীবন। (সুখ-দুঃখের ভ্যালেন্টাইন সংবাদ)। দারুণ অন্তর্দ্বন্দ্বে লেখালেখি ভাবনার তাসমিয়াহ হক মুন। নারীরা বাহিরে -ঘরে নানা সমস্যায় জর্জরিত, বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে কী করে এগোবে সে সৃজনশীলতা-সৃষ্টিশীলতার প্রণোদনা নিয়ে। তার চলার পথে পাশে কাউকে পাচ্ছে না সে। একা এবং একা সে কীভাবে পথ চলবে? কীভাবে জবাব দেবে এ বিরুদ্ধাচরণের? জেগে ওঠার দিন কীভাবে ফিরে আসবে নারীদের জীবনে? কখন নতুন সূর্যোদয় হবে? (জেগে ওঠার দিন)। রোদেলা তার বাবা-মাকে ছেড়ে আরেক সংসারে মানুষ হচ্ছে। কারো কান কথায় কখনো মন খারাপ হলেও রোদেলা আবার একসময় সব বৈপরীত্যকে অগ্রাহ্য করে ফিরে আসে পালক বাবা মার নিবিড় স্নেহ মমতায়। স্নেহের বন্ধন এখানে সব কিছু ছাপিয়ে সত্য হয়ে ওঠে রোদেলার জীবনে। এখন গভীর স্বস্তি-আত্মতুষ্ঠির নির্যাসে সিক্ত অভিভূত রোদেলা গাজী হৃদি। (রোদেলা এখন কলেজে)।
গল্পকার বদরুননেসা সাজুর গল্পগ্রন্থ ‘জেগে ওঠার দিন’ এর গল্পগুলোর উপর্যুক্ত ঘটনা-কাহিনীর চুম্বক অংশের পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেখক চারপাশের জনজীবন-সমাজ সচেতনতা-বাস্তবতা এবং মানব জীবনের অন্তর্নিহিত বিষয় প্রসঙ্গ নিয়ে অনুপুঙ্খ ভাবিত। সে ভাবনা-অবলোকনের চুলচেরা বিশ্লেষণ। কাহিনি কথা তাই লেখক অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে লেখনিবদ্ধ করেছেন। লেখক গল্প মাত্রেই কোন ধরনের আপসকামিতা কিংবা হালকা চালের দিকে ঝুঁকে পড়েননি। তিনি কলম ধরেছেন-সরল সত্য প্রকাশের জন্য, মানুষের কূটচালকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য, মানুষের হৃদয়বৃত্তির ভালো মন্দ যথার্থভাবে তুলে ধরার জন্য সর্বোপরি সমাজ-সংস্কার-বাস্তবতার নিরিখে দেখেছেন জীবন-জগৎ যন্ত্রণাকে। একজন লেখকের দায়বদ্ধতার স্বরূপ তিনি অতি সচেতনভাবে উপস্থাপন করে মানস জীবনকে তিনি নিষ্কলুষ করার নিখুঁত প্রয়াস পেয়েছেন। এবং এখানেই লেখক বদরুননেসা সাজুর দীর্ঘসময়ের লেখালেখির ভুবনে সংযুক্ত থাকার সৃজনশীলতার জগৎ গড়ে তোলার যথার্থতা প্রকাশ পায়।
গল্পের কৃৎকৌশল, গল্প নির্মিতিতেও চমৎকারিত্ব বেশ চোখে পড়ে লেখক বদরুননেসা সাজুর। কখনো স্মৃতিতে কখনো বর্তমানে আসা যাওয়া করে চরিত্র চিত্রণেও বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন লেখক। কোনো কোনো গল্পে চেনা জানা স্থান কাল পাত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়ে গল্পগুলোকে বেশ আকর্ষণীয় করার প্রয়াস পেয়েছেন যা প্রশংসাযোগ্য বলা যায়। সহজ সরল গদ্য কথায় বর্ণনার টান টান রাশ ধরে গল্পগুলোকে উপভোগ্য করেছেন।
গল্পকার বদরুন্‌নেসা সাজু পেশাগত জীবনে প্রাণিবিজ্ঞানের একজন যশস্বী অধ্যাপক হিসেবে চট্টগ্রাম মহিলা কলেজে অধ্যাপনা পদে কর্মরত আছেন। পেশাগত জীবনের এতো ব্যস্ততার মাঝে ও তিনি সমানে লিখে চলেছেন প্রবন্ধ গল্প কবিতা মরমী সৃজনকথা। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তার লেখালেখির জীবনে ইতোমধ্যে তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ মদিরা (মাইজভাণ্ডারী গীতিগুচ্ছ-১৯৯৮), শব্দহীন রাতের শব্দ (কাব্যগ্রন্থ ২০০০), চিরন্তন পথিকৃৎ (প্রবন্ধগ্রন্থ ২০০০), নিসর্গ আলোর ঠিকানা (কাব্যগ্রন্থ -২০০৩), নারী জাগে কর্মযজ্ঞে আনন্দে কাব্যগ্রন্থ ২০১২), মরমীগান-সাধক পুরুষ ও অন্যান্য (প্রবন্ধগ্রন্থ ২০১৩), মাইজভাণ্ডারী দর্শনের মানসপুত্র কুতুবুল ইরশাদ সৈয়দ নুরুল বখতেয়ার শাহ (র.) জীবন চরিত ও কর্ম পরিক্রমা (জীবনীগ্রন্থ-২০১৬) এছাড়া তাঁর রয়েছে প্রাণিবিদ্যা ফিশারি গ্রুপের প্রজেক্ট গবেষণা- পিকুলিয়ারিটিস অব দ্যা অ্যালিমেন্টারি ক্যানল অব সাম ফ্রেশ ওয়াটার ফিশেস। দীর্ঘসময় লেখালেখিতে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লেখক বদরুননেসা সাজু নানা সময়ে নানা লেখালেখির জন্য সমাজ নিবিষ্ট সংস্থা সংগঠন হতে সম্মানিত হয়েছেন। প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম সাহিত্য একাডেমির একুশে পদক (২০০৬), হাটহাজারী এনায়েতপুর নজরুল একাডেমি সম্মাননা (২০১১) চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ সম্মাননা (২০১৩), সুপ্রভাত সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন সুপ্রভাত শীর্ষ নারী সম্মাননা (২০১৩), দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ কবি ওহীদুল আলম সাহিত্য সম্মাননা (২০১৪) রাহে ভাণ্ডার দরবার এনোবল অ্যাওয়ার্ড (২০১৫), ঐতিহ্য গুণীজন সম্মাননা (২০১৭), কথন সাহিত্য ফোরাম সম্মাননা (২০১৮) তম্মধ্যে উল্লেখ্য।
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সংকলন সাময়িকীতে দীর্ঘ সময় ধরে লিখে চলেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। প্রচারবিমুখ কুশলী লেখক যশস্বী অধ্যাপক বদরুননেসা সাজু। বদরুননেসা সাজুর গল্পগ্রন্থ ‘জেগে ওঠার দিন’ প্রকাশ করেছে শৈলী প্রকাশন। গল্পগ্রন্থের চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন- শিল্পী উত্তম সেন। শোভন মুদ্রণ চৌষট্টি পৃষ্ঠার গল্পগ্রন্থ ‘জেগে ওঠার দিন’ এর মূল্য একশত সত্তর টাকা।

x