সমাজে নীতি আদর্শ জাগ্রত রাখতে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে

বুধবার , ২৯ মে, ২০১৯ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
33

প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে তিনটি- চাকরিজীবী সৃষ্টি করা; সংস্কৃতির ভদ্রলোক সৃষ্টি করা এবং বিবেকবান ও সৃজনশীল মানুষ সৃষ্টি করা। হয়তো প্রথম উদ্দেশ্য অর্থাৎ চাকরিজীবী সৃষ্টি হচ্ছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাকি দুটি পথ অর্জন যে সহজ নয় সেটা অনুমেয়। এদিকে ‘সংস্কৃতিচর্চা’ কথাটি শুনলেই কেউ কেউ মনে করেন, গান-বাজনা, নাচ, কবিতা আবৃত্তি মানেই সংস্কৃতিচর্চা। তারা ভুলে যান, আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। মানুষ যা ভাবে, যা বলে, যা করে সবই তার সংস্কৃতির অংশ। একজন মানুষ, দু’জন মানুষ, দশজন মানুষের চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড দিয়ে যখন সমাজ এগিয়ে যায়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে তাদের সংস্কৃতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটানো বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিতে দুরূহ হয়ে পড়েছে। বন্ধ প্রকোষ্ঠে শিক্ষার্থীরা বন্দি। স্বল্প পরিসরে শিক্ষার্থীরা সীমাবদ্ধ থাকায় তাদের মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। তাদের শিক্ষার পরিসর বৃদ্ধি করতে হবে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে, এই বৈষম্য দূরীকরণে সরকারসহ সকলে সচেষ্ট। একইভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। আর এই বৈষম্য দূর করতে সকলকে একত্রে কাজ করতে হবে। সমাজে সাংস্কৃতিক চর্চা যত বৃদ্ধি পাবে, মানবিক সমাজ ততই পরিপূর্ণতা লাভ করবে।
সংস্কৃতিবান হতে গেলে অবশ্যই জ্ঞানচর্চার সঙ্গে থাকতে হবে। দৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের হতে হবে। হতে হবে মূল্যবোধনির্ভর আত্মবিশ্বাসী ও নীতি-নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন। প্রতিটি প্রথা ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সম্যকভাবে জ্ঞান থাকতে হবে কলা ও মানবিকতার। সবচেয়ে বড় কথা, হৃদয়ের চর্চা করতে হবে। হৃদয়ের গভীর থেকেই অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনা তৈরি হয়, যা সৃজন বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। হেগেল বলেছিলেন, ‘প্রচণ্ড আবেগ ভিন্ন কোনো মহৎ সৃষ্টি সম্ভব হয়নি কোনো কালে।’
ডিজিটাল সংস্কৃতির যুগে ছোট-বড় সবার চোখ এখন মুঠোয় বন্দি। তথ্য বলুন আর বিনোদন- সবই হাতের কাছে। এক সময় স্কুল ছুটি শেষে ছাত্ররা হাতে নাটাই-ঘুড়ি নিয়ে ছুটতো। কখনও গাছে ঝুলে দোল খেতো। এখনকার যুগের ছেলেমেয়েরা সেগুলো শুনলে চোখ বড় বড় করে তাকায়। তারপর মুখ গুঁজে দেয় ছোট পর্দায়। ইট-কাঠের শহরে অবশ্য এর বাইরে ভাবাও দুষ্কর বটে! এ ছাড়া যৌথ পরিবারে এক সময় সবাই মিলে খাওয়া, উৎসবের আয়োজন করা, একজনের সমস্যায় আরেকজনের এগিয়ে আসা ছিল পারিবারিক সংস্কৃতি। এখন অধিকাংশ পরিবারের নিজস্ব জগৎ আছে। বাচ্চা কাঁদলেই এখন তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে মুঠোফোন বা ট্যাব। আধুনিক পরিবারের এই জগৎ অনেক সময় এতটাই অন্তঃসারশূন্য যে সামনের মানুষটি চোখের সামনে কীভাবে বদলে গেল তা বোঝারও সময় হয়ে ওঠে না। তাই আমরা বুঝতে পারি না, কখন ছেলেমেয়ে কী ভালোবাসে!
যাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রার স্পৃহা নেই, এই রুচিবোধ যাদের মাঝে তৈরি হচ্ছে না, তাদের মাঝে তো খুব সহজেই জঙ্গিবাদের চেতনা ঢুকে যেতে পারে। তাই শুধু উচ্চশিক্ষায় নয়, আমাদের উচিত স্কুল-কলেজ থেকেই এই সাংস্কৃতিক চর্চাটা গুরুত্ব দিয়ে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। সবসময় এটাকে ‘এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস’ হিসেবে দেখা হয়েছে। আদৌ তো তা নয়, পরিপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এসব কর্মযজ্ঞে আমাদের সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এগুলো তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, এ শিক্ষাক্রমেই তাই এগুলোকে ‘কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস’ হিসেবে দেখা উচিত। পড়াশোনার একঘেঁয়েমিতে ছেলেমেয়েরা সময় পেলে এরকম সৃজনশীল কিছুতে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। আমাদের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়ে জেলায় উপজেলায় এই কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে দিতে পারে। শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে খুব সহজেই আমরা এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারি। অল্প বয়স থেকেই সবার সুকুমার কলার বিকাশে জোর দেওয়ার গুরুত্ব আমাদের এখনই বুঝতে হবে। ‘বিতর্ক’ হতে পারে এক্ষেত্রে দারুণ এক মাধ্যম। আমাদের যুক্তি দিয়ে জানতে হবে সবকিছুতে, জোর করে যে কোনো কিছু দাঁড়াতে পারে না, এই ধারণা বদ্ধমূল হতে হবে। তাহলেই ছেলেমেয়েদের বিচারিক দক্ষতা বাড়বে। ভিন্ন আদর্শের নামে কেউ উগ্রপন্থা তাদের মাঝে অনায়াসে ঢুকিয়ে দিতে পারবে না। আর এই আদর্শ জাগ্রত করতে পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

x