সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

রবিবার , ২৫ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
61

সমাজে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং। একজন অসুস্থ শিক্ষিকার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে ক্লাব নেতৃবৃন্দ প্রকৃত অর্থে মানবসেবার উজ্জ্বল নজির প্রতিষ্ঠা করলেন। জেলা গভর্নর লায়ন কামরুন মালেক গত ৮ ই আগস্ট এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং-এর প্রেসিডেন্ট লায়ন নিশাত ইমরানের হাতে এই শিক্ষিকার ভরণপোষণের দায়িত্বভার তুলে দেন।
দৈনিক আজাদীতে গল্পকার ফারজানা রহমান শিমুর একটি গল্পের সূত্র ধরে লায়ন্স ক্লাব উক্ত শিক্ষিকার সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করেছে। এবারের লায়ন্স গভর্নরের ডাক হলো: ‘হাসির তরে সেবা’। সেবার মাধ্যমে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁর এবং তাঁর কর্মী বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য।
আমরা মানবসেবা নিয়ে নানা কথা বই-পুস্তকে পড়েছি। বড় বড় মনীষীর বাণী আত্মস্থ করেছি। একটা স্তবক প্রায় অনেকেরই মুখস্ত:
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
মানুষ অন্তরের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শেখে, সেবা করতে শেখে। এ শিক্ষা মানবতার। এ শিক্ষা মানবসেবার। প্রতিটি মানুষ একই রকম জীবন যাপন করতে পারে না। কেউ দিনাতিপাত করে হাসি, আনন্দ, সুখ-ঐশ্বর্যের মধ্য দিয়ে, আবার কেউ দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অনটন, হতাশার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে। একজন মানুষকেই অন্য মানুষের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হয়। মানুষের কল্যাণে জীবনকে উৎসর্গ করার মধ্যে যে সুখ, তা অন্য কোথাও মেলে না।
আমাদের সমাজে যে সব অসচ্ছল, অসহায় মানুষ বিদ্যমান, তার মধ্যে নারীদের অবস্থান একটু ভিন্ন। তাঁরা না পারেন অসহায়ত্ব প্রদর্শন করতে, না পারেন সুযোগ সুবিধা আদায় করতে। এ কথাও আজ দৃঢ়ভাবে বলা যায়, কর্মজীবী ও শ্রমজীবী নারীরা বিভিন্ন সামাজিক, পারিপার্শ্বিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের মুখেও নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন। তাঁদের যেমন নিষ্ঠা রয়েছে, তেমনি রয়েছে দায়িত্ববোধ। সকল স্তরে, শিল্পে ও বাণিজ্যে তাঁরা আজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁদের এই সাফল্যে দেশ ও জাতি সুখ্যাতি অর্জন করছে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলার জন্যে এখনো তেমন কিছু করা হয়নি। এখনো তাঁদের পথ প্রশস্ত নয়। এখনো তাঁরা প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, এখনো তাঁরা হয়রানি ও সহিংসতার শিকার। এজন্য স্বল্প আয়ের কর্মজীবী নারী, অসহায় শিক্ষক ও নানা পেশার নিবেদিতপ্রাণ নারীর সহায়তায় সমাজের মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীর সব দেশেই সকল পেশা ও আয়ের নাগরিকদের গৃহসংস্থানসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সৃষ্টি করা সরকারের, বিশেষ করে নগর কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নগরীর জনজীবনকে সুষ্ঠু, স্বাভাবিক ও গতিময় রাখতে হলে দরিদ্র শ্রেণির দিকে অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে। প্রদান করতে হবে নাগরিক সুবিধা। নগর কর্তৃপক্ষ অনেক সময় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারে না। তখন সচ্ছল নাগরিকদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হয়।
আমরা জানি, গল্প জীবনের কথা বলে। কাহিনীর বিন্যাসে বৈচিত্র্য আনার জন্য গল্পকার নানা জায়গায় তাঁর কল্পনা ও স্বপ্নকে হয়তো রাঙিয়ে নেন, তবু একটা বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তাঁদের চেষ্টার ত্রুটি থাকে না। ফারজানা রহমান শিমু সেই চেষ্টাই করেছেন তাঁর প্রকাশিত গল্পে। এই গল্প পাঠ করে সমাজের হৃদয়বান মানুষ অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছেন। বয়সে প্রবীণ এই শিক্ষিকার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমরা লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং-এর নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানাই, পাশাপাশি গল্পকারকে জানাই অভিনন্দন। একথা আজ স্মরণ করতে চাই, মানুষের সেবাব্রতের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। মানুষই বুঝতে পেরেছে বিবেকানন্দের বাণীর মর্মকথা: ‘জীবে প্রেম করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর’। মানুষের ভেতরেই উপলব্ধি এসেছে: ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। মানুষকে এজন্য ত্যাগী হতে হয়, ব্রতী হতে হয় মনুষ্যত্ব অর্জনের সাধনায়।

x