সমর্থন ও বিরোধিতার মুখে আজ তফসিল

ঢাকা ব্যুরো

বৃহস্পতিবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
89

আওয়ামী লীগ, এরশাদের জাতীয় জোট, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্টের সমর্থন, অন্যদিকে বিএনপিকে নিয়ে গঠিত কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রবল বিরোধিতার মুখেই আজ বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন বলছে, সরকারের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তফসিল ঘোষণায় এতে কোন বাধা নেই। কমিশন বলছে, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব দল একমত হয়ে চাইলে তাদের পুনঃতফসিলে কোনও আপত্তি থাকবে না।
আজ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। এর আগে, সকালে কমিশন সভায় সিইসির ভাষণ অনুমোদনসহ তফসিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তফসিলের বিষয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণার জন্য শতভাগ প্রস্তুতি রয়েছে।’ কমিশনার রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা সবকিছু বিবেচনা করেই তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সংলাপ প্রশ্নে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ড. কামাল হোসেনরা সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার কথা বলে তফসিল না দেওয়ার কথা বলছেন। আমার প্রশ্ন, আপনারা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন, তাদের এই সংলাপ কবে শেষ হবে? আর এই সমঝোতার নামে যদি আমরা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তাহলে জাতি কি আমাদের ক্ষমা করবে?’
অবশ্য সবাই চাইলে পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে মন্তব্য করে এই কমিশনার বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে যদি সমঝোতা হয়, আর সব দল সমঝোতায় আসে, তাহলে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে আমরা ভোটগ্রহণের তারিখ কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারি।’ এদিকে আজ বৃহস্পতিবার একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় ইসির প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছে ক্ষমতাসীন
আওয়ামী লীগ। গতকাল বুধবার নির্বাচন ভবনে গিয়ে সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের অবস্থান জানায় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। ১৬ সদস্যের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এইচ টি ইমাম।
আওয়ামী লীগের আগে বিভিন্ন দল ইসিতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে এসেছে। ইসিতে বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, তফসিলের বিষয়ে ইসি যে সিদ্ধান্ত নেবে তার প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। ‘নির্বাচন কবে, কখন হবে, তা ইসি নির্ধারণ করবে। বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণার কথা ইসির, তাতে সরকারের পক্ষ থেকে সমর্থন রয়েছে আমাদের। ইসি স্বাধীন, সাংবিধানিক ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আমরা তফসিল আগানো বা পেছানোর কথা বলিনি। যখনই কমিশন তফসিল দেবে, তা আমরা সহযোগিতা করে যাব।’
তফসিল না পেছালে আন্দোলনের যে হুমকি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রয়েছে তা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ইমাম। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচন কমিশন তাদের বিষয়টি দেখবে; সাধারণ মানুষ তা মোকাবেলা করবে।
বিকালে ইসির সম্মেলন কক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে সিইসি নূরুল হুদা বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন পরিচালনায় কোনো বিষয় যদি আপনাদের কাজে আসে, সে বুদ্ধি আপনারা দিতে পারেন। আমাদের কোনো কথাও যদি আপনাদের কাজে লাগে, সেটা আমরা বলব।’
আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাশিদুল আলম, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য এস এম কামাল হোসেন, রিয়াজুল কবীর কাওছার, গোলাম রাব্বানী চিনু, মারুফা আক্তার পপি, কেন্দ্রীয় নেতা তানভীর ইমাম, ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পী, এনামুল হক চৌধুরী, সেলিম মাহমুদ ও মুস্তাফিজুর রহমান বাবলা।
এদিকে দুই দফা সংলাপে সাত দফার প্রধান দাবিগুলোতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাড়া না পেয়ে এখন আন্দোলন জোরদার করার কথা বলছেন কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। কামাল হোসেন বলেন, ‘আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে, তাদের সঙ্গে নিয়েই দাবি আদায় করা হবে।’ গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপের ফলাফল জানতে চাইলে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা কামাল হোসেন বলেন, একটি অর্থবহ নির্বাচনের আশা নিয়েই তারা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংলাপে গিয়েছিলেন। আমরা তো সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি, করছি, করে যাব, দেশে একটা স্থিতিশীল অবস্থা, একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে সব কিছু হোক। দায়িত্ব তো সরকারের। বল এখন সরকারের কোর্টে।’
এদিকে চলমান সংলাপ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়, সে দাবি জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গতকাল বুধবার বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে এই আবেদন জানিয়েছেন জোটের সমন্বয়ক সাইফুল হক। বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠির কপি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আসেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা আবদুল্লাহ আল ক্বাফী ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নির্বাহী সদস্য খালেকুজ্জামান লিপন। ওই চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছেন। অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য চলমান সংলাপ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সংলাপ শেষ হওয়ার আগে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে তা পুরো প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করার জন্য বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না পেছানোর দাবি জানিয়েছে জাতীয় পার্টি। দলটি বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শেষ হয়েছে। তাই সংলাপের অজুহাতে তফসিল পেছানোর কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ থাকতে পারে না।
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনারকে ৮ দফা দাবিতে বলেছি আগামী ৮ তারিখে তফসিল ঘোষণা করতে। কারণ ইসির হাতে তেমন বেশি সময় নেই। আর অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সাথেও আলোচনা নেই। সংলাপের অজুহাতে তারিখ পেছানোর কোনো যুক্তিকতা নেই। সেই হিসাবে বৃহস্পতিবারেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটের নেতা এইচ এম এরশাদ।
এদিকে রাজশাহীতে জনসভাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টির হলে তা মোকাবেলা করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। গতকাল বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ হুঁশিয়ারি দেন নির্বাচন কমিশন সচিব। তফসিলের পর জনগণের অসুবিধা হয় এমন কর্মসূচি দিতে আচরণ বিধিতে মানা আছে, এ ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব এমন কথা বলেন। বৃহস্পতিবার রাজশাহী অভিমুখে পূর্ব নির্ধারিত রোর্ডমার্চের কর্মসূচি স্থগিত করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তবে বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণা করা হলে কমিশন অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচিও দিয়ে রেখেছেন ঐক্যফ্রন্টের সবচেয়ে বড় দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

x