সমপ্রীতির বান্দরবানে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী বীর বাহাদুর

রতন বড়ুয়া

সোমবার , ৭ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৩:১০ পূর্বাহ্ণ
226

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৭ সাল। তৎকালীন সরকারের আমলে পার্বত্য বান্দরবান থেকে খাদ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান বোমাং রাজ পরিবারের অং শৈ প্রু চৌধুরী। এরপর মাতামুহুরী-সাঙ্গুর জল গড়িয়ে পেরিয়ে গেছে ৩৭টি বছর। কিন্তু বান্দরবান থেকে কোন রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিরই স্থান হয়নি মন্ত্রী সভায়।
অবশ্য, ১৯৯৮ সালে উপমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রথমবার এবং ২০০৯ সালে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বীর বাহাদুরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হলেও মন্ত্রীসভার
বাইরেই রয়ে যায় বান্দরবান। তবে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারী গঠন করা মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রী সভায় জায়গা করে নেন বান্দরবানের সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয় টানা ৫ বার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্যকে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর মন্ত্রী সভায় ঠাঁই হয় বান্দরবানের। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েই যায় বান্দরবানবাসীর। ৬ জানুয়ারি, ২০১৯। অবশেষে এলো সে-ই মহেন্দ্রক্ষণ। এবার আর প্রতিমন্ত্রী নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে নাম এলো বীর বাহাদুরের। ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের লক্ষ্যে ডাক পাওয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নামের এ তালিকা ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ঘোষনার পরপরই খুশির জোয়ার দেখা দেয় বান্দরবান জুড়ে। স্বাধীনতার পর প্রথম বারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পেয়ে খুশিতে যেনো আত্মহারা বান্দরবানবাসী। কেবল বান্দরবান সদরই নয়, লামা, আলিকদম, রুমা, থানছিসহ জেলার ৭ উপজেলাতেই আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি-বাঙালি সকলেই মেতেছে বাঁধ-ভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে। খুশিতে নিজের পকেটের টাকায় মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা গেছে অনেককে। নিজেদের নেতা বীর বাহাদুরের প্রতি আস্থা রেখে প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পাহাড়ি এ অঞ্চলের বাসিন্দারা।
লামা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, আমাদের প্রিয় নেতা বীর বাহাদুরকে দলের নেতা-কর্মী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ ভীষণ ভালোবাসেন। এলাকার উন্নয়নে তিনি নিরলস শ্রম দিয়েছেন। বলতে গেলে উন্নয়নে গোটা বান্দরবানের চেহারাই তিনি বদলে দিয়েছেন। কোন রাজনৈতিক দল এবং ধর্ম-বর্ণের মানুষের প্রতি তাঁর কোন বিদ্বেষ মনোভাব নেই। প্রতিহিংসা পরায়ন রাজনীতিও তিনি কখনো করেন নি। তাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি-বাঙালি সকলেরই তিনি প্রিয় পাত্র। যার কারণে বান্দরবানবাসী তাঁকে বার বার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। এবারসহ তিনি টানা ৬ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী পেলেও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে পেতে আমাদের (বান্দরবানবাসীর) দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল। এবার বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন লামা উপজেলা আওয়ামীলীগের এই সভাপতি।
বান্দরবান জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আশিষ বড়ুয়া বলেন- এমপি নির্বাচিত হয়ে এলাকার জন্য, এলাকার মানুষের জন্য প্রচুর কাজ করেছেন বীর বাহাদুর। বদলে দিয়েছেন বান্দরবানের চেহারা। যোগাযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ প্রায়ই সব খাতে এনেছেন আমুল পরিবর্তন। রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে বদলে দিয়েছেন দুর্গম অঞ্চলের তকমাও। মোটকথা, এক সময় পিছিয়ে থাকা জনপদ বান্দরবানকে গড়ে তুলেছেন আধুনিক বান্দরবান হিসেবে। শুধুই আধুনিক নয়, হানাহানি-মারামারি মুক্ত সমপ্রীতির বান্দরবান গড়ে তোলার শতভাগ অবদানও বীর বাহাদুরের বলে মনে করেন জেলা ছাত্রলীগের এই নেতা। অভিন্ন দাবি আওয়ামীলীগের কর্মী ও লামা উপজেলার বাসিন্দা নিবারণ বড়ুয়ার। তিনি বলেন- উন্নয়নে বান্দরবানের চেহারাই পাল্টে দিয়েছেন বীর বাহাদুর। যার কারণে বান্দরবানের মানুষ দফায় দফায় বীর বাহাদুরকে ভোট দিয়েছেন, এমপি নির্বাচিত করেছেন। এবারের নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বান্দরবানের কান্ডারি হিসেবে তিনি টানা ৬ বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। করেছেন ডাবল হ্যাট্টিক। উনাকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে পেতে এবার তাই আমাদের প্রত্যাশাটাও বেশি ছিল। প্রধানমন্ত্রী অবশেষে আমাদের সে প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়- স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বান্দরবানের রাজ পরিবারের মধ্য থেকেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসছিলো। এটা যেন একপ্রকার রীতি হয়েই দাড়িয়ে যায়। কিন্তু ১৯৮৯ সালে স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান বীর বাহাদুর। ছাত্রলীগের হাত ধরেই যার রাজনীতিতে হাতেখড়ি।
এরপর প্রচলিত রীতি ভেঙ্গে ১৯৯১ সালে বান্দরবান (৩০০নং আসন) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই শুরু, এরপর তার আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯৯১ থেকে শুরু করে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সাল, এই নিয়ে টানা ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই রাজনীতিক। নিজ এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ও দলে ভূমিকার কথা বিবেচনায় নিয়ে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২০০২ সালে তাকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করেন। এরপর ২০০৮ সালে বিপুল জনপ্রিয়তায় মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে পার্বত্যবাসী ধরেই নিয়েছিলেন মন্ত্রীসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন বান্দরবান আসন থেকে পরপর চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য বীর বাহাদুর। কিন্তু সেবারও পূরণ হয়নি পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা। তবে, ২০১৩ সালে তাকে আবারো আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হলে পার্বত্যবাসীদের মাঝে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়।
সেই সূত্রে ২০১৪ সালের নির্বাচনে টানা ৫ম বারের মতো এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মন্ত্রীসভায় ঠাঁই হয় বীর বাহাদুরের। দায়িত্ব পান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সফল ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বীর বাহাদুর। এলাকার উন্নয়নে ছিলেন নিরলস ও সর্বদা সচেষ্ট। ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ও রাজ পরিবারের সদস্য সাচিং প্রু জেরীকে পরাজিত করে টানা ৬ বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তাই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে পেতে বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশাও একটু বেশি ছিল এবার। অবশ্য, এবার আর নিরাশ হতে হয়নি বান্দরবানবাসীকে। প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে ডাক পাওয়ার পর গতকাল আজাদীর সাথে কথোপকথনে নিজের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই মন্ত্রী। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বীর বাহাদুর বলেন, আমি মন্ত্রী হয়েছি। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বান্দরবানবাসীর জন্য একটি উপহার। কারণ, তারাই বারবার আমাকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন। এ জন্য আমি পার্বত্যবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল, একজন পূর্ণ মন্ত্রীর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বান্দরবানবাসীর সে আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন। তিনি আমার নেত্রী। আমার প্রতি অগাধ আস্থা রেখেছেন, টানা ৬ বার আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। সর্বশেষ মন্ত্রীত্ব উপহার দিয়ে বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আধুনিক এবং আরো আকর্ষণীয় অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বান্দরবানকে আধুনিক শহরের রূপ দিয়েছি।
যোগাযোগ, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা এখনো পাইনি, আমার এলাকায় এমন গ্রাম-মহল্লা খুব কম আছে। অনেক দুর্গম এলাকাতেও এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছি। দুর্গম এলাকার প্রতিটি ছেলে-মেয়ে এখন স্কুলে যায়। তাদের জন্য পাড়ায়-পাড়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ সবক্ষেত্রে এলাকায় প্রচুর উন্নয়ন হওয়ার কারনেই বান্দরবানবাসী বারবার আওয়ামীলীগকে, আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে আসছে। এবারও আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায়। তাই আরো ব্যাপক উন্নয়ন-কর্মকাণ্ড হাতে নেয়া হবে এবং বাস্তবায়নও করা হবে। তবে কিছু দুর্গম এলাকা রয়েছে, যেখানে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাদের জন্য এবার আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে জোর দিবো। বান্দরবানে মেডিকেল কলেজ স্থাপনে উদ্যোগ নেবো। সার্বিক ভাবে আগের মতোই যেখানে সুযোগ হবে, সেখানেই উন্নয়নের মাধ্যমে চিত্র পাল্টে দেয়ার কথা জানালেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর ১৯৯৮ সালের ৬ মে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন সংসদে পাস হয়। পরবর্তীতে ১৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও দুই বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য কল্পরঞ্জন চাকমা। স্থানীয়দের তথ্য মতে- খাগড়াছড়ির কল্পরঞ্জন চাকমাই ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) থেকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী। এবার দ্বিতীয় জন হিসেবে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন বান্দরবানের বীর বাহাদুর।

x