সব প্রস্তুতি শেষ, ১৪ আগস্টের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ

পাইপলাইনে আর কোনো সমস্যা নেই

হাসান আকবর

শুক্রবার , ১০ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:২৯ পূর্বাহ্ণ
324

ছয় দফায় তারিখ পিছিয়ে অবশেষে আগামী ১৪ আগস্টের মধ্যে দেশে বহুল প্রত্যাশার এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ শুরু হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ শুরু করার যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হচ্ছে। শুরু হয়েছে গ্যাস কমিশনিং। সাবমেরিন পাইপ লাইনসহ সব যান্ত্রিক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। দফায় দফায় ত্রুটি দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত সব পাইপ লাইনই ঠিকঠাকভাবে কাজ করছে। মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালের ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরানোর পরীক্ষাও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। টার্মিনালের সাথে গ্যাসবাহী জাহাজের পাইপের সংযোগ দেয়া হয়েছে। কমিশনিং প্রক্রিয়া শেষ করে ১৪ আগস্টের মধ্যেই পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হবে।

দেশে গ্যাসের ভয়াবহ আকাল চলছে বহুদিন ধরে। এই আকাল ঘুচাতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই প্রেক্ষিতে মহেশখালীতে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ এবং সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্যাস নিয়ে আসার প্রকল্প তৈরি করা হয়। ইতোমধ্যে মহেশখালীর জিটিসিএলএর স্টেশন থেকে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাইপ লাইন আনোয়ারার সিইউএফএল এর সন্নিকটস্থ পয়েন্টে আনা হয়। আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাটের ন্যাশনাল গ্রিডের পয়েন্ট পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ দেয়ার কথা ছিল গত ২৫ এপ্রিল। কিন্তু সরবরাহ শুরু করার দিন কয়েক আগে তারিখ পুননির্ধারণ করে ১০ মে করা হয়। গ্যাস সরবরাহের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেয়া হলেও নির্দিষ্ট দিনে এলএনজিবাজী জাহাজ চলে আসে মহেশখালীতে। গত ২৪ এপ্রিল এলএনজিবাহী দেশের প্রথম জাহাজ ‘এমটি এক্সিলেন্স’ মহেশখালীর উপকূলে অবস্থান নেয়। জাহাজটিতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯শ’ ঘনমিটার (৬০ হাজার ৪৭ টন) গ্যাস রয়েছে। এই জাহাজটিই এলএনজি টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আগামী ১৫ বছর এই জাহাজটি সেখানে অবস্থান করবে। পরবর্তীতে অন্যান্য জাহাজগুলো এটির পাশে অবস্থান নিয়ে গ্যাস সরবরাহ দেবে। এই টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন অর্থাৎ এলএনজি থেকে গ্যাসে রূপান্তরের ক্ষমতা দৈনিক ৫শ’ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ঘনফুট। দেশে বর্তমানে দৈনিক ৩৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৬৫ থেকে ২৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রামে দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে ৫০ কোটি ঘনফুটের মাঝে ২৫ কোটি ঘনফুট চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে এবং বাকি অর্ধেক ন্যাশনাল গ্রিডে সরবরাহ দেয়া হবে।

উপরোক্ত যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলেও শুধুমাত্র পাইপ লাইনের কারণে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার পাইপ লাইনে কোন সমস্যা না হলেও আনোয়ারা থেকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইনেই যত সমস্যা ছিল। আমেরিকান কোম্পানি এঙিলারেট এই পাইপ লাইন স্থাপন করতে গিয়ে পদে পদে প্রতিকূলতার কবলে পড়ে। সাগরের তলদেশে পাইপ জোড়া দিতে হিমশিম খেতে হয় প্রকৌশলীদের। কোথাও একদিকে জোড়া দিলে খুলে যাচ্ছিল অপরদিক। কোথাও ফুটো তৈরি হচ্ছিল। উত্তাল সাগরের নিচে কাজ করাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই অবস্থায় সব আয়োজন সম্পন্ন হলেও শুধুমাত্র পাইপ লাইনের কারণে গ্যাস সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়নি। প্রথম দফায় ২৫ এপ্রিল গ্যাস সরবরাহ দেয়ার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১০ মে, তৃতীয় দফায় ২৬ মে, চতুর্থ বার ৬ থেকে ১২ জুনের মধ্যে পঞ্চম দফায় দফায় ২২ অথবা ২৩ জুন এবং সর্বশেষ বা ৬ষ্ট দফায় ৪ জুলাই এলএনজি সরবরাহের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই তারিখ পেছাতে হয়েছে।

অবশেষে সব আয়োজন চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার শীর্ষ একজন কর্মকর্তা। গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, পাইপ লাইনের কাজ শেষ। সব কিছু ঠিক আছে। সাগরের তলদেশের পাইপেও আর কোন সমস্যা নেই। ইতোমধ্যে আমরা কমিশনিং শুরু করেছি। আবার টার্মিনালটিকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরানোর একটি পরীক্ষা বাকি ছিল। সেটিও ঠিকঠাকভাবে হয়েছে। এখন আর কোথাও কোন সমস্যা নেই। কমিশনিং প্রক্রিয়া শেষ হলেই গ্যাস সরবরাহ দেয়া হবে। আগামী ১৪ আগস্টের মধ্যে গ্যাস গ্রিডে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গতকাল পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনুসর মোহাম্মদ ফয়েজ উল্ল্যাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। গ্যাসের পাইপ লাইনে আর কোন সমস্যা নেই। সবই ঠিক আছে। গ্রিডে গ্যাস দেয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

x