সব ক’টা জানালা খুলে দাও না

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ
92

‘সব ক’টা জানালা খুলে দাওনা’ এই গানের সুরকার গানের পাখি বুলবুল অকালেই ঝরে গেলেন সব ক’টা জানালা বন্ধ অবস্থায়। আমাদের জন্য রেখে গেছেন অসাধারণ সব গান! সেই রেল লাইনের ধারে মেঠো পথটার পারে দাঁড়িয়ে, মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেবনা, ও মাঝি নাও ছাইড়া দে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য, একতারা লাগেনা আমার দোতারাও লাগেনা দেশাত্মবোধক যত গান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যত গান বেশির ভাগই আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লেখা।
কি অসাধারণ একজন মানুষ! তাঁর এক একটা পরিচয় আকাশ ছোঁয়া। কিছু কিছু মানুষ তাঁদের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, আহমেদ ইমতিয়াজ সে রকমই একজন মানুষ।
তিনি দেশকে ঋণাবদ্ধ করেছেন, দেশের মানুষকে ঋণাবদ্ধ করেছেন। তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। অনেকে বলেন রাজাকারেরা চিরদিনই রাজাকার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা চিরদিন মুক্তিযোদ্ধা নয়! যারা বলেন তাদেরও নিশ্চয়ই একটা যুক্তি আছে। আহমেদ ইমতিয়াজ আমৃত্যু একজন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর গানের স্পর্শে তিনি হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করেছেন, দেশের প্রতি মমতায় অনুপ্রাণিত করেছেন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশের জন্য অসাধারণ সব গান লিখেছেন। আমাদের সিনেমা জগৎকে তাঁর সুর আর গানে সমৃদ্ধ করেছেন। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি। এরপরই হত্যা করা হয় তার প্রিয় ভাই মিরাজকে। তারপর থেকে তাঁর বিপন্ন জীবনকে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারায় রাখতে হয়। একজন শিল্পী এমন বিপন্ন জীবন নিয়ে কীভাবে বাঁচে? গানের পাখি বন্দী খাঁচায় ছটফট করতে করতে উড়ে গেল আকাশে। স্বাভাবিক জীবন পেলে হয়তো আমরা আরও অনেক কিছুই পেতাম এই শিল্পীর কাছ থেকে।
শিল্পীদের স্বাধীনতা না থাকলে তার সৃষ্টি থেমে তো যাবেই। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর কলমকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে মৃত্যু। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বরণ করতে হলো।
বিশিষ্ট সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খান বলেন ‘স্বাধীন দেশে বুলবুল পরাধীন জীবন যাপন করে গেল।’ কোনো এক টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেছিলেন, ‘গানটান গেয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মতো জমিয়েছিলাম। এই ছয় বছরে তাও শেষ। উত্তরায় একটা জমি ছিল তাও বিক্রি করে দিয়েছি জীবন চালানোর জন্য। আমার নিজের পরিবারের সদস্য ছাড়া ছয়জন পুলিশের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয় প্রতিদিন। কীভাবে চলে? সরকার যদি একটু বড় পরিসরে থাকার ব্যবস্থা করত তাহলে একটা গানের স্কুল করে জীবন চালাতে পারতাম।’ আহা! এমন কেন হয়? এমন গুণী মানুষগুলোকে কেন আমরা ধরে রাখতে পারি না? তাঁদের জন্য আমরা অর্ঘ্য সাজাই শুধু মৃত্যুর পরে!
এটা জাতির দুর্ভাগ্য। আহমেদ ইমতিয়াজ সাক্ষ্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় উনি বলেছিলেন ‘হুশ হওয়ার পর দেখি আমি রমনা থানায়। টর্চারের ফলে আমার পিঠে এবং পায়ের পিছনে কোনো চামড়া ছিল না। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যে এভাবেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের মুক্তিযুদ্ধ সময়কার অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিয়েছিলেন দেশ বরেণ্য এই শিল্পী। তিনি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৪তম সাক্ষী ছিলেন।
তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তিনি তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। আমাদের আর এক বরেণ্য শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার আর বুলবুলের মধ্যে গানের বোঝাপড়াটি হতো খুব ভালো। আমার প্রতি একটা বিশ্বাস ছিল। তাঁর ধারণা ছিল তাঁর গানের কথা সুর সবই আমি ভাল বুঝতে পারি। আমাকে প্রায়ই বলত, আপনি গাইলে আমার কোনো চিন্তা থাকে না আমি যেভাবে চাই সেভাবেই পাই। তাঁর গানের সবচেয়ে বড় শক্তিটা হলো গান চোখের সামনে দেখতে পারা। গানের প্রতিটি কথা চোখের সামনে দেখতে পেতাম।’

১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর তাঁকে মৃতপ্রায় অবস্থায় আরও ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার সাথে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অনেক দিয়েছেন, সুযোগ পেলে হয়তো আরো বেশি দিতে পারতেন। ২২ জানুয়ারি চলে গেলেন বড় অসময়ে এই দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী। শিল্পীর ছেলে আসিফ ইমতিয়াজ বলেন, ‘বাবা যেখানেই থাক শান্তিতে থাক।’ আমরাও বলি, যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন।

x