সবচেয়ে খাটো মানবজাতি পিগমী

অনিক শুভ

বুধবার , ৮ মে, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
160

পিগমী শব্দের অর্থ ‘ক্ষুদ্র’। তাই আকৃতিতে ছোট সকলকেই পিগমী ডাকা সম্ভব। আকারে ছোট আদিবাসীদেরকে পিগমী নামটা রসিকতা হিসেবেই দেয়া হয়েছিলো। পরে তারা এনামেই পরিচিত হয়ে যায়। এই খর্বআকৃতির গোষ্ঠী ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানান জঙ্গলে। নাতিশীতোষ্ণ বনাঞ্চলই পিগমীদের আবাসস্থল।

এসব গোষ্ঠীর রয়েছে আলাদা আলাদা নিজস্ব নাম। অনেকে মনে করেন, তাদের আবাস আফ্রিকাতে। কিন্তু শুধু আফ্রিকা নয়, এশিয়া, এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও এদের অস্তিত্ব আছে। কঙ্গোর বেসিন ছাড়াও মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, পাপুয়া নিউগিনি এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন স্থানে পিগমীদের দেখা পাওয়া যায়। কিছু উল্লেখযোগ্য পিগমী আদিবাসী গোষ্ঠীর নাম হলো আকা, বাকা (আফ্রিকা), ব্যুটি, নেগ্রিতো (দক্ষিণ এশিয়া) প্রভৃতি।
ত্রিশ হাজার বছরের পুরোনো এদের অস্তিত্ব। নতুন প্রস্তুর যুগের শুরু থেকেই তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। পিগমীরা পেশায় শিকারী হয়। তারা জঙ্গল ছেড়ে সমতলে আসতে চায় না এবং নিজেদের জীবন দিয়ে তারা বন রক্ষা করতে চায়। পূর্ণবয়স্ক পিগমীদের গড় উচ্চতা ৪’১১” হয়ে থাকে। অনেক গবেষক মনে করেন, পিগমীদের শরীরে গ্রোথ হরমোন কম থাকে। এ কারণেই তেরো বছর বয়সের পর তারা আর লম্বায় বেড়ে ওঠে না। আবার অনেকে মনে করেন, যেহেতু তারা বরাবর বনে জংগলে বাস করেছে, নিজেদের মানিয়ে নেয়ার তাগিদেই তাদের শারীরিক আকৃতি ছোট হয়ে থাকে। কেননা এতে জঙ্গলে খাপ খাইয়ে নেয়া সহজ হয়।
যেহেতু পিগমী বলতে অনেক ধরনের আদিবাসীকে বোঝায়, তাই তাদের সাধারণ ভাষা নেই। সমাজ ও স্থান ভেদে পিগমীদের ভাষা ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন- বাকা পিগমীরা বাকা ভাষায় কথা বলে। সংস্কৃতি ভেদে কিছু পিগমী আদিবাসীর কথা জেনে নেয়া যাক এখন। সবধরনের পিগমী আদিবাসীর বাস বনের সবুজে। বাকাদেরও বাসস্থান নাতিশীতোষ্ণ জঙ্গল। তাদের দেখা মেলে আফ্রিকা মহাদেশের কঙ্গো বা ক্যামেরুনের জঙ্গলে। এছাড়াও জঙ্গলের নিকটবর্তী নদীর ধারেকাছে তাদের দেখা যায়। উচ্চতায় তারা ১২০-১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তারা আধ্যাত্মবাদে বিশ্বাসী। তাদের আধ্যাত্মিক ঈশ্বরের নাম ‘জেংগি’। জেংগি একজন বনদেবতা। এই বনদেবতাকে খুশি করতে বাকারা নাচ-গান করে থাকে। তাদের সর্বপ্রধান ঈশ্বরকে ‘কম্বা’ বলে সম্বোধন করা হয়।
পিগমীদের বর্ণনা সাহিত্য থেকে শুরু করে কোথাও খুব একটা ইতিবাচকভাবে আসেনি। অ্যারিস্টটল-হোমার থেকে শুরু করে শত বছরের পুরনো ইউরোপীয় পর্যটক হারকুফ সবার বর্ণনাতে পিগমীরা এসেছে শুধুই খর্বকায় গোষ্ঠী হিসেবে। নিজেদের এমন আকৃতির এবং গায়ের রঙের জন্য সবসময়ই বর্ণবাদের শিকার হয়েছে এই জাতি। এমনকি তাদের নিয়ে ভিডিও গেমও তৈরি হয়েছে, যেখানে সবাই পিগমী হত্যার মাঝে আনন্দ লাভ করে। ১৯০০ সালেও বেলজিয়ামে পিগমীদের ধরে নিয়ে গিয়ে প্রদর্শনীতে দেয়া হতো। রোয়ান্ডা গণহত্যার সময় এক-তৃতীয়াংশ পিগমীকে হত্যা করা হয় বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
পিগমীরা পৃথিবীর আদিম অস্তিত্ব। কিন্তু আজ তাদের অস্‌ত্িবত্ব বিপন্ন প্রায়। শান্তিপ্রিয় পিগমীরা এখনো বনের মাঝে নিজেদের নির্ঝঞ্ঝাট জীবনেই থাকতে চায়, কিন্তু বাহ্যিক সমস্যা তাদের এ জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বনের শান্তিপ্রিয় এ আদিবাসী গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত অন্যায়, জুলুম, অনাচারের শিকার। এই মুহূর্তে যদি তাদের অধিকার সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া না হয়, তবে অতিসত্বর হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে পৃথিবীর আদিমতম একটি গোষ্ঠী।

x