সন্দ্বীপে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে পর্যটন কর্পোরেশনের প্রতিনিধি দল

অপু ইব্রাহিম, সন্দ্বীপ

শুক্রবার , ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ
127

সৌন্দর্যের লীলাভূমি সন্দ্বীপে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। সাগরকন্যা খ্যাত সন্দ্বীপের পশ্চিমে মেঘনা নদী আর পূর্বে সন্দ্বীপ চ্যানেলের উত্তাল ঢেউ ও দুরন্ত বাতাসে প্রাণ জুড়ায়। বৃত্তাকারের দীর্ঘ ৪১ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত আর পূর্বে গুপ্তছড়া ঘাটে আছে ম্যানগ্রোভ বন। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে অপরূপ নৈসর্গ।
এখানকার প্রাকৃতিক সুশোভায় শোভিত মনোরম স্থানগুলোকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সন্দ্বীপের পশ্চিমে রহমতপুর পুরাতন স্টিমার ঘাট এলাকায় মেঘনা নদীর তীর জুড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে উঠতে পারে। এ এলাকায় মেঘনা নদীর তীর ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা যায়।
সন্দ্বীপে যেমনি রয়েছে নৈসর্গিক রূপ, তেমনি রয়েছে নদী, পুকুর ও বিলে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছের ছড়াছড়ি। এছাড়া এখানে দেশি হাঁস-মুরগি পাওয়া যায়। গরু-মহিষের দুধ, দই ও খেজুর রস পাওয়া যায়। রয়েছে নানা রকম শাকসবজি ও ফসলের ক্ষেত। মাঝ দরিয়ায় অপূর্ব সবুজের বেষ্টনী দর্শনার্থীর মন কেড়ে নেয়। নদীর বুকে অথৈ জলের মাঝে ছোট ছোট দ্বীপ-বন বাতাসের দোলায় কেঁপে ওঠে। এসব বনে পাখির মেলা। বক, চিল, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বালিহাঁস, ময়না, টিয়া, ঘুঘুসহ আরো কত রকমের পাখি রয়েছে! এখানে শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। জেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে পাখিরাও মাছ শিকার করে। দল বেঁধে পাখিদের উড়াউড়ি মন কেড়ে নেয়।
চট্টগ্রাম শহর থেকে সড়ক পথে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে এসে স্পিড বোটে কয়েক মিনিটের পথ। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে আকাশের রঙধনু নদীর বুক জুড়ে মিতালী গড়ে তোলে। সবার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে প্রাণ জুড়ায়। সন্দ্বীপে বসে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। দেখা যায় মেঘনার ঐতিহ্যবাহী রূপালী ইলিশ কিংবা অন্য মাছ ধরার মনোরম দৃশ্য। যার জন্য দিন দিন আকৃষ্ট হচ্ছেন পর্যটকরা। তবে নিরাপত্তাসহ সরকারি হোটেল-মোটেলের কোন সুযোগ সুবিধা না থাকায় পর্যটকদের পোহাতে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনা। যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাবে এ উপকূলের সম্ভাবনাময় পর্যটনের বিকাশ ঘটছে না। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে সন্দ্বীপকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা দীর্ঘ দিনের দাবি সন্দ্বীপবাসীর।
তাদের দাবি, সন্দ্বীপকে যদি পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয় তাহলে বদলে যাবে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য। পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে তৈরী হবে নতুন কর্মসংস্থান। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও এগিয়ে যাবে এ অঞ্চল, এমনটাই মনে করেন সচেতন মহল। সরকার যদি সন্দ্বীপ পর্যটন স্পট করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাহলে এ এলাকায় প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটবে এবং দেশের অর্থনীতিও লাভবান হবে। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ সকল ভ্রমণ প্রিয় মানুষ, যান্ত্রিকতা দূরে ফেলে দিতে পারে স্বস্তিকর পরিবেশ। নদীর কূলে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে উন্নত ন্যায্যমূল্যের খাবারের দোকান, স্যানিটেশন, কটেজ, রিসোর্টসহ শিল্পপতিদের বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে।
সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা দৈনিক আজাদীকে বলেন, সন্দ্বীপকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে আমি সংসদে উপস্থাপন করেছি। সন্দ্বীপে এখন অনেকগুলো উন্নয়ন দৃশ্যমান। সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ এসেছে। ব্লক বেড়িবাধ, আরসিসি জেটি হচ্ছে। যাতায়াতের জন্য উন্নতমানের জাহাজ দেয়ার চেষ্টা চলছে। পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠতে এখন আর বাধা নেই।
এদিকে, সন্দ্বীপকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবকাঠামো, স্থান নির্বাচন ও প্রাক সম্ভাবতা যাচাই বাছাই করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের প্রতিনিধি দল গত ৩১ মার্চ সন্দ্বীপ পরিদর্শনে আসেন। পর্যটন কর্পোরেশনের মহাব্যবস্থাপক জাকির হোসেন সিকদার বলেন, আমরা সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখেছি। সন্দ্বীপ পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি জায়গা। পর্যটক খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সন্দ্বীপে হোটেল মোটেল নির্মাণ করা হতে পারে। সন্দ্বীপের ৪১ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত ও ম্যানগ্রোভ বনের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এ হোটেল-মোটেল নির্মাণ করা হতে পারে।

কালাপানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলীমুর রাজী টিটু বলেন, সন্দ্বীপ পর্যটন এলাকা অনেক আগে হওয়ার কথা ছিল। শুধুমাত্র যোগ্য নেতৃত্ব ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে হয়নি। সন্দ্বীপকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা অনেক দিন পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করছি অচিরেই সন্দ্বীপ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠবে।
সম্মিলিত সন্দ্বীপ অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসানুজ্জামান বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের অর্ধেক অবকাঠামো সন্দ্বীপে পরিকল্পিতভাবে করলে সন্দ্বীপ হবে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। আর সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারলে দীর্ঘদিনের নৌ-যাতায়াতেরও সমাধান আসবে। ঘুরতে আসা পর্যটক পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র পিম্পল বড়ুয়া বলেন, সন্দ্বীপের পুরাতন স্টিমারঘাট মেঘনা বিচে এসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিছু অবকাঠামোগত কাজ করলে এ জায়গাটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।

x