সনজিত দে’র ‘স্বপ্নমাখা ভোর’

জসীম মেহবুব

শুক্রবার , ২ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ
44

কিশোরকবিতার সংজ্ঞা নিরুপন করতে গিয়ে কাব্যরসিকগণ নানা মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ‘‘ কিশোরকবিতা হচ্ছে- আবেগতাড়িত স্বপ্নের প্রাণবন্ত কম্পন। কল্পনার গহীন থেকে বেড়ে ওঠা সুরের বেহালা এবং অনাগত ভবিষ্যতের নির্মল হাতছানি। ’’ আবার কেউ কেউ বলেছেন, ‘‘কিশোরকবিতার হচ্ছে, সেই কবিতা, যাতে কৈশোর ও কবিতার যৌথ রহস্যের গন্ধসুধা খুব সহজভাবে সৌরভ ছড়াবে। কৈশোরের যে অবারিত রহস্য, প্রথম আলোতে চোখ মেলে তাকানোর যে অপরূপ বিস্ময়, বয়ঃসন্ধির যন্ত্রণা, বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়েও কল্পনার অশ্বারোহি সেজে কখনো উড্ডয়ন, কখনো পতনের দীর্ঘযাত্রার ছাপ থাকবে যে কবিতার শরীরে, মনে হয় কিশোর কবিতা হবে সেটাই।’’ এত কঠিনতর সংজ্ঞার পরে কিশোরকবিতার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করা বেশ কঠিন বলে মনে হয়।
তবে কবিতা কি ? সে ব্যাপারে কবিতা অনুরাগীদের নানা মন্তব্য পাওয়া যায় । সে সব মন্তব্য আমরা বার বার পড়েছি বলে পুনরুক্তিতে যেতে চাই না। আমাদের কিশোর কবিতার প্রাণপুরুষ, প্রিয় কবি সুজন বড়ুয়া নিজের মত করে সাজিয়ে বলেছেন- ‘‘অনুভূতির রঙে রঞ্জিত শব্দমালার সান্যিধ্যে সুমধুর ছন্দে যখন কোন বিশেষ সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে, তখন তাকে বলা যেতে পারে কবিতা।’’ তিনি এ বাক্যের শুরুতে শুধু দ’ুটি শব্দ সংযোজন করে কিশোরকবিতার সংজ্ঞা নিরুপন করেছেন এভাবে-
‘‘ কিশোর উপযোগী অনুভূতির রঙে রঞ্জিত শব্দমালার সান্যিধ্যে সুমধুর ছন্দে যখন কোন বিশেষ সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে তখন তাকে বলা যেতে পারে কিশোর কবিতা । ’’
কী আছে এই কিশোর কবিতায় ? কবি আল মাহমুদ যখন বলেন, ‘‘মন পবনের নাও হয়ে যাও বন্ধ রেখে বইটা/শতেক মাঝির পাল খাটানো/জল ফাটানো বৈঠা।’’ তখন কাঠের তৈরী সাধারণ একটি নৌকা অনিবার্য চিত্রকল্পের প্রতীক হয়ে ধরা পড়ে । কবি আবার যখন বলেন, ‘‘নিশিথের নিরালায় নীল মুকুরে/ দেখ দেখ ভেসে যায় সোনার থালা।’’ তখন মনে হয় চাঁদকে নিয়ে এমন ঈর্ষণীয় চিত্রকল্প, উপমা আর কোন কবির কবিতায় চোখে পড়ে না। একজন কবির কৃতিত্ব এখানেই ।
বাংলাদেশের কিশোরকবিতা একটি আলাদা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত আজ ।
কিশোরকবিতা নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা রয়েছে আমাদের। তেমনি একটি অনন্য সংযোজন কবি সনজিত দে’র কিশোর কবিতাগ্রন্থ ‘স্বপ্নমাখা ভোর’। এই ‘স্বপ্নমাখা ভোর’ নিয়ে দু’চার কথা বলার জন্যই এই ভূমিকার অবতারণা ।
‘স্বপ্নমাখা ভোর’ কবি সনজিত দে’র ৬ষ্ঠ কিশোরকবিতা গ্রন্থ । এ গ্রন্থের কবিতায় রয়েছে বাংলাদেশের মনোরম প্রকৃতি, দেশপ্রেম, কৈশোরের দুরন্তপনা, স্বপ্ন আর উদ্দীপনামূলক ১৯টি কবিতা । গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা প্রকাশের আগে এবং পরে বার বার পাঠ করে আমার মনে হয়েছে, কবির ভেতর লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনার এক ফল্গুধারা। যে ফল্গুধারা তাকে টেনে নিয়ে যাবে অনেক দূর। যেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া মুঠো মুঠো স্বপ্ন আর সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত । মাঝে মাঝে তাকে হতাশ হতে দেখা গেলেও সেটা যে তার অভিমান, তা বেশ বোঝা যায়। কেননা এ হতাশা থেকে তিনি কবিতাকে গুডবাই বলে ত্যাগ করেন নি । কোনদিন ত্যাগ করবেন বলে মনে হয় না । তার কবি স্বভাব তাই বলে ।
এবার তার কিশোর কবিতার ভেতরে প্রবেশ করা যাক।
‘‘ তুমি তো কিশোর স্বপ্নে বিভোর/বুক ভরা যার জ্যোতি
দুরন্ত তুমি উড়ন্ত এক/ ডানামেলা প্রজাপতি ।
কিশোর তোমার দুষ্টু হাসিতে / মিষ্টি ঠোঁটের কোণে
ভালোবাসা ঘেরা প্রীতিময় হওয়া/ শব্দরা জাল বোনে।’’
কিশোরের স্বপ্নমাখা চোখে স্বপ্নের ভোর এসে লুটোপুটি খায় বার বার। সেই লুটোপুটিতে কিশোরের মন ছুটে চলে অজানা গন্তব্যে। এমন সুন্দর চিত্রকল্পের বিন্যাস ফুটে উঠেছে সনজিতের কবিতায় ।
‘‘ আমাদের এত চাওয়া পাওয়া নেই বড়
দু’বেলা দু’মুঠো ডালভাত মাছ ধরো
বনলতা ঘেরা আম-জাম গাছ সারি
মাথা গোঁজাবার একখানা ছোট বাড়ি ।
লেখাপড়া শিখে গড়বো মা এক নীড়
জমবে সেখানে বেশ শান্তির ভীড়।
শিক্ষার আলো আর মা সুযোগ পেলে
আমরা এগিয়ে যাবো মা গো ডানা মেলে।
এইটুকু চাই শুধু এইটুকু চাই
এর চেয়ে বেশি চাওয়া পাওয়া কিছু নাই ।’’
এক অভাবি কিশোরের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে মায়ের কাছে তার মৌলিক আবদার এ কবিতায় ফুটে উঠেছে। বড় কোন চাওয়া নয়, ছোটখাট, যা না হলেই নয়, এমন সব আবদারে মায়ের কাছে কিশোরের আর্তি উঠে এসেছে এখানে । এমন হাজারো কিশোর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের সমাজে । যাদের ন্যুনতম চাহিদাটুকুই অপূর্ণ রয়ে গেছে। সে ম্যাসেজটি এ লেখায় রয়েছে, যা পড়ে পাঠক আবেগে আপ্লুত হবে ।
কবির আর একটি কবিতা-
‘‘ শিশির ভেজা ভোরের আলোয় যখন খুলি আঁখি
তখন শুনি মধুর কন্ঠে তোমার ডাকাডাকি।
কী নাম তোমার পাখি ?
গাছে তুমি লেজ দুলিয়ে মিষ্টি সুরে ডাকো
তোমার কি নেই ভিটেবাড়ি ? গাছে কেন থাকো ?
তুমিও কি আমার মতো স্বপ্ন মনে আঁকো ?
তোমার কাটে খোঁশ মেজাজে আরামে সব দিন
নেই কোন তার বাঁধা ধরা নিয়ম বা রুটিন।
তোমার ওড়া ছুটোছুটি
মিষ্টি সুরের গান
সারাটা দিন জড়িয়ে রাখে
আমার মন ও কান ।’’
নিজের স্বপ্ন, কল্পনার সাথে মুক্ত ডানার পাখির স্বপ্নের মেল বন্ধন ঘটেছে এ কবিতায় । বাঁধা ধরা নিয়ম আর রুটিন থেকে মুক্ত পাখির ন্যায় জীবন কিশোরকে সব সময় টানে । কিশোরের মন-প্রাণ জুড়ে পাখির ওড়াউড়ি আর মিষ্টি সুরের গান । এ গানে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে কিশোর ভেসে বেড়ায় । এ কবিতার কিশোর বাংলার সব কিশোরের প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে ।
‘‘ রোদ তার গায়ে লেগে করে চক চক
সুন্দর ডানাঅলা দুধ সাদা বক।
পিছে ফেলে বাড়ি ঘর ডানা মেলে ফর ফর
উড়ে যায় পার হয়ে খাল বিল ফেলে
হেলে দুলে তার ওড়া দেখি চোখ মেলে । ’’
ছন্দের সুরে সুরে দোল খাওয়া এ কবিতার সাথে পাঠকমন একাকার হয়ে যায় । সাদা বক আকাশে উড়ে বেড়ানোর চিত্রকল্পে এ কবিতার পাঠক উড়ে বেড়ায় আকাশে-বাতাসে । ছন্দময় এ কবিতাটি বইয়ের অনন্য সংযোজন ।
‘‘ মন উড়ে যায় পাখির মতো/ থির থাকে না ঘরে
মন ছুটে যায় দূর নিলিমায়/ থাকি কেমন করে ?
মন ছোটে তো আমায় ছোটায়/ সকাল-দুপুর-মাঠে
খেলায় খেলায় সময় কাটে/ দিগন্ত যায় পাটে।
স্বপ্ন তুমি আবার এসো/ এসো কোন রাতে
পালিয়ে ঠিক সত্যি আমি/ যাব তোমার সাথে ।’’
সনজিত দে‘র কবিতায় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে স্বপ্ন। বেশ ক‘টি কবিতায় স্বপ্ব এসেছে সহজ- সাবলীলভাবে । এ কবিতায়ও এসেছে স্বপ্ন । কিশোর মন স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা । তার পুরো জীবন প্রনালী স্বপ্ন দিয়ে ঢাকা । সে স্বপ্নের কোন সীমা-পরিসীমা নেই । স্বপ্নের ডালপালা ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র । এক কিশোরের স্বপ্নের সমান বিশাল বড় হয়ে উঠেছে তার কাব্যগ্রন্থ ‘স্বপ্নমাখা ভোর’ । ঠিক তেমনি ‘স্বপ্নমাখা ভোর’ এ গ্রন্থের একটি সেরা কবিতা ।
‘‘ সবাই যখন মিছিলে মিছিলে/ ফাটালো তাদের গলা
মনে জোর এসে দেখি শুরু হয় / সামনের পথ চলা।
ফেলে দেই সব মার্বেল আর / খেলার জিনিস যত
মিছিলের সাথে মিলেমিশে যাই/ সাহসী ছেলের মতো।
তখন পেয়েছি শহিদ মিনার/ অনেক আঁধার খুঁড়ে
মাতৃভাষার শব্দ বুনেছি/ নকশি কাঁথায় জুড়ে।
স্বাধীন হওয়ার বীজ রোপনের / হয়েছে পূর্ণকলা
বেরিয়ে এসেছে কালজয়ী এক/ স্বপ্নের বাঁশিঅলা ।
কেটে যায় সব অন্ধকারের / কালো ছায়াময় ঘোর
যুদ্ধের শেষে স্বপ্নিল এক / এলো যে নতুন ভোর । ’’
আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বপ্নের বাঁশিঅলা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ কিশোর কবিতায় ফুটে উঠেছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বাঙালির হাজারো স্বপ্নের কথামালা । যে বাঁশিঅলার বাঁশিতে পূরণ হয়েছে আমাদের বাঙালি হয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন । যে স্বপ্ন পূরণ না হলে আমরা থেকে যেতাম চিরদিনের গোলাম । যে স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে আমাদের করতে হয়েছে সংগ্রাম আর মহান মুক্তিযুদ্ধ ।
এমনি নানান স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে কবি সনজিত দে আমাদের কিশোর কবিতার ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন । করেছেন ফুলে ফলে সুশোভিত । তার সহজ, সরল, সাবলীল উপস্থাপনা কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখবে পাঠকের মনের মণিকোঠায় । তবে এ কথা সত্য যে, কবি সনজিত দে-কে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে । কিশোরকবিতার বিশাল, সমৃদ্ধ ভূবনে টিকে থাকতে হলে তাকে লেখালেখিতে আরো বেশি যত্নশীল ও মেধার পরিচয় দিতে হবে । যে মেধা এবং যত্নশীল হওয়ার প্রধান ভূমিকা পালন করবে পঠন-পাঠন । কেননা প্রচুর পঠন-পাঠন তাকে পৌঁছে দেবে অনন্য উচ্চতায় । তার সবগুলো কবিতাই বাংলা ছন্দের দু’টি ছন্দ স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের চালে রচিত । ছন্দে তাকে বেশ সাবলীল ও স্বতস্ফুর্ত বলে মনে হয়েছে । গ্রন্থের প্রচ্ছদে মোমিন উদ্দিন খালেদের চমৎকার সৃজনশীলতার ছাপ রয়েছে । অলংকরণে উত্তম মিত্র উৎরে গেছেন বলা যায় । বইটির মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র একশ ষাট টাকা। আমি ‘স্বপ্নমাখা ভোর’ বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি ।

x