সদারঙ্গের জাতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলন

আনন্দন প্রতিবেদক

বৃহস্পতিবার , ৭ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ
29

এ কোন্‌ সুর, যে সুর মনের তন্ত্রীকে হঠাৎ রাঙ্গিয়ে দিল। ভূলিয়ে দিল জগতের সমস্ত দু:খ, কষ্ট, গ্লানি। এই সুরশক্তির আধার কোথায়? কেউ কী বলতে পারেন ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসল সেদিন সদারঙ্গের সম্মেলনে!
সংগীত শাস্ত্রীগণ এই সঙ্গীতকে ’রাগ’, ’শাস্ত্রীয়’ কিংবা ’উচ্চাঙ্গ’ সঙ্গীত বলে অভিধা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ এই সঙ্গীতকে কালোয়াতী গান বলে অভিহিত করে বলেছেন, ’আমাদের কালোয়াতী গানটা যেন শুধু মানুষের গান না, তা’ যেন সমস্ত জগতের’ ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখ সেই ’রাগ’ সংগীতের আসর বসল চট্টগ্রাম শিশু একাডেমির মুক্ত মঞ্চে। ১৩ ফেব্রুয়ারি, বুধবার ফাগুনের প্রথম সন্ধ্যা ৬টায় মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিষদ বাংলাদেশ আয়োজিত তিন দিনব্যাপী দ্বাবিংশতিতম জাতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলন-২০১৯ উদ্বোধন করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত খ্যাতিমান বংশী শিল্পী উস্তাদ ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সদারঙ্গের সভাপতি প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন পণ্ডিত স্বর্ণময় চক্রবর্তী।

’পায়েল বাজে মোরি আব ক্যায়া কঁরু মে, শুন পাবে সাস ননদীয়া। প্রিতম মোরি আব নেহি আয়ে, মোরি প্রিতম বিনা তরফত জিয়া’। রাগ মোহন কোষের সুরে রচিত, ত্রিতালে নিবদ্ধ এই বন্দেশটি সম্মেলক পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। এই বন্দেশটি রচনা ও সুরারোপ করেছেন সদারঙ্গের প্রতিষ্ঠাতা, সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী পণ্ডিত স্বর্ণময় চক্রবর্তী। এতে অংশগ্রহণ করেন সদারঙ্গের প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী। তবলায় সঙ্গত করেন শিল্পী রাজীব চক্রবর্তী।

চট্টগ্রামের শিল্পী লিপু দাশের রাগ ইমন পরিবেশনা উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। তবলায় সঙ্গত করেন শিল্পী রাজীব চক্রবর্তী। সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নারায়ণগঞ্জের ’আহমেদ ব্রাদাসর্’ এর পরিবেশনা। ঋতুরাজ বসন্তর প্রথম দিনে যোগ রাগের সুরে বেহালায় শান্ত আহমেদ, বাঁশিতে কামরুল আহমেদ এবং তবলায় সবুজ আহমেদ উপস্থিত দর্শক শ্রোতাকে মাতিয়ে রাখেন। পরে দর্শকদের অনুরোধে একটি কীর্তন পরিবেশন করেন। চট্টগ্রামের প্রবীণ খেয়ালিয়া জহর মুখার্জীর কণ্ঠে রাগ পুরিয়া কল্যাণ পরিবেশনা ছিল মনোমুগ্ধকর। তাঁর সাথে তবলায় সঙ্গত করেন শিল্পী সুরজিৎ সেন।

১৪ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার বিশ্ব ভালবাসার দিনে, সদারঙ্গের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শুরু হল সমবেত তবলা পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে। পরিবেশন করেন ক্ল্যাসিকাল তবলা স্টুডেন্টস্‌ ফোরাম, চট্টগ্রাম এর প্রায় ত্রিশজন শিক্ষার্থী। পরিচালানা করেন শিল্পী পলাশ দেব। বেহালায় নাগমা বাজিয়েছেন শিল্পী আশীষ বসাক। সেতারে রাগ ’সুদ্ধ বসন্ত’ পরিবেশন করেন কোলকাতার উদীয়মান সেতারিয়া সৌম্যজিৎ পাল। তাঁর পরিবেশনা চট্টগ্রামের দর্শক অনেক দিন মনে রাখবেন। তবলায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন কোলকাতার শিল্পী সত্যজিৎ কর্মকার। পরে আহির ভৈরব রাগে একটি ধুন পরিবেশন করেন। রাগ যোগ পরিবেশন করে চট্টগ্রামের শ্রোতা দর্শকের মনের মধ্যখানে স্থান করে নিল কোলকাতার শিল্পী অঞ্জনা কুশারী। পরে তিনি একটি ঠুমরী পরিবেশন করেন। তাঁর সাথে তবলায় সাথ-সঙ্গত করেন কোলকাতার সমীর আচার্য। হারমোনিয়ামে ছিলেন প্রমিত বড়ুয়া। বেহালায় রাগ বাগেশ্রীর করুণ সুর তোলেন ফেনীর শিল্পী শ্যামল দাশ। তাঁর সাথে সঙ্গত করেন সমীর আচার্য।

১৫ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার তৃতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে ’সংগীতে কল্পনা, উপস্থাপনা ও প্রকাশভঙ্গী’ শীর্ষক আলোচনা শুরু হয় সকাল ১০টায়। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রফেসর তপন জ্যোতি বড়ুয়া, প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান, পণ্ডিত স্বর্ণময় চক্রবর্তী, এ্যাডভোকেট মোহাম্মদ কাইছার উদ্দিন, সৌম্যজিৎ পাল, সত্যজিৎ কর্মকার, রাজীব দাশ ও ঐশি চৌধুরী। ফিউশন, সঙ্গীতের বাণিজ্যিকরণ, শিল্পী সম্মানী, আরো বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত হয় এ আলোচনায়।
সন্ধ্যা ৬টায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরিণ আখতার। ঢাকার বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয় এর শিক্ষার্থীদের সম্মেলক পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে সম্মেলনের তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়। তবলায় ঢাকার অঞ্জন সরকার, সারেঙ্গীতে পটুয়াখালীর শৌণক দেবনাথ, এস্রাজে জামালপুরের রায়হানুল আমিন ও সিরাজগঞ্জের গৌরঙ্গ কৃষ্ণ দাশ রাগ ইমন পরিবেশন করেন। তাদের পরিবেশনা উপস্থিত দর্শক শ্রোতাকে বিমোহিত করে।

পশ্চিমবঙ্গের তবলা শিল্পী শ্রুতি পাঠক দাশ এর পরিবেশনা ছিল এক কথায় মনোমুগ্ধকর। তাঁর সাথে সারেঙ্গীতে নাগমা বাজান পণ্ডিত বিজয় কুমার মিশ্র। এ যেন মিশ্র চারুকেশী রাগের সুরের সাথে তবলার বোলের যুগলবন্ধী। রাগ যোগ পরিবেশন করেন ডা: জগদানন্দ রায়। তাঁর দরাজ গলায় তান-তুক খুব ভালো লেগেছে। তবলায় ছিলেন শিল্পী সত্যজিৎ কর্মকার। হারমোনিয়ামে ছিলেন প্রমিত বড়ুয়া। তানপুরায় ছিলেন তিথিনু মারমা।
কোলকাতার পন্ডিত বিজয় কুমার মিশ্র রাগ সরস্বতী পরিবেশনা এই সম্মেলনের বাড়তি মাত্রা যোগ করেছেন। সারেঙ্গীর বেদনার্ত সুর উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের অন্য ভুবনে নিয়ে গেল। তবলায় ছিলেন কোলকাতার শুভেন্দু দাশ।

সর্বশেষ আকর্ষণ ছিল দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী পণ্ডিত তুষার দত্তের রাগ মারু বেহাগ পরিবেশনা। তিনি বিলম্বিত একতালে শুরু করে তিন তালে মধ্যলয় শেষ করেন। তাঁর দরাজ কণ্ঠের পুকার সুর আর প্রকৃতি যেন একাকার হয়ে গেল। পরে তিনি কিরওয়ানী রাগে একটি দাদরা পরিবেশন করেন। তাঁর সাথে যন্ত্রানুসঙ্গে ছিলেন, সারেঙ্গীতে পণ্ডিত বিজয় কুমার মিশ্র, তানপুরায় শুভ চৌধুরী, হারমোনিয়ামে ডা. জগদানন্দ রায় এবং তবলায় ছিলেন সত্যজিৎ কর্মকার। ররীন্দ্রনাথের মতে, ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চির বিরহ বেদনা। দর্শকদের অনুরোধে সেই ভৈরবী রাগ পরিবেশনার মাধ্যমে তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের যবনিকা ঘটে। রয়ে গেল কণ্ঠ, তবলা, এস্রাজ, সারেঙ্গী, সেতার, বেহালার সুরের আবেশ। এ সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, ঢাকা, জামালপুর, ফেনী, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের প্রায় শতাধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করেন।

x