সঠিক পদক্ষেপ নিলে কেপিএমকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব

রবিবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ
57

পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাইয়ে ১৯৫৩ সালে স্থাপিত কর্ণফুলী পেপার মিলস্‌ (কেপিএম) লিমিটেড এক সময় ছিল এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজ কল। এ প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বদলে গিয়েছিল একটি জনপদের চিত্র। কয়েক হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গড়ে ওঠে হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চন্দ্রঘোনার সেই জৌলুস এখন আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এ কাগজ কলে এখন উৎপাদন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। শ্রমিকের সংখ্যা কমে এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। যারা আছেন তাদেরও বেতন-ভাতা বকেয়া পড়ে আছে তিন মাস ধরে। পত্রিকান্তরে গত ২৫ জানুয়ারি এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরের বিবরণে বলা হয়, জানা গেছে, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে প্রায় এক দশক ধরে উৎপাদন কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ কাগজকলে। কেপিএমে এক সময় দৈনিক প্রায় ১০০ টন কাগজ উৎপাদন হতো। মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি ও অনিয়মের কারণে অনেক দিন ধরেই উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে কাগজের মূল উপাদান পাল্পের দাম বৃদ্ধি ও অর্থ সংকটে দেশীয় বাঁশ সংগ্রহ করতে না পারার পাশাপাশি বছরের অধিকাংশ সময় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিকল থাকায় উৎপাদন দৈনিক ১৫-২০ টনে ঠেকেছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুন কারখানাটিতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৯ টন কাগজ। উৎপাদন কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ায় শ্রমিকের সংখ্যাও আগের তুলনায় অনেক কমিয়ে এনেছে কেপিএম। এক সময় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করলেও বর্তমানে আছেন ৭০০ জন শ্রমিক। এর মধ্যে স্থায়ী শ্রমিক ৩০০ ও অস্থায়ী শ্রমিক প্রায় ৪০০ জন। স্থায়ী শ্রমিকরা সরকারি পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন পেলেও অস্থায়ী শ্রমিকদের ৩০০ জন দৈনিক ভিত্তিতে ৩৭৫ টাকা এবং ১০০ জন এক শিফটের জন্য ৪১৫ টাকা মজুরি পান। এছাড়াও ৮০-৯০ জনের ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ রয়েছে সেখানে। সব মিলিয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এখন এ অর্থ পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে না পারায় এক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলে আসছে কেপিএমে। এ অবস্থায় আগামী ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বকেয়া বেতনের একটি অংশ পরিশোধের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। এরপর আগামী মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দেয়া হলে শ্রমিকরা কাজে ফিরে যায়। তবে আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরানো গেলেও উৎপাদন বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভের ধারায় ফেরাতে না পারলে যে কোন সময় ঐতিহ্যবাহী এ কাগজকল বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপরোক্ত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এশিয়ার এক সময়ের সর্ববৃহৎ কাগজ কল কেপিএম বর্তমানে দৈন্যদশায়। দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে কাগজ কলটি ফতুর হয়ে গেছে। হারিয়েছে অতীতের জৌলুস ও গৌরব। এক সময়ের অহংকার এ কাগজকলটির এ রকম পরিণতি বেদনাদায়ক। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে দুরাবস্থার শিকার হয়েছেন কাগজকলটির শত শত কর্মচারীরাও। এক সময়ে যে প্রতিষ্ঠান কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করত, আজ সেটি নিজেই আর্থিক সংকটে রয়েছে। বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারছে না শ্রমিক-কর্মচারীদের। তিন মাস ধরে বকেয়া পড়ে আছে তাদের বেতন-ভাতা। উৎপাদনও কমেছে অস্বাভাবিক হারে। যে প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একদা বদলে গিয়েছিল একটি জনপদের চেহারা, আজ সেটির হাল এমন কেন হলো, তা গুরুত্ব সহকারে খুঁজে দেখার দরকার আছে। অভিযোগ আছে, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাগজকলটির উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় এক দশক ধরে ঝিমিয়ে পড়েছে। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা যদি কাগজকলটির দুর্দশার কারণ হয় তবে সরকারকে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণত দেখা যায় কোন প্রতিষ্ঠান লোকসানি হলে তার প্রভাব শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর পড়বেই। কেপিএমের ক্ষেত্রে এটিই ঘটেছে। মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি ও অনিয়মের ফলে অনেক দিন ধরেই উৎপাদন এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে কাগজ উৎপাদনের মূল উপাদান পাল্পের মূল্য বৃদ্ধি ও অর্থ সংকটে দেশীয় বাঁশ সংগ্রহ করতে না পারার পাশাপাশি অধিকাংশ সময় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বিকল থাকা উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। কাগজকলটিতে এক সময় দৈনিক প্রায় ১০০ টন কাগজ উৎপাদন হতো। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৬ থেকে ২০ টন। এটি মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। বর্তমানে কাগজকলটিকে সব মিলিয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন ও ভাতা বাবদ মাসে আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু লোকসান দিতে হচ্ছে বলে এই অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না। লোকসানে থাকার কারণে এই আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। লোকসানে প্রকৃত কারণ কি কি এবং কেন তা খুঁজে বের করতে হবে সরকারকে। উৎপাদিত পণ্য সঠিক দামে বিক্রি হচ্ছে কিনা, উৎপাদন ব্যয় ঠিক রয়েছে কিনা, যন্ত্রপাতি কেন বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকছে ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নজর রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা বিভাগকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার। প্রতিবেদনটিতে আরো উল্লেখিত হয়েছে যে, শুধু এবার নয়, কিছুদিন পর পরই কেপিএম শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থ হয়- এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বেতন-মজুরি বকেয়া থাকলে শ্রমিককে তাদের পরিবারবর্গ নিয়ে কী দুর্দশায় পড়তে হয় তা সহজেই অনুমেয়। মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে প্রতিশ্রুতি দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। কেপিএম দেশের বড় সম্পদ। এটিকে রক্ষা করতেই হবে এবং তার জন্য সরকারকে যদি বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় তা সরকারকে গ্রহণ করতেই হবে। বিকল্প কোন পথ নেই। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে আমরা চাই তার প্রভাব এ কাগজকলটিতেও পড়ুক। দেশের অন্যান্য কাগজকলের উৎপাদিত কাগজের থেকে এ মিলের উৎপাদিত কাগজের মান অনেক উন্নত। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

x