সঞ্চয়পত্র ও সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে

রবিবার , ২১ জুলাই, ২০১৯ at ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ
261

সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়লে সরকারের ব্যাংক ঋণ কমে। গত এক দশকে এমন চিত্রই ছিল। এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে গত অর্থবছর। বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি করছে সরকার। একই সময়ে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। ২০১৮ সালের মে মাস শেষে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৯৬ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের মে মাস শেষে এর পরিমাণ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪১ কোটি টাকা বা ৪২ শতাংশ। সরকারের ব্যাংক ঋণের এ প্রবৃদ্ধি এক দশকের সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সঞ্চয়পত্র বা দেশের ব্যাংক ঋণের জন্য উচ্চহারে সুদ পরিশোধ করতে হবে। এতে সরকারের ব্যয়ও অনেক বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যই ঋণ নিতে হবে। এজন্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকে সহজ শর্তের ঋণ নেয়ার ওপর জোর দেন। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে যে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি ও ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা তুলে নেয়া দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকটের অন্যতম কারণ।
উপরোক্ত সমস্যাগুলোর সমাধান না করে সরকার যদি ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয় তাহলে আর্থিক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরো কমে যেতে পারে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা তৈরি করবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কর্মসংস্থানহীন হিসেবে সমালোচনা করা হচ্ছে। এছাড়া তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকের সুদের হারও বাড়ছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার অধিক ঋণ নিলে তা অর্থনীতির ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলবে। নগদ অর্থের টান চলছে ব্যাংকগুলোতে তারা নানা সংকটে সময়মতো ঋণ দিতে পারছে না। ফলে ধারাবাহিকভাবে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি। এরই মধ্যে বাজেট ঘাটতির অর্থায়নে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা বেসরকারি খাতে তারল্য প্রবাহ আরো বাধাগ্রস্ত করবে। এমনিতেই বেরসকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে, ব্যাংকগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করে। এর মধ্যে সরকার ব্যাংক থেকে যদি বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আর তা যদি হয় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। তাই নতুন বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বৈদেশিক উৎস, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড ও অন্যান্য ফিন্যান্সিয়াল টুলসের ওপর জোর দিতে হবে। সরকার ঠিক তখনই ব্যাংক ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেন যখন অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণ খেলাপিদের পকেটে। আবার সে খেলাপিদের থেকে টাকা আদায়ে বাস্তবসম্মত কোন কার্যকর উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সক্ষমতা। তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়া ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। এক্ষেত্রে শেষ ভরসা বাংলাদেশ ব্যাংকই। এখানে সংকট আরো তীব্র হতে পারে, যদি বাংলাদেশ ব্যাংক নোট ছাপিয়ে সরকারের অর্থের যোগান দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে সরকারের ঋণ আকারে টাকার যোগান দেওয়া হলে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ অনেক বেড়ে যাবে। বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ঋণ নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আর এতে কমে যাচ্ছে প্রকৃত উন্নয়ন ব্যয়। আবার স্থানীয় ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ নেওয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং খাতে, সুদের হার কমছে না। ব্যাংকিং খাতের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণও সরকারের ব্যাংক ঋণ। শুধু ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়ছে না, ব্যাংকের টাকাও ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। সরকার এখন স্বল্প মেয়াদি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ঋণ নিচ্ছে। ১০০ টাকা মূল্যমানের সম্পদ ২০ বছর পর আর ১০০ টাকা থাকছে না। মূল্যস্ফীতির কারণে তা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের কোষাগারে টাকা আটকে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ফলে শিল্পায়নও ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা বাড়লেও আশানুরূপ আমানত আসছে না। ঋণের চাহিদা বেশি, কিন্তু আমানতের যোগান কম থাকায় ঋণ দিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংক। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও কমেছে। রাজস্ব আদায়ে সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সেটা পূরণ না হওয়ায় সরকারের ঋণের চাপ বেশি। সেজন্য সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ব্যাংক ও সরকার দু’পক্ষের জন্যই শংকার।
সরকারের ঋণ বৃদ্ধি কমাতে হলে রাজস্ব আহরণের গতি বাড়াতে হবে। সরকারকে কর আদায় কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতিশীলতা আনতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঋণ ও সহায়তা সংগ্রহের ওপর জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ সস্তা এবং সুদ পরিশোধের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়। তবে এসব ঋণ প্রায়ই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সুশাসন, পররাষ্ট্র নীতি, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক কূটনীতিসহ অনেক কিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে সরকারের আরো সতর্ক ও দূরদর্শী হওয়া জরুরি। অপচয় কমিয়ে আনা, দুর্নীতি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যয় কমিয়ে আনা, লোকসানি প্রতিষ্ঠান বিষয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জনপ্রশাসনের ব্যয় হ্রাস করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ব্যয়ে কৃচ্ছ্র সাধন করা প্রভৃতিও অবশ্য প্রয়োজন।

x