সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে

বুধবার , ২১ আগস্ট, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
38

আজ ২১ আগস্ট। ২০০৪ সালের এই দিনে ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ সমাবেশে কয়েকটি মিলিটারি-গ্রেডের গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। সেই হামলায় আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত ও ৩শ’র বেশি জন আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান। আহতদের মধ্যে অনেকের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলেও, কানে আঘাত পান, যার প্রভাবে আজ পর্যন্ত তিনি ভুগছেন। শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গকে একসঙ্গে শেষ করে আওয়ামী লীগ তথা জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়ার জন্য হীন ও ভয়াবহ তৎপরতা ছিল এটি। নীলনকশা, ষড়যন্ত্র, গ্রেনেড যোগাড়, হামলা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা এবং অবশেষে ঘটনার দায় খোদ আওয়ামী লীগের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা ছিল নিন্দনীয়।
‘রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? এই রাজনীতি এ দেশের জনগণ চায় না। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হবে? রাজনীতিতে এমন ধারা চালু থাকলে মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে।’ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশেষ আদালত-৫-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এই মন্তব্য করেছিলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসির আদেশ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এ ছাড়া আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন আদালত। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছিলেন, রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে কি বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় বিরোধী যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদারনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। আদালত বলেন, বিরোধী দলের নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। রাজনৈতিক জনসমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে। আদালত এ দেশে আর এমন হামলার পুনরাবৃত্তি চান না-এমন মন্তব্য করে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ওপর হামলা বা রমনা বটমূলে হামলার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে নৃশংস হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালায় হরকাতুল জিহাদের একদল জঙ্গি, যা ছিল ছয় বছর ধরে এই জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলা ও শেখ হাসিনাকে হত্যার ধারাবাহিক চেষ্টার এক চূড়ান্ত রূপ। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি যোগাযোগ এবং সরকারের উদাসীনতা ও ক্ষেত্র বিশেষে সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতায় একটি উগ্রপন্থী গোপন সংগঠন কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, সেটারও একটা বড় উদাহরণ হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী (হুজি-বি)।
আনিসুল হক মামলার রায় নিয়ে তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, ওই দিন ওই ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু যে ২৪ জনকে হত্যা করেছে, শত শত মানুষকে আহত করেছে, পঙ্গু করেছে, তা তো নয়, সভ্যতার ইতিহাসকে তারা কলঙ্কিত করেছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সমঝোতার শেষতম সম্ভাবনাকেও চিরতরে হত্যা করেছে। সেই ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। আদালতে বিচার হয়েছে। আদালত শাস্তি দিয়েছে নানা মেয়াদের। এর প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত আইনানুগ। যদি কেউ রায়ে অসন্তুষ্ট হন, তিনি বা তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আইনি বিচারের রায়ের কেউ যদি প্রতিবিধান চান, সেটাও চাইতে হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই। ২১ আগস্টের আঘাতে আমাদের হৃদয় এখনো ক্ষতবিক্ষত। এই বিচারপ্রক্রিয়া এবং এই রায় ঐতিহাসিক, কারণ এটা জাতির ওপরে চেপে বসা ইতিহাসের দায় শোধ করার প্রক্রিয়ার একটা অংশ। ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের একটা প্রয়াস।
আজকের দিনে নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। কোনো অপশক্তি যেন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, তার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।

x