সংস্কৃতি চর্চায় আলো ছড়াচ্ছে প্রীতিলতা কমপ্লেক্স

৩০ একর জায়গায় সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকায় নির্মিত হয়েছে এ ভবন

শফিউল আজম,পটিয়া

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ
35

সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা চর্চার উর্বরভূমি পটিয়া। বৃটিশ আমল থেকেই এ অঞ্চলে সংস্কৃতি চর্চার গড়ে ওঠে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সংস্কৃতি গঠনের মাধ্যমেই ধারাবাহিকভাবে তৈরি হতে থাকে হাজার হাজার সাংস্কৃতিকর্মী। এভাবে পটিয়ার সংস্কৃতি অঙ্গন হয়ে ওঠে একটি গৌরবৌজ্জ্বল সাংস্কৃতিক মঞ্চ হিসেবে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দীর্ঘনের গৌরবৌজ্জ্বল এ ইতিহাসকে পূর্ণতা দিতেই পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নামে গড়ে উঠেছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক ভবন। এ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স এ অঞ্চলে সাংস্কৃতিক বিকাশে ও সংস্কৃতি চর্চায় আলো ছড়াচ্ছে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক ভবন বর্তমানে পটিয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশে অন্যন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এ ভবনে বর্তমানে বীরকন্যা প্রীতিলতা শিশু কানন ( প্লে থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত) পাঠ দেয়া হচ্ছে। প্রায় শতাধিক ঝরে পড়া ও হত দরিদ্র শিশুসহ এলাকার শিশুদের মাঝে পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া নিয়মিত সংগীত প্রশিক্ষণ, নৃত্য প্রশিক্ষণ, চারুকারু প্রশিক্ষণ, তবলা প্রশিক্ষণ, নাটক প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার আউট সোসিং (আয়বর্ধক কার্যক্রম, প্রশিক্ষিত কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীদের জন্য) এবং ১৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সের নারীদের জন্য রাখা হয়েছে সেলাই প্রশিক্ষণ।
জানাগেছে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নের ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্টে’র বাস্তবায়নে ৩০ একর ভূমির উপর এ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের ৬ তলা বিশিষ্ট ভবনের অর্থায়নে ৪ কোটি ৩৮ লক্ষ বিরাশি হাজার চারশত পঞ্চাশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ভবনটির কারিগরি সহায়তায় দেন পটিয়া উপজেলা পরিষদ। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছেন নগরীর কনসোনেল ইঞ্জিনিয়ার্স এন্ড বিল্ডার্স। কমপ্লেক্সের সামনেই রয়েছে প্রীতিলতার আবক্ষ মূর্তি। যেখানে বিভিন্ন সময় ফুল দিয়ে নানান পেশার মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি।
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও এখানে প্রতিবছর ৫ মে বীরকন্যা প্রীতিলতার জম্ম বার্ষিকী, ২৪ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবস পালন করা হয় । এছাড়া জাতীয় দিবসসমূহ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে বলে জানান প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।
ছয়তলা প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক ভবনের বিভিন্ন তলায় রয়েছে সুসজ্জ্বিত ও মনোরম পরিবেশে সাংস্কৃতিক চর্চাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। এখানে নীচ তলায় রয়েছে সংস্কৃতি চর্চার জন্য ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা গণসাংস্কৃতিক মঞ্চ, অফিস কক্ষ, দিপালী সংঘ, ডাইনিং ও কিচেন এবং গাড়ি পার্কিং। ভবনের প্রথম তলায় রয়েছে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী ও পুরোধা মাস্টারদার নামে মাস্টারদা সূর্য সেন সেমিনার হল। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা শিশুকানন বিদ্যানিকেতন। তৃতীয় তলায় রয়েছে মাস্টারদা সূর্য সেন রিসার্চ সেন্টার, সংগ্রহশালা/গ্যালারী, সুসজ্জ্বিত লাইব্রেরি, বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্ট কার্যালয়, বিপ্লবী কল্পনা দত্ত সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র। চতুর্থ তলায় রয়েছে ডরমেটরি (বিপ্লবীমাতা সাবিত্রী দেবী) ও পঞ্চম তলায় রয়েছে ডরমিটরি (পুষ্পকুন্তলা)। সাংস্কৃতিক ভবনের সামনে রয়েছে বৃহত্তর পরিসরে উম্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ। ভবনের বাউন্ডারী ওয়াল পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই রয়েছে ভবনের সামনে প্রীতিলতার আবক্ষমূর্তি। যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা প্রীতিলতার জম্ম ও মৃত্যু দিবসসহ নানা অনুষ্ঠানে নেতৃবৃন্দরা ওই আবক্ষমূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পংকজ চক্রবর্তী বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির ফলে পটিয়ার বিপ্লবীদের চারণভূমি ধলঘাটে ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক ভবন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে। ২০০১ সালে ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে এ ট্রাস্ট ব্যাপকতা লাভ করলেও এর অনেক আগেই আমরা প্রীতিলতার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। স্থানীয় ও জাতীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রীতিলতার বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছে। এ সাংস্কৃতিক ভবনের মাধ্যমে বর্তমান ও আগামী প্রজম্ম বিপ্লবীদের সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের গঠনের পথ সুগম করতে পারবে। বর্তমানে কমপ্লেক্সের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য একটি প্রকল্পের বরাদ্দের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারীভাবে কমপ্লেক্সে লোকবল না দেয়ায় প্রতিমাসের ব্যয়ভার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক ট্রাস্টের সাবেক সেক্রেটারি অরুণ বিকাশ চৌধুরী জানান, বীরকন্যা প্রীতিলতার নামে গঠিত ট্রাস্ট এর যাত্রা ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হয়। এখানে বীরকন্যা প্রীতিলতা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু করি। পরে ২০০৬ সালে ট্রাস্টের উপদেষ্টা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী এ ট্রাস্টের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অজিত দাশ, বিজয় ঘোষ, মোহাম্মদ আলী, অরুণ বিকাশ চৌধুরী, রঘুনাথ চক্রবর্তী, সন্তোষ চক্রবর্তী, কৃষ্ণা চক্রবর্তী, বিশ্বজিত দেব বাবু।

x