‘সংসদের ভিতর-বাহির রাজনীতি’ : জাতীয় ঐক্যের ডাক ও ঐক্যফ্রন্টের করণীয়

প্রফেসর ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
77

১৯২০ সালের শুরুতে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল ছিল ভারতবর্ষ। অহিংস ও অসহযোগ গান্ধিজীর আন্দোলনের আদর্শ। সারাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ। একটানা হরতাল পালন করছে সারা দেশের মানুষ। ব্রিটিশ সরকার স্কুল-কলেজ, নগর-গঞ্জে ‘পিস কমিটি’ গঠন করেও কোন সমাধান বের করতে পারেনি। আন্দোলনের আগুনে পুড়ে মরলো গোরক্ষপুর-চৌরাচুরীতে ৮-১০জন পুলিশ সদস্য। ফলে গান্ধীজি অহিংস আন্দোলন বন্ধ না করলে খেলাফত কংগ্রেসের এ আন্দোলনের ঢেউ কোথায় গিয়ে আছড়ে পড়তো তা ইতিহাসের ব্যাপক আলোচনার বিষয়।
খুব সহসা গান্ধিজী অহিংস অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ ঘোষণা করেন। গান্ধিজী-চিত্তরঞ্জন দাসসহ অধিকাংশ জাতীয় নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে। এ অবস্থায় ভারত নেতৃত্বহারা, দিশেহারা। সারাদেশে সহসা শুদ্ধি সংগঠন, তাবলীগ, তানজীম প্রভৃতি সংগঠন গড়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় রাজনীতি অসহ্য রূপ ধারণ করে। এমন অবস্থায় ব্রিটিশ সরকার আইন সভার নির্বাচন (ডিসেম্বর ১৯২৩) ও মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন ঘোষণা করে। তবে, নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে গান্ধিজী, কংগ্রেস অনড়।
একদিকে খেলাফত-অসহযোগ আন্দোলনে তিক্ত অভিজ্ঞতা অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাষ্প; এ থেকে বাংলাকে রক্ষার উপায় কেবল ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এই চিন্তা থেকে ভবিষ্যৎ বাংলার রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলমান একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার এবং আইন সভার ভিতর-বাহিরের রাজনীতি ও আন্দোলনের ব্রত নিয়ে জেলে বসেই বঙ্গীয় কংগ্রেস-খেলাফত স্বরাজ্য পার্টি গঠন করেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি বাংলার উদীয়মান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এই নব আন্দোলনে সাথী করলেন। এ চিন্তাকে বাস্তব রূপ দিতে তিনি বঙ্গীয় চুক্তি বা ইবহমধষ চধপঃ সম্পাদন করেন।
বাংলার রাজনীতিতে বেঙ্গল প্যাক্টের ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। সমঝোতার ভিত্তিতে এর ধারাগুলো ঠিক হয়েছিল। তাই হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে এটি ছিল অদ্বিতীয়। এর ধারাগুলো—
ক. প্রাদেশিক আইন পরিষদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে এবং পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করে সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা,
খ. স্থানীয় সরকারসমূহে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ৬০ ভাগ এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ৪০ ভাগ প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
গ. সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের শতকরা ৫৫ ভাগ পদে নিয়োগদান করা হবে।
ঘ. ধর্মীয় বিষয়ে কোন আইন সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের ৭৫ ভাগ সদস্যের অনুমোদন ছাড়া উপস্থাপন করা যাবে না। মসজিদের সামনে বাদ্য-বাজনা অনুমোদন করা হবে না। আইনসভার বাইরে এই সকল বিষয়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ঙ. বাংলার প্রত্যেকটি সংস্থায় সংস্থায় সমান সংখ্যক হিন্দু-মুসলমান সমন্বয়ে কমিটি করা হবে। এর দায়িত্ব হবে হিন্দু মুসলমান বিরোধ নিয়ন্ত্রণ কর।
কোকোনাদ কংগ্রেসে ব্যর্থ হয়ে চিত্তরঞ্জন দাস সিরাজগঞ্জের প্রাদেশিক সম্মেলনে বঙ্গীয় চুক্তি অনুমোদন করিয়ে নেন। বঙ্গীয় চুক্তির ধারানুযায়ী আইনসভার নির্বাচনে ব্যপক সাফল্য অর্জন করে এবং মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন ও চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সোহরাওয়ার্দীকে ডেপুটি মেয়র (অল্ডার ম্যান) মনোনীত করেন। উপরন্তু কোকোনাদ কংগ্রেস বঙ্গীয় চুক্তি অনুমোদন করেনি সেই দলই চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে গান্ধীজীর মুক্তির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাসের আকস্মিক মৃত্যু ও তুরস্কে মোস্তফা কামালের খেলাফত বিলুপ্তি ঘোষণা স্বল্পায়ু কংগ্রেস খেলাফত স্বরাজ্য পার্টির প্রয়াসের অপমৃত্যু ঘটায়। ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পুনরাবৃতি হয়।
রক্ত দিয়ে কেনা বাংলাদেশ ত্রিশ লক্ষ শহীদ দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম আর অগণিত মানুষের অকথ্য নির্যাতন নিষ্ঠুরতা; যন্ত্রণার বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির জনক মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের আত্নত্যাগ-আত্নবিসর্জন। এ স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তি তথা শান্তিময় সুখী সমৃদ্ধশীল বাংলাদেশে গড়তে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।
জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলের নেতার বাসভবনে তার কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যুতে শোক জানাতে যান। জাতীয় সমঝোতা সম্ভাবনার বড় দুয়ার উন্মুক্ত হয়। কিন্তু আমরা সেই দুয়ার খুলতে পারলাম না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এর চেয়ে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ঐক্যের রাজনীতি ত্যাগ করেননি।
জাতীয় নানান অনুষ্ঠানে আমরা একসাথে বসি। জাতীয় দিনে, ঈদ, জুমা, পুজা পার্বনে একসাথে মিলিত হই। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত অনেক শক্ত। তাহলে জাতীয় স্বার্থে কেন আমরা একসাথে দাঁড়াতে পারবো না?
একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরে এমনকি নবম সংসদ নির্বাচনে এক পর্যায়ে বিরোধীদল বিএনপি সংসদ বর্জন করে। দশম নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এবার তারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অল্প কয়েকটি আসনে জয়লাভ করে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবে না। তবে জয়ীদের কেউ কেউ শপথ গ্রহণ করতে আগ্রহী বলে পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
একশ বছর পূর্বে চিত্তরঞ্জন দাশ রাজনীতির যে বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেছেন তা তৎকালীন বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। স্বল্প আয়ুর বঙ্গীয় চুক্তি এবং চিত্তরঞ্জন দাশের সংসদের ভিতর বাহির রাজনীতি বাংলা এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বিএনপি কিংবা ঐক্যফ্রন্টের সাম্প্রতিক যে ঘোষণা, তারা সংসদে না গিয়ে মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের নিয়োজিত করবে। সেটি কতটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত তা ভেবে দেখা দরকার। এমন সিদ্ধান্ত তাদের আন্দোলনে কোন ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে কিনা সেটিও ভেবে দেখতে হবে। কিন্তু তারা যদি স্বল্প সংখ্যক সদস্য নিয়েই সংসদে যৌক্তিক কথা বলে তাতে রাজনীতি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তাদের আন্দোলনও ভিতরে বাইরে কার্যকর হিসেবে গতিময় হবে। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন-‘একজনও যদি নায্য কথা বলে, আমরা তার পক্ষে কথা বলবো।’ ঠিক তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে যে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন তাতে সকল বিরোধীদলকে সংসদে এসে ভূমিকা পালন করার আহবান জানিয়েছেন। সেই ডাকে জাতির অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সকল রাজনৈতিক দলের সাড়া দেয়াই সময়ের দাবি বলে সমীচীন মনে করি। এতে করে তাদের সংসদের বাহিরের রাজনীতিও সমান্তরালে সচল রাখতে কোন অসুবিধা হবে বলে মনে করি না।
লেখক : ডিন, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x