সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দক্ষ কর্মী পাঠাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে

জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশীদের জন্য উন্মুক্ত হলো

সোমবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ
43

দীর্ঘ অপেক্ষার পর জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ১৪ খাতে দক্ষ কর্মী প্রেরণে গত ২৭ আগস্ট দেশটির সঙ্গে একটি সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে। পত্রিকান্তরে গত ২৮ আগস্ট এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, জাপানের বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় পরিকল্পনা এজেন্সি এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাপানের পক্ষে দেশটির বিচারবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন সার্ভিস এজেন্সির কমিশনার সই করেন। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাপান দুটি ক্যাটাগরিতে আগামী পাঁচ বছর কেয়ার ওয়ার্কার, বিল্ডিং ক্লিনিং, ম্যানেজমেন্ট, মেশিন পার্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিকস, কনস্ট্রাকশন, জাহাজশিল্প, অটোমোবাইল, কৃষিসহ ১৪টি খাতে বিশেষভাবে দক্ষ এবং জাপানিজ ভাষায় পারদর্শী কর্মীদের নিয়োগ প্রদান করবে। প্রথম ক্যাটাগরির কর্মীরা জাপানিজ ভাষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা অর্জন করলে পরিবার ছাড়া জাপানে পাঁচ বছর পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পাবেন। আর দ্বিতীয় ক্যাটাগরির আওতায় যাদের জাপানিজ ভাষা ও নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা রয়েছে, তারা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজের সুযোগ পাবেন এবং পরিবারকে সঙ্গে রাখতে পারবেন।
একটা সময় ছিল, যখন জাপানে অন্যকোন দেশের শ্রমিক প্রেরণের কথা ভাবাই যেত না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত একতা নীতি অবলম্বন করেছিল জাপান। এজন্যে এদেশের অভিবাসন আইন ছিল অত্যন্ত কঠোর। ফলে সেখানে অন্যদেশের শ্রমিক প্রেরণের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। তারপর একটা সময় এলো যখন সীমিত চাহিদার ভিত্তিতে প্রধানত চীন থেকেই জাপান দক্ষ জনবলের যোগান পেত। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে চীন সরকার বিদেশে শ্রমিক প্রেরণে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছে। তার ওপর চীনা শ্রমিকেরাও বিদেশে বেশি বেতন দাবি করছেন। কাজেই উল্লিখিত কারণে চীন শ্রমিক সংকটে পড়েছে। শ্রমিক সংকটের এ পর্বেই জাপানে আবার সৃষ্টি হয়েছে নতুন শ্রমিকের বিপুল চাহিদা। চলতি বছরের রাগবি বিশ্বকাপ, ২০২০ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক, প্যারা-অলিম্পিকে ও ২০২২ সালে শীতকালীন অলিম্পিকের আয়োজক হওয়া এবং নতুন যুগের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাপক উন্নয়ন হাতে নেওয়ায় এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশ জাপান বিপুল শ্রমিকের অভাব বোধ করছে। এমনতর বাস্তবতায় র্অভিবাসন আইনের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে জাপান প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিকভাবে নিয়োগ তালিকায় আটটি দেশ থাকলেও সে তালিকায় সম্প্রতি বাংলাদেশও যোগ হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট টোকিওতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এ পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের এপ্রিল থেকে কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে দুই ধরনের ভিসা ব্যবস্থা চালু করেছে জাপান। বিদেশি কর্মী যাদের ন্যূনতম কারিগরি শিক্ষা রয়েছে, তারা পাঁচ বছরের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ সময়ের মধ্যে তারা পরিবারের সদস্যদের জাপানে নিতে পারবেন না। আর যারা দক্ষ কর্মী অর্থাৎ গবেষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী তারা জাপানে যতদিন খুশী ততদিন থাকতে পারবেন। সেই সঙ্গে তারা তাদের পরিবারের সদস্যদেরও জাপানে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মোট ১৪টি খাতে বিশেষভাবে দক্ষ এবং জাপানি ভাষায় পারদর্শী কর্মীদের নিয়োগ দেবে জাপান। এটি আমাদের জন্য বিরাট সুযোগ। এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার তথা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ থেকে প্রায় কোটি মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন। কিন্তু জাপানে যাননি। কারণ জাপানে সরকারিভাবে জনশক্তি রফতানির সুযোগ ছিল না। এখন সেই রুদ্ধ দ্বার খুলে গেল। জাপানে বাংলাদেশীদের জন্য কর্মসংস্থানের বন্ধ দরজা খুলে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে জাপানে আয়ের সুযোগ যেমন বেশি তেমনি সেখানকার কর্ম পরিবেশও স্থিতিশীল। তবে এটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হলে আমাদের কর্মীদের দক্ষতার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। এতদিন বাংলাদেশ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যে অদক্ষ বা অর্ধদক্ষ কর্মী পাঠিয়েছে। তাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। কিন্তু জাপানে সেই সুযোগ নেই। সেখানে দক্ষ শ্রমিকেরই চাহিদা বেশি। এটা মাথায় রেখে গমণেচ্ছু কর্মীদের প্রশিক্ষণ কারিকুলাম নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। যেসব খাতে জাপানে শ্রমিক চাহিদা বেশি সেসব খাত মূলত কারিগরি দক্ষতা নির্ভর। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের শ্রমিকের কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর ওপর খুব বেশি জোর দেওয়া অত্যাবশ্যক।
দেশে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের অভাব ও বিদেশি শ্রম বাজারের ক্রমাগত সংকোচনের বাস্তবতায় বাংলাদেশীদের জন্য জাপানের শ্রম বাজারের দ্বার উন্মোচন নিরাশার অন্ধকারে এক চিলতে আলোর ঝলকানি। এটিকে গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে আমাদের দক্ষ শ্রমিক যোগান দেওয়া গেলে আরো বড় সুযোগ তৈরি হবে। কাজেই তাড়াহুড়া না করে, দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করাই শ্রেয় হবে।
জাপান বাংলাদেশের প্রধান দাতা দেশ। তা ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কও ঐতিহাসিক। তাই অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর কারণে বাংলাদেশের সুনামক্ষুন্ন হোক এটা কারো কখনও কাম্য হতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা বিন্দুমাত্র সুনামহানি ঘটলে সুযোগটা শুরুতেই এমন ধাক্কা খাবে, উঠে পড়া মুশকিল হবে। এ কারণে যাদের পাঠানো হবে, তাদের জাপানের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে হবে এবং চাহিদা অনুযায়ী কাজে দক্ষ করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে এক বিন্দু উদাসীনতাও গ্রহণযোগ্য নয়। আশার কথা, জাপানের চাহিদা বিবেচনায় রেখে দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। এরই মধ্যে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সারা দেশে ২৬ টা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে জাপানিজ ভাষার চারমাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়েছে। উপরন্তু র্বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জাপানিজ ভাষা শেখানোর বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা আশা করি, এভাবে সম্মিলিত প্রয়াসে দেশ থেকে দক্ষ কর্মী জাপানে প্রেরণ ত্বরান্বিত হবে।

x