সংগ্রামী দেশনায়ক যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত

সৌভিক চৌধুরী

শুক্রবার , ২৭ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
24

বৃটিশ সরকারের নিপীড়ন আর শোষণের প্রতিবাদে যতীন্দ্রমোহন সোচ্চার ছিলেন ্‌ তিনি ছিলেন এ বিষয়ে প্রতিবাদ মুখর এবং প্রতিরোধপরায়ণ । নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পরিহার করে তিনি নিপীড়িত জনতার সাথে একাত্ম হয়ে প্রতিরোধ করেছেন বৃটিশদের অন্যায় আচরণ । আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে তিনি প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক হতে পারতেন । চট্টগ্রামের জনতার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন । তাঁর এ আন্দোলন শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকেনি পশ্চিম বাংলায়ও তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করেছিলেন ।

উপমহাদেশের সংগ্রামী নায়ক এবং বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের জন্ম ২২ ফেব্রু্লয়ারী, ১৮৮৫, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা গ্রামে। বাবা ছিলেন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী নেতা যাত্রামোহন সেনগুপ্ত এবং মা বিনোদিনী দেবী। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়কালে স্বদেশী আন্দোলনের যে ধারা এই ভারতীয় উপমহাদেশে পড়েছিল ,তার ঢেউ এই চট্টগ্রামেও লেগেছিলো এবং যাত্রামোহন সেনগুপ্ত ছিলেন এর অগ্রভাগে। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী এবং কঠোর সংগ্রামী। তাঁরই পুত্র যতীন্দ্র মোহনের কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামে। তিনি তাঁর পিতার সংগ্রামী দিনগুলো দেখেছেন ছোটবেলা থেকেই। তাই পিতার জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বাল্যকালেই এবং জীবন যাপনে অমিত চরিত্রবলের অধিকারী হয়েছিলেন যতীন্দ্রমোহন। কর্মে প্রগাঢ় নিষ্ঠা এবং সংকল্পে অটল থাকার কঠিন শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি। ১২ ভাই বোনের মধ্যে যতীন্দ্র মোহন ছিলেন তৃতীয়। যতীন্দ্র মোহনের শিক্ষা জীবন শুরু হয় কলেজিয়েট স্কুল এবং সেন্ট প্লাসিড স্কুলে। তিনি কোন স্কুলে একনাগাড়ে পড়াশুনা করেননি। কোলকাতা হেয়ার স্কুল থেকে ১৯০২ সালে প্রবেশিকা পাশ করে সেখানকার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তিনি। ১৯০৪ সালে লন্ডনের কেম্ব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাউনিং কলেজে ভর্তি হন যতীন্দ্র মোহন । সেখান থেকে ১৯০৭ সালে বি. . পাস করে লন্ডনের গ্রেজ ইন (এৎবু্থং ওহহ) থেকে ব্যারিস্টারী সনদ নেন। লন্ডনে অবস্থান কালে বৃটিশ গ্রে পরিবারের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং সে পরিবারের কন্যা নেলী গ্রে’র সাথে ১৯০৯ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যতীন্দ্রমোহন। বিবাহ পরবর্তী নেলী গ্রে হন নেলী সেনগুপ্ত। যতীন্দ্র মোহন বিলেত থেকে ব্যারিস্টারী ডিগ্রি অর্জনের পর দেশে ফিরে ১৯১০ সালে কোলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন কিছুদিন এবং কিছুকাল তিনি কোলকাতা রিপন কলেজে অধ্যাপনা করেন। আইন পেশায় নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি উদীয়মান ব্যারিস্টার হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন।

একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে যতীন্দ্রমোহনের পরিচিতি ছিল । টেনিস, ক্রিকেট এবং রোইংএ তিনি ছিলেন পারদর্শী, ছাত্রাবস্থায় এ তিনটি বিভাগেই তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন । খেলাধুলায় আগ্রহীদের তিনি বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন। এ জন্য কোলকাতা এবং চট্টগ্রামে বেশ কিছু স্পোর্টস ক্লাব তিনি গঠন করেছিলেন ।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বৃটিশ সরকার তাদের বিরুদ্ধবাদী বিপ্লবীদের দমন করার জন্য কুখ্যাত ‘ভারত রক্ষা আইন’ প্রবর্তন করে। এ আইনের বলে বৃটিশ সরকার বহু বিপ্লবীদের গ্রেফতার করে এবং এর প্রতিবাদে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সভায় যতীন্দ্রমোহন তেজদীপ্ত এবং সুশৃঙ্খল ভাষনে দেন যা ছিল তাঁর প্রথম (গধরফবহ ঝঢ়ববপয) বক্তৃতা। দেশবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন যতীন্দ্রমোহনই হবেন তাঁর উত্তরসূরী এবং এর মাধ্যমে চিত্তরঞ্জন এবং যতীন্দ্রমোহনের মধ্যে গুরুশিষ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

১৯২৩ সালের ০১ জানুয়ারী সর্বভারতীয় স্বরাজ দল (অষষ ওহফরধ ঝধিৎধল চধৎঃু) গঠিত হলে এর সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচত হন যথাক্রমে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এবং মোতিলাল নেহেরু। এ দলটির প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ছিলেন যতীন্দ্রমোহন। বৃটিশ ভারতে চট্টগ্রাম ছিলো শিল্পবাণিজ্যের অন্যতম স্থান। এখানে উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানী হতো। শ্রমিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে বৃটিশ কোম্পানীগুলো প্রচুর টাকা মুনাফা করতো। কিন্তু শ্রমিকদের দাবী দাওয়ার প্রতি তাঁরা ছিলো উদাসীন। যতীন্দ্র মোহন উপলব্ধি করলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবীদাওয়া আদায়ের জন্য ইউনিয়ন থাকা প্রয়োজন। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের কর্মীরা শ্রমিকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করবে। শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে কংগ্রেসকর্মীরা অগ্রণী হবে। বৃটিশ প্রতিষ্ঠান বার্মা অয়েল কোম্পানী এবং সমুদ্রগামী জাহাজ প্রতিষ্ঠান বৃটিশ ইন্ডিয়া স্টীম নেভিগেশন কোম্পানী কার্যালয় ছিলো চট্টগ্রামে। এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃটেনে স্থানান্তারিত হতো। কিন্তু শ্রমিকরা পেতো স্বল্প পারিশ্রমিক। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যরা ১৯২১ সালের ১৭ এপ্রিল ধর্মঘটে নামেন। ইউুনিয়নের সভাপতি ছিলেন যতীন্দ্রমোহন। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বের ফলে বৃটিশ সরকার বাধ্য হয়েছিলো শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী পূরণ করতে। জাতীয়তাবাদী পত্রিকাগুলো অভিনন্দন জানায় যতীন্দ্রমোহনকে। ১৯২১ সালে পূর্ববাংলায় বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র মাত্রায় রুপ নেয় । যতীন্দ্রমোহন এ সময় বার্মা অয়েল কোম্পানী এবং আসাম বেংগল রেলওয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত করেন এবং গ্রেফতার হন । সহধর্মিনী নেলী সেনগুপ্ত এ সময় রাস্তায় নামেন এবং বিদেশি পণ্য বর্জনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন এগিয়ে নেন । নেলী সেনগুপ্ত একজন বৃটিশ হয়েও স্বামীর দেশপ্রেমের অনুগামী হয়ে স্বাদেশিকতার এক উদাহরণ সৃষ্টি করেন । তীব্র আন্দোলনে বৃটিশ সরকার সেসময় যতীন্দ্র মোহনকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । যতীন্দ্রমোহন ধর্মঘটি শ্রমিকদের পরিবার চালানোর জন্য ব্যাংক থেকে ৪০,০০০/= ধার নেন । এ অবদানের জন্য জনগণ তাঁকে “দেশপ্রিয়” উপাধিতে ভ্থষিত করেন । অভিহিত করে টহপৎড়হিবফ করহম ড়ভ ঈযরঃঃধমড়হম বা চট্টগ্রামের মুকুটহীন রাজা। বাংলার মনীষী যিনি স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের প্রয়াণের পর সর্বভারতীয় স্বরাজ্য দলের নেতৃত্ব শূন্যতা সৃষ্টি হয়। যতীন্দ্রমোহনকে অনুরোধ করা হয় সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার। কিন্তু তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। মাহাত্মা গান্ধীর বিশেষ অনুরোধে এবং কোলকাতা কর্পোরেশনের অধিকাংশ কাউন্সিলরের সমর্থনে তিনি ১৯২৫ সালে স্বরাজ্য দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ছিলো বলেই এটি সম্ভব হয়। ১৯২৫ সালের কোলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের প্রাক্কালে এর মনোনয়ন নিয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু যতীন্দ্রমোহনের মনোনয়ন নিয়ে অধিকাংশ কাউন্সিলর বিরোধীতা করলেও মাহাত্মা গান্ধীর পরামর্শে তিনি মেয়র প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। যতীন্দমোহনের উপর এতটাই অগাধ বিশ্বাস এবং আস্থা ছিল মাহাত্মা গান্ধীর যে তিনি নিজে যেমন জানতেন তাঁর নেতৃত্বের দূরদর্শীতা ঠিক তেমনি তাঁকে অবিসাংবাদিত ভবিষ্যত নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সবার মাঝে প্রভাব খাটানোর ব্যাপারেও সফল হয়েছিলেন মাহাত্মা গান্ধী। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর কোলকাতা শহরের উন্নতি সাধন করেছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের লোক হয়েও তিনি কোলকাতার উন্নয়নে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরের বছর ১৯২৬ সালের এপ্রিলে কোলকাতার বড় বাজারে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মোকাবেলা করতে হয় যতীন্দ্রমোহনকে। সেই সময় কোলকাতা নগরের বিশিষ্ট হিন্দু ও মুসলিম নেতাদের সাথে নিয়ে তিনি দাঙ্গা মোকাবেলা করেছিলেন। গঠন করেছিলেন শান্তি কমিটি। বড়বাজারের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামানোয় তাঁর সাহসী ভ্থমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য । নিতান্ত তুচ্ছ কারণে এ দাঙ্গায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তিনি একাই বেড়িয়ে পড়েন দাঙ্গাবাজদের নিবৃত্ত করতে । পরবর্তীতে তাঁর সাথে যোগ দেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, প্রফুল্ল সেন প্রমুখ ।

১৯২১ সালে চট্টগ্রামে আসাম বেঙ্গল রেল ধর্মঘট এক ঐতিহাসিক রাজনেতিক কর্মসূচি । রেলের কর্মচারিদের প্রতি বৃটিশ সরকার সব সময়ই ছিল উদাসিন। যতীন্দ্রমোহন আসাম বেঙ্গল রেল কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন । এ ধর্মঘট কেবল সাধারণ শ্রমিক ধর্মঘট নয় , ঘটনা বিবর্তনে , স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশেষ কর্মকান্ডের রুপ পরিগ্রহ করেছে ক্রমশ:, আসাম বেঙ্গল রেল ধর্মঘট। এই ধর্মঘট বস্তুত এই উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক ধর্মঘট । যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত পরিচালিত এ ধর্মঘট বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলনের পথনির্দেশক হিসেবে গন্য হওয়ার দাবি রাখে । তিনি এ আন্দোলন করতে গিয়ে সরকারের নির্যাতন এবং কারাভোগ করেছেন কিন্তু পিছপা হননি , শ্রমিকদের অধিকার তিনি আদায় করতে পেরেছিলেন ।

১৯৩০ সালে বার্মাকে ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিলেন বৃটিশ সরকার। তৎকালীন বার্মার গভর্ণর চার্লস ইনেস ছিলেন এ বিচ্ছেদের হোতা। তিনি বার্মাবাসীকে বুঝিয়েছিলেন যে, বার্মা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হলে উপকৃত হবে। কিন্তু বার্মার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এর বিরোধী ছিলেন। ঘটনাচক্রে যতীন্দ্রমোহন সিঙ্গাপুর ভ্রমণশেষে বার্মার রেঙ্গুনে যাত্রা বিরতি করেন এবং বার্মার নেতারা তাঁকে ঝবঢ়ধৎধঃরড়হ ঙভ ইঁৎসধ ভড়ৎস ওহফরধ এবং ওহফরধ ইঁৎসধ ঊহঃরঃু বিষয়ে বক্তৃতা দেবার অনুরোধ করেন। যতীন্দ্রমোহন জনসভায় বার্মাকে ভারত থেকে বিভক্ত করার বৃটিশ চক্রান্তের বিরুদ্ধে ভাষণ দেন এবং এর ফলে তিনি চার্লস ইনেসের রোষানলে পড়েন। তিনি গ্রেফতারী পরোয়ানা পাঠিয়ে যতীন্দ্রমোহনকে রেঙ্গুনের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। এবং আদালত যতীন্দ্রমোহনকে ১০ দিনের কারাদন্ড দেন। উল্লেখ্য , ইতোপূর্বে কোন রাজনৈতিক ভারতীয় নেতাকে বার্মার আদালতে উপস্থিত করা হয়নি। যতীন্দ্রমোহনই প্রথম ভারতীয় যিনি এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। এর বিরুদ্ধে কোলকাতায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। দশদিন কারাভোগের পরে যতীন্দ্রমোহন কোলকাতায় ফিরে এলে তাঁকে জনগণ বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেন।

যতীন্দ্রমোহন জনতার আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অকুতোভয়, নির্ভীক নেতৃত্বের কারনে তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন বিভিন্ন সময়। ১৯৩০ সালে জালিয়ান ওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে অমৃতসরের এক জনসভায় তাঁর বৃটিশ বিরোধী ভাষনের প্রেক্ষিতে বৃটিশ সরকার তাঁকে এক বছরের কারাদন্ড দেয়। ভারতের জনগন এটি মেনে নেয়নি। তীব্র প্রতিবাদ করে। তাঁর কারাদন্ডের বিরুদ্ধে যতীন্দ্রমোহনের স্ত্রী শ্রীমতি নেলী সেনগুপ্ত রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। তাঁকেও পুলিশ গ্রেফতার করে ৪ মাসের কারাদন্ড প্রদান করে। তিনিও বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে যতীন্দ্রমোহনের পাশে ছিলেন । ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে তিনি পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত হন ।

যতীন্দ্রমোহন সেই বাঙালী যিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার চট্টগ্রামের সীমানা পেরিয়ে ১৯২৫ সাল থেকে কোলকাতার ৫ বার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন । তাঁর জনপ্রিয়তা এবং কর্মকুশলতাই এনে দিয়েছিলো এই সম্মান । ১৯৩০ সালে তিনি কারাগারে বন্দী অবস্থ্‌ায় মেয়র নির্বাচিত হন । ১৯২৫ সালের কথা , যখন কোলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে তখন প্রশ্ন এসেছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রয়ানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘স্বরাজ দলের’ হাল কে ধরবে এবং কে হবে মেয়র । মহাত্মা গান্ধী জোরালো কন্ঠে বলেছিলেন -“ জাতির এই সংকটময় মুহূর্তে , এই বিপদজনক পরিস্থিতিতে , জাতির স্বার্থ সংরক্ষনের জন্য বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রয়োজন । আমার সুচিন্তিত মত ু একমাত্র যতীন্দ্রমোহন নেতৃত্ব দেওয়ার শক্তি রাখেন । দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত । ” এ বক্তব্য যতীন্দ্রমোহনের নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাঁর মেয়র হবার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না , কোলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তি থেকে শুরু করে তাঁর মেয়র হবার পথ রুদ্ধ করেছিলেন । তাঁর কোলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা না হবার বিষয়টি মেয়র নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি । বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে , দেশের সর্বত্র চলছে আইন অমান্য আন্দোলন। রেঙ্গুন থেকে ফিরে আসার পর যতীন্দ্র মোহনের বিশ্রাম নেই। ইতিমধ্যে ১৯৩০৩১ সাল মেয়াদে কোলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। করপোরেশনের সভায় মেয়র পদে প্রার্থীতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয় এবং কর্পোরেশনের বাইরে অগণিত মানুষ ভীড় করে আছে মেয়র পদে যতীন্দ্রমোহনের নির্বাচনের ব্যাপারে। ১৯৩০ সালে “দেশের ডাক ” নামে একটি পত্রিকার বৃটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষনার প্রতিবাদে যতীন্দ্রমোহন রাস্তায় নামেন এবং ৬ মাসের কারাদন্ড ভোগ করেন। কারাদন্ড ভোগের এ সময়ে কোলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং একজন যোগ্য প্রার্থীও খোঁজ করছিলেন সবাই । ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় ও শরৎ চন্দ্র বসু নাম প্রস্তাব করেছিলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের। বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৫ম বারের মতো তিনি মেয়র নির্বাচিত হলেন । বাঙালীর ইতিহাসে এটা এক বৃহৎ বিজয় । এ যেন এক অবিস্মরণীয় বিজয়। সমস্ত কোলকাতাবাসী আবেগে আপ্লুত , কঠোর সংগ্রামী এবং জনদরদী মানুষ নির্বাচিত হলেন মেয়র হিসাবে।

বৃটিশ সরকারের নিপীড়ন আর শোষণের প্রতিবাদে যতীন্দ্রমোহন সোচ্চার ছিলেন ্‌ তিনি ছিলেন এ বিষয়ে প্রতিবাদ মুখর এবং প্রতিরোধপরায়ন । নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পরিহার করে তিনি নিপীড়িত জনতার সাথে একাত্ম হয়ে প্রতিরোধ করেছেন বৃটিশদের অন্যায় আচরন । আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে তিনি প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক হতে পারতেন। চট্টগ্রমের জনতার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। তাঁর এ আন্দোলন শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকেনি পশ্চিম বাংলায়ও তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করেছিলেন । এই ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁর আন্দোলন সংগ্রামের কথা ছড়িয়ে পড়েছিলো।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া অনেক বিপ্লবী যুবককে যতীন্দ্রমোহন আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন বিনা পারিশ্রমিকে। যারা সরকারের রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় জড়িত হয়ে কারাগারে অন্তরীন ছিলো তাদের মধ্যে সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবতী, সন্তোষ মিত্র সহ অনেক যুবককে বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনার মাধ্যমে আদালতের মুখোমুখি হয়ে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর এই উদারতা ও সহমর্মীতা বিপ্লবী যুবকদের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংগ্রামের প্রেরণা যুগিয়েছিলো অনেকাংশে।

ক্ষণজন্মা অকুতোভয় যতীন্দ্রমোহনের নেতৃত্বের সুদৃঢ়তায় বৃটিশ সরকার অত্যন্ত ভীতবিহ্বল ছিলো। বিভিন্ন সময় কারাগারে অন্তরীন রেখে তাঁকে আন্দোলন সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছিলো তারা। কিন্তু জনগণের অন্তহীন নিখাদ ভালবাসা তাঁকে কারাগার থেকে বের করে আনে। তখন বৃটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো , যতীন্দ্রমোহনকে দূরে কোথাও বন্দীনিবাসে স্থানান্তর করতে হবে। তাই ১৯৩৩ সালের ৫ জুন রাঁচিতে নগেন্দ্র লজ নামের এক বন্দীনিবাসে তাঁঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ছিলো নীরব ও জনবিচ্ছিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। স্বাভাবিক জীবনে দেশপ্রিয় আলাপী মানুষ, বন্ধুবৎসল। যার জীবনব্যাপী সম্পৃক্ততা ছিলো মানুষের সাথে, যার সময় কেটেছে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে, একাকীত্ব আর মানসিক নির্যাতনের ফলে সেই লোকটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে । অনেক চেষ্টা সত্বেও তাঁর এ অবস্থ্‌ার উন্নতি ঘটানো যায়নি। ১৯৩৩ সালের ২৩ জুলাই উপমহাদেশের এই সিংহ পুরুষ সবাইকে কাঁদিয়ে ধরাধাম ত্যাগ করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁর অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ। বিশ্বকবির অমূল্য বাণীর প্রতিধ্বনি করে বলি

এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ

মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান ।”

x