‘শয়তান আস্ত খবিশ’

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
40

তিনি মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সাথে মসজিদের খতিবও। নাম আবুল খায়ের বেলালী। তাঁর মধুকন্ঠের বয়ান শুনতে শুক্রবার জুমার নামাজের একঘন্টা আগে থেকে মুছল্লিরা ভীড় করেন। সিলেটের বালুচর কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাশ করেন। নেত্রকোনার বাদে আঠারবাড়ি মা হাওয়া(আ:) কওমি মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ তিনি। মাদ্রাসায় ৩৫ জন ছাত্রী আবাসিক। মৌলানা বেলালীও আবাসিক।
শুক্রবার ১১ বছরের একজন ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে লোকজন পিটুনি দিয়ে তাকে পুলিশে হাওলা করে। বাংলাদেশ পুলিশের ভ্যারিফাইড ফে বু পেইজে নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শাহজাহান মিয়া আটক বেলালীর অপরাধ নিয়ে একটি পোষ্ট দেন। বেলালীর স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তিনি লিখেন, প্রায় প্রতিদিন সুবিধামত সময়ে বেলালী একজন ছাত্রীকে তাঁর রুমে ডেকে নিয়ে শরীরের স্পর্শকাতর অংশ মালিশ করাতেন। তারপর চড়াও হতেন শিশুটির উপর। শিশুদের ভয় দেখিয়ে নিয়মিত তিনি জৈবিক ক্ষুধা মিটাতেন। কেন্দুয়ার আক্রান্ত ছাত্রীটি কান্নাকাটি শুরু করলে লোকজন তাকে উদ্ধার করে বেলালীকে পুলিশের হাতে দেন। বেলালী ৪ থেকে ১১ বছর বয়সী মাদ্রাসার বহু ছাত্রীর উপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছেন বলে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বায়তুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিনকে এক নির্যাতিতা ছাত্রীর মায়ের অভিযোগ পেয়ে গ্রেপ্তার করে জঅই এর একটি টিম। যৌন নিপীড়নের শিকার তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রীটি মাদ্রাসায় যেতে চাইতোনা, মা জোর করে পাঠাতেন। তার মা কদিন আগে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আটক শিক্ষকের ভিডিও ক্লিপ দেখার সময় শিশুটি মাকে প্রশ্ন করে, ‘মা এই স্যারকে ধরলো, আমাদের হুজুরকে ধরেনা কেন? হুজুরওতো আমাদের সাথে এসব করে’। সঙ্গে সঙ্গে মা প্রচন্ড ধাক্কা খান। তিনি বিষয়টি জঅই-১১কে জানান। অভিযোগ পেয়ে গ্রেপ্তার করা হয় অধ্যক্ষ আল আমিনকে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেন, শয়তানের প্ররোচনায় তিনি এসব করতেন! গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে আল আমিন বলেন, আমার ফাঁসি হওয়া উচিত। অধ্যক্ষ আল আমিন গত ক’বছরে অন্তত ১২ শিশু শিক্ষার্থীর উপর যৌন নিপীড়ন বা নিপীড়নের চেষ্টা করেছেন।
আরো আগে ২৭ জুন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ মিজমিজির অক্সফোর্ড হাইস্কুল শিক্ষক আরিফুল ইসলাম অন্তত ২০ ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আটক হন। এদের একেক জনের অপরাধের ধরন একেক রকম। শিক্ষক আরিফ কৌশলে ছাত্রীদের ফাঁদে ফেলে যৌন লালসা মিটানোর পাশাপাশি ভিডিও করে তাদের আতঙ্কে রাখতেন। ওসব দেখিয়ে মা’দেরও শিকার করতেন। তার কয়েকটি স্মার্টফোন থেকে প্রচুর ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করেছে জঅই.। আল আমিন শিকারকে কোরান শপথ করাতেন, পরকালের ভয়ও। আর বেলালী বেহেশতের টোপ গিলাতেন। প্রকাশ করলে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কারসহ আরো আতঙ্কের চাদর ঝুলাতেন। অবুঝ শিশুরা ভয়ে চুপ থাকতো।
এসব কী ঘটছে দেশে? সুবক্তা হুজুরেরা ফে বু, ইউটিউব, মাহফিল, মাসজিদে ওয়াজ-বয়ানে মানুষকে কান্নার নোনায় ভাসাচ্ছেন- আবার নেক আমলের সুবাদে বেহেশতের অফুরান নেয়ামতের ভান্ডারের মুখ খুলে খুশীর জোয়ারে তুলে নাচাচ্ছেন! তাদের কেউ কেউ এসব কী করছেন? নাকি শয়তান তাদের উপর ভর করে প্রক্সিতে অবিশ্বাস্য পাপাচার করাচ্ছে! যা আল আমিন হুজুর বলেছেন! শয়তানের ওষুধতো আস্তাগফেরুল্লাহ। মাদ্রাসায় কী তা ঠিকমতো শেখানো হয়নি? শয়তান এতো খবিস হয়ে গেলেতো দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা, হেফজখানা, মক্তবের হুজুরদের জন্য মহা বিপদ সংকেত অপেক্ষা করছে! তার চে’ও ভয়াল বিভীষিকা ভোগ করতে হবে অবুঝ ও নিরীহ ছাত্র-ছাত্রী বিশেষ করে ছাত্রীদের! খবিস শয়তানকে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা দ্রুততম সময়ে না নিলে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ও শিক্ষকদের মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হবে। শুধু দু’জন যৌন বিকারগস্ত মাদ্রাসা অধ্যক্ষ আটকের ঘটনাতো সাগরে নিমজ্জমান হিমশৈলের ডগামাত্র! ভিতরে বিশাল মূল অংশ লুকিয়ে আছে নিশ্চয়ই। আলামতে স্পষ্ট, এটা নমুনা এবং টুকরো ঘটনা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যৌনবিকারের শিকড় কতো গভীরে ঢুকেছে, তা খুঁজে বের করার দায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। না হলে ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসে আঘাত আসতে পারে, যা দেশ ও জাতির জন্য সুখকর নয়। আটক দু’ শয়তানের চেলার তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি মাদ্রাসা শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও উঠা উচিত। এতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। স্কুল শিক্ষক আরিফ সাহেব একজন ভয়ঙ্কর যৌন বিকারগস্ত, এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। শিক্ষকতার মত আদর্শ ও পবিত্র পেশা থেকে এ’ ধরনের জঘন্য কীটদের কীভাবে নির্মূল সম্ভব, তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সতর্ক ও কার্যকর প্রতিরোধক গ্রহণ জরুরি। না’হলে রাজনীতির পাশাপাশি আমাদের সকল মৌলিক এবং আদর্শিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে যাবে। যার আলামত ইতোমধ্যে নতুন নতুন অপরাধ প্রবণতা ও মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার মাঝে স্পষ্ট হয়ে গেছে। কেন এমন হচ্ছে! জঘন্য অপকর্মের মুখ হঠাৎ খুলে গেলে অদৃশ্য শয়তানের উপর কেন দায় চাপানো হচ্ছে? এটাও কী ধর্মের ডুগডুগি বাজিয়ে আবেগের ঢেউ তোলার কৌশল, নাকি বিকার? বিকার হলে এমন মনোবিকারের সুচিকিৎসার জন্য সমাজতাত্ত্বিক, মনোবিজ্ঞানী, অপরাধ বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলাদা বিশেষ সেল গঠন করা যায় কিনা, বিবেচনায় রাখা উচিত। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকার এই দায় এড়িয়ে যেতে পারেনা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ, মক্তব ও ধর্মীয় স্থাপনার পবিত্রতা রক্ষার দায় অভিভাবক, শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ,স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোন পক্ষই এড়িয়ে যেতে পারেনা। কারণ আমাদের সন্তানেরা ওখানেই শিক্ষা নিচ্ছে। কোমলমতি শিশু এবং শিক্ষার্থীর মনোজগতে যারা বিভীষিকার ভয়াল ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে, এদের কাউকে ছাড় দেয়া যায়না। সর্বোচ্চ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই তাদের প্রাপ্য। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার বিভীষিকা এখনো পুরো জাতিকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এরপরও একে একে অনেক শয়তানের চেলা বেরিয়ে আসছে শিক্ষায়তনের পবিত্র অঙ্গন থেকে! এই বর্বরতা আর মানা যায়না। কোনভাবেই নয়।
একান্ত অনুভূতি: খুবই প্রিয়জন আমার। মোহরার ঐতিহ্যবাহী কাজী বাড়ির কাজী আবু তাহের। সর্বক্ষণ হাসিখুশি, প্রাণবন্ত একজন নীরব দাতা। সম্পর্কে বেয়াই, জেষ্ঠপুত্র উপলের শ্বশুর। প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী এবং মানবতার অক্লান্ত পতাকাবাহী। হঠাৎ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ইতালি হয়ে ইউরোপ বেড়াতে যান মে মাসের শেষ সপ্তাহে। সাথে বেয়াইন ও সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ ছোট মেয়ে ইশমাম। ২৪ জুন ইতালির মিলান থেকে দেশে ফেরার কথা। কিন্তু ফিরেছে তাঁর কফিনবন্দি লাশ, তাও ৩ জুলাই! গোছগাছ করার সময় ২৩ জুন বিকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, বমি হয় ক’দফা। পরপরই স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বলা হয়, ‘ম্যাসিভ কার্ডিয়াক এ্যরেষ্ট’! তিনদিন লাইফ সাপোর্টে থেকে চিরবিদায় নেন। ২৬ জুন মিলানের প্রধান মসজিদ চত্বরে প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। ওনার তিন শ্যালক ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও লন্ডনে ব্যবসা করেন। নিজের ভাই লন্ডনে। আগেই সবাই ছুটে আসেন। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। বউমার কোলে আমার নাতি। ২৩ জুন রাতে খবর পেয়ে বউমা শিমুল পাগলিনী প্রায়। মিলানে ছোট মেয়ে ইশমামও অজ্ঞান! তাকেও ২ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে রাখতে হয়। আর বেয়াইর মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে। টার্কিস এয়ারে ৩ জুলাই ভোরে কফিন ঢাকা আসে সব আত্মীয়সহ। সকাল ন’টায় চট্টগ্রাম। ৩ জুলাই চান্দগাঁও আ/এলাকার মসজিদে বাদ জোহর দ্বিতীয় ও বাদ আসর মোহরা কাজী বাড়িতে শেষ দফা নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তিনি চিরশয়ানে চলে যান। তাঁর অসুস্থতার পর থেকে মোহরা কাজী বাড়িতে শোকার্ত মানুষের ঢল নামে রাতদিন। বাড়ির রেওয়াজ অনুযায়ী সবাইকে আপ্যায়িত করা হয়। অবিশ্বাস্য হচ্ছে, তাঁর বিশাল মানব সেবার আওতা কখনো বোঝা যায়নি, বুঝতে দেননি! মৃত্যুর পর অসংখ্য মানুষের আহাজারি থেকে উঠে আসে কিছু নমুনা। মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের সুযোগ হয়নি, তবুও শেষ জানাযায় হাজার হাজার মানুষের জমায়েতে কাজীবাড়ি ডুবে যায়। অবিশ্বাস্য মানবতাবাদী এবং অতিথি বৎসল ক্ষণজন্মা প্রিয় মানুষটি মাত্র ৫৮ বছরে চলে যাবেন, ভাবতেও পারিনি! মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে জান্নাত নসিব করুন।

x