শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১৭ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০১ পূর্বাহ্ণ
27

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিয়োগান্তক সময় ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং পরবর্তী ২১ বছর। এই সময়টা ছিল শুধুই ষড়যন্ত্র আর ইতিহাস বদলে ফেলার নিষ্ঠুরতম সময়। দীর্ঘ গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের পথ পরিক্রমা, মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ধাপগুলোকে গুরুত্বহীন করে তোলার আত্মঘাতি প্রচেষ্টা এরই মধ্যে বেড়ে ওঠে কয়েক প্রজন্ম ভুল পাঠ নিয়ে, ভুল শিক্ষা নিয়ে, ভুল ইতিহাসের পাঠ পরিক্রমায়। সেখানে বঙ্গবন্ধু নেই, ৫২ নেই, ৫৪ নেই, ৫৭ নেই, ৬৯ নেই! নেই ৭ মার্চ। নেই ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে মুক্তিসংগ্রামের রক্তাক্ত পথের কথা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের বীরগাঁথা নেই। এক ধরনের শূন্যতায় স্থান করে নিয়েছিল অপরাজনীতি। প্রগতিশীল রাজনীতির স্থান দখল করে নিয়েছিল ধর্মকে পুঁজি করার রাজনীতি।
বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত নায়ক খল নায়ক নয়- এটা প্রতিষ্ঠা করতে করতে চলে যায় দীর্ঘ সময়। তাঁকে ঘিরে যে আলোক রশ্মির বলয় ছিল, তাঁর সংগ্রামের যারা সাথী ছিল তাঁদের সবাইকে চেনার জানার বুঝার সময়ই যেন হয়ে ওঠেনি আর। এক কলহমুখর পঙ্কিল রাজনীতি আমাদের জানতে দেয়নি অনেক কিছু। অনেক আলো ছড়ানো অনেক উৎসর্গকৃত প্রাণ, অনেক ত্যাগের মহিমা যা আমাদের সমৃদ্ধ করতে পারত তাদের অনেককেই আমরা জানি না। বেগম মুজিব, ফজিলাতুন্নেসার অবদান আমরা কটুকুই বা জানি, আমাদের আন্দোলন সংগ্রামের পুরো অংশ জুড়েই রয়েছে এই মহীয়সী নারীর অনন্য এবং সাহসী ভূমিকা। এমন সংগ্রামী নারীকে অপপ্রচারের কাদায় ডুবানোর প্রচেষ্টা হয়েছে বারে বারে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মত। গোয়েবলসকেও হার মানানোর মত মিথ্যাচারে জর্জরিত করা হয়েছে। যাক সেই অধ্যায়ের শেষ এখন। দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও উচিত বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আলোকরশ্মির বলয় তৈরি করা, প্রতিটি নক্ষত্রকে যথাযোগ্য মর্যাদায় তুলে ধরা। অতিরঞ্জন বা অতিকথনের প্রয়োজন নেই।
উপমহাদেশের রাজনৈতিক বরেণ্য নেতাদের স্ত্রী-রা সবসময় আন্দোলন সংগ্রামের অংশীদার হয়েছেন এমন নয়। সে ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গিনী। আজীবন বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের বিশ্বস্ত সাথী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে জেল খেটেছেন। সংসারের হাল ধরতে পারেননি। অন্তরালে থেকেই সংসার এবং দলের হাল ধরেছেন বেগম ফজিলাতুন্নেসা। বঙ্গবন্ধুর জীবন ঘিরেই ছিল তাঁর অসামান্য প্রভাব। তার প্রজ্ঞা ধী শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বরাবরই বঙ্গবন্ধুকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাসম্পন্ন ও দায়িত্ববান। বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে সহধর্মিণীর অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন, ৬ দফা কর্মসূচি সফল করার পেছনেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বঙ্গবন্ধু দল চালাতে যখনই আর্থিক সংকটে পড়েছেন তখনই পিতৃ সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ বিনা দ্বিধায় তিনি দলের জন্য দিয়ে দিতেন। এমন কি তিনি সংসারের জন্য নিজের অলংকার তো বটেই আসবাব পর্যন্ত বিক্রি করেছেন এ-নিয়ে তাঁর কোন দুঃখবোধ ছিল না। তিনি জানতেন বঙ্গবন্ধু কি চাচ্ছেন এবং দেশের মানুষ কি চায়।
১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন বঙালি সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্য এবং পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা করে পাকিস্তান সরকার। যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হলে বাংলার জনগণ তাঁর মুক্তি দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া হয়। তিনি একটুও বিচলিত না হয়ে আইনী লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় লাহোরে গোল টেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই প্যারোলে মুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বেগম মুজিব। কারাগারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিষেধ করেন তিনি যেন প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর বেঠকে না যান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালি জাতি এখন ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। তাই হলো, এই আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানের। বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। বেগম ফজিলাতুন্নেসর এই সিদ্ধান্ত এক ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। জীবন সংগ্রামের সব কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে তিনি দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর সাথে নিজেকেও জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তিনি একাত্ম হয়ে পড়েছিলেন সংগ্রামী জনতার সাথে। বঙ্গবন্ধু জেলখানায় থাকা অবস্থায় তিনি দেখা করতেন এবং পরিস্থিতি ও তথ্য জানিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে দলকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করতেন। এমনকি ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বেগম ফজিলাতুন্নেসার পরামর্শই গ্রহণ করেছিলেন। সেই টান টান উত্তেজনার মুহূর্তে অনেকেই অনেকরকম পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম মুজিব তাঁকে বলেছিলেন- তুমি সারাজীবন আন্দোলন সংগ্রাম করেছো জেল খেটেছো তুমি জানো কী বলতে হবে। তোমার মনে যে-কথা আসবে তুমি সেই কথাই বলবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে ছিল বেগম মুজিবের মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন।
বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সঙ্গী শেখ ফজিলাতুন্নেসার জন্মদিন ছিল ৮ আগস্ট। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। বঙ্গবন্ধুর চাচাত বোন ছিলেন তিনি। মাত্র ৫ বৎসর বয়সে পিতৃমাতৃহীন হলে বঙ্গবন্ধুর মায়ের কাছে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর ১২/১৩ বৎসর বয়সে তার সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৩০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের কালো রাতে তিনি জাতির পিতার হত্যাকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
বেগম ফজিলাতুন্নেসার বিশালত্বের অজানা তথ্য কতটুকুই বা আমরা জানি। বাঙালির স্বাধীকারের দীর্ঘ সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে তিনি ছিলেন। ছিলেন দায়িত্ববান স্ত্রী ও মমতাময়ী মা হিসেবেও। পাঁচ সন্তানের প্রতিটি সন্তানকে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। রাসেল ছিল তাদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। সাত বছরের শিশু রাসেলকেও হত্যাকারীরা পরিবারের আর সবার সাথে খুব নির্দয়ভাবে হত্যা করে ১৫ আগস্টের সেই কালো রাতে।
বিনম্র শ্রদ্ধা ১৫ আগস্টে নিহত বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সবার প্রতি।

x