শেক্সপীয়ারের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ

গ্রন্থ আলোচনা

শাহরিয়ার আদনান শান্তনু

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
62

পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে ,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া।
যাত্রাপথের আনন্দ-গান যে গাহে
তারি কণ্ঠে তোমারি গান গাওয়া ।
‘শেক্সপীয়ারের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ’ নামের এই বইটি হাতে পাওয়ামাত্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পথের গান’এর এই বাণী মনে পড়ে গেল। মীযান রহমান-এর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি শুধু যে ভ্রমণ কাহিনী তা নয়। একেবারে তথ্য সমৃদ্ধ ও গবেষণামূলক।
বাঙালি জাতি ভ্রমণ প্রিয় এই কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকের সাধ আছে, সাধ্য নেই। যাদের সাধ্য নেই, আপাতত তাদের তাই ভ্রমণ কাহিনী পড়ে কিছুটা হলেও ভ্রমণের তৃষ্ণা মিটতে পারে। আবার যাদের সাধ্য আছে, তারা এই ভ্রমণ কাহিনী পড়ে জেনে নিতে পারেন নানাবিধ তথ্য। তাই এই ধরনের গ্রন্থ পাঠকের কাছে আলাদা গুরুত্ব রয়েছে সবসময়।
মীযান রহমান-এর ‘শেক্সপীয়ারের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক বইতে তাঁর ইউরোপ এবং মালয়েশিয়া ভ্রমণের নানান অভিজ্ঞতা ও তথ্য উপস্থাপন করেছেন। আলোচ্য এই বইটি দুই পর্বে রচিত। এক- ইউরোপ পর্ব , দুই- মালয়েশিয়া পর্ব । ইউরোপ পর্বে আছে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে , ব্ল্যাক ফরেস্ট , রাইন ফলস আর লুসারনের সিংহ , সুইজারল্যান্ডঃ এ এক অন্যরকম পৃথিবী , প্যারিসঃ রাজনীতি, তর্ক, তা-ব আর বিপ্লবের শহর, যুক্তরাজ্যঃ এ অয়েলফেয়ার স্টেট
(শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের কিঞ্চিত বয়ান), অক্সফোর্ডে একদিন, শেক্সপীয়ারের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়ার’স চার্চঃ হলি ট্রিনিটি , নাগরিক নির্মাণের আয়োজন , লন্ডনের পথে পথে। দ্বিতীয় পর্ব- মালয়েশিয়া পর্বে আছে -মালয়েশিয়া দূরের দেশ নয়, তিন জাতির দেশ মালয়েশিয়া।
এই গ্রন্থের লেখক মীযান রহমান বাংলাদেশ সরকারের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বিধায় পেশাগত কারণে তাঁকে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়েছে। এই বিদেশ ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি সমাজ বাস্তবতায় নানান দিক তুলে এনেছেন। যেমন – যুক্তরাজ্যঃ এ অয়েলফেয়ার স্টেট ( শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের কিঞ্চিত বয়ান ) শীর্ষক কাহিনীতে লেখক যুক্তরাজ্যের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিঞ্চিৎ চিত্র তুলে এনেছেন। “… এদেশে শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে যারপর নাই উৎসাহিত করে। এ শহরের সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন যাদুঘর , লাইব্রেরি , হাসপাতাল, স্কুলের ফটকে ইংরেজি, পোলিশ , উর্দু, ফ্রেঞ্চ এর সাথে বাংলায় ‘স্বাগতম’ লেখা।“ নানান দেশের নানান ভাষার পড়ুয়াদের জন্য এমন ব্যবস্থা সকলকেই প্রেরণা দেবে। কিছুটা আক্ষেপের সুরে লেখক এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পেশ করেছেন “… একুশের অবুঝ অহঙ্কার আর ইউনিলিঙগুয়ালিজমের তোড়ে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ভাষাকে অবজ্ঞা করে চলেছি। অন্ধ বিশ্বাসের অকারণ অনুসরণে আমরা নিকটজনকে কত দূরে ঠেলে দিয়েছি। আদতে, সহস্র স্রোতের সম্মিলন আমাদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বেদম বেখাপ্পা বটে।
বিশ্ব সাহিত্যে উইলিয়াম শেক্সপীয়ার বিশাল রত্নভান্ডার । সেই শেক্সপীয়ারের জন্মশহরে গিয়ে লেখক আবিষ্কার করলেন আরেক ভুবন। ত্রিশ পাউন্ড বিনিময়ে টিকেট কেটে শেক্সপীয়ার সেন্টারে প্রবেশ করতে পারার সুযোগ আছে। … “ কিন্তু প্রবেশ পথে কেউ টিকিট চেক করল না। নিতান্তই আস্থা ও বিশ্বাসের ব্যাপার। শেক্সপীয়ার ভক্ত এ শহরের পর্যটকরা প্রায় সকলেই শিক্ষিত ও সংস্কৃতবান হবার কারণে টিকিট চেক করাটা কর্তৃপক্ষের রুচিতে বাধে। “আর আমাদের দেশের বাস্তবতা হল বিনা টিকিটের জন্য তদবির- সুপারিশ ক্ষমতার দাপট সবই করে থাকি। সে যাক , এবার আসি ‘শেক্সপীয়ারের বাড়িতে রবীন্দ্র নাথ’ পর্বের মূল কাহিনীতে। শেক্সপীয়ারের বাড়িতে কিভাবে প্রবেশ করলেন রবীন্দ্রনাথ? গ্রন্থের নামকরণও হয়েছে এই নামে। তাই একটু রহস্যের ছোঁয়া আছে। লেখকের বর্ণনায় উঠে এলো এভাবে , “ … ছিমছাম অপরিসর বাগানের এককোণে আমাদেরকে অবাক করে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের এক আবক্ষ মূর্তি । এত বড় আঙ্গিনায় এ একটিই মূর্তি । এমন দূর দেশে এ সময় রবীন্দ্রনাথকে বড় বেশি আপন মনে হল। বড় বেশি বড় মনে হল। রক্তের মধ্যে ক্ষণিকে কেমন এক অহমিকার শিহরণ জাগল। শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথই অতিথি। বাংলা ভাষার বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ । যে ভাষায় আমি কথা বলি, যে ভাষার নামে আমার দেশের নাম – আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালবাসি । ইচ্ছে করছিল আশপাশের সব সাদা মানুষদের ডেকে বলি , দেখো , দেখো আমাদের রবীন্দ্রনাথও এখানে। আর কেউ নেই, তোমাদের গ্যাঁটে নয়, মোপাসা নয়, টলস্তয় নয় , তোমাদের হুইটম্যান নয় -শুধুই আমাদের রবীন্দ্রনাথ । “
মালয়েশিয়া পর্বে আমাদের জানার সুযোগ হয় -এই দেশটির সংস্কৃতি , আর্থসামাজিক বিষয়ে। মূলত তিন জাতি গোষ্ঠীর দেশ মালয়েশিয়া। মালয় চাইনিজ ভারতীয়। মালয়রা ভূমিপুত্র হিসেবে স্বীকৃত। তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। … “ মাতৃ তান্ত্রিক মালয়রা মুসলিম হওয়ার পরও নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দেয়নি। ধর্মীয় বিশ্বাসে আমাদের পরিচিত উপমহাদেশীয় অন্ধত্ব , সংস্কার ও সামপ্রদায়িকতা অনুপস্থিত। বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও ধর্মাচরণ নাগরিক অংশগ্রহণের আধিক্য প্রগতির প্রতিবন্ধক হয়নি। “সুতরাং, আজকের এই উন্নত মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ভিত কিভাবে হল, তা এই পর্ব পড়লে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে।

এভাবেই মীজান রহমান ভ্রমণের সাথে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন ইউরোপের নানান দেশ ও মালয়েশিয়া । উঠে আসে নানান বৈচিত্র্য, নানান খুঁটিনাটি তথ্য। যা ভ্রমণ পিপাসুদের প্রয়োজনীয় রসদ যোগাবে । শুধু বেড়ানোর জন্য নয়, আমাদের দেখতে হবে, যে স্থানে যাচ্ছি , তা যেন ইতিবাচক হয়। শিক্ষণীয় হয়ে উঠে ।
পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ-কেই স্মরণ করি
“ যাওয়া সে যে তোমার পানে যাওয়া
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া “।
[শেক্সপীয়ারের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ : মীযান রহমান। প্রকাশকাল : ২০১৯। প্রচ্ছদঃ আব্দুল্লাহ মুসসাহার অদ্বৈত। প্রকাশক : আবির প্রকাশন, চট্টগ্রাম। মূল্য : দুইশত টাকা]

x