শুভপথের উদয় হোক

ইন্দ্রানী পাঠক

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
41

জীবনে চাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বে প্রায়ই নিজেদের প্রকৃত কি চাওয়া-পাওয়া আমরা তা নির্ণয় করতে পারিনা। প্রেম এবং মোহ দুটো ভিন্ন। আমরা যখন কিছু চাই তা না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পাই না। এই যে অশান্ত মনোভাব তাই ই হচ্ছে মোহ। প্রেম হলে পরে সেই জিনিস না পেলেও কষ্ট থাকে না। কারণ প্রেম তেমনই এক বিষয় যেখানে নিরন্তর উদারতা থাকে। উদারতার পারদ যত গভীর হবে ভোগবিলাসী জীবনের আকাঙ্ক্ষা ততই কমতে থাকবে। রক্ত মাংসে গড়া মানুষ কতটুকুই বা পারে এসব মেনে চলতে! হন্যে হয়ে টাকার পেছনে ছোটা মানুষগুলো ভুলে যায় তাদের নিজেদের জন্য সময় কত প্রয়োজন, পরিবারের প্রতি সময় কত প্রয়োজন। সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত ক্লান্ত দেহসার নিয়ে যখন কোনো মানুষ বাড়ি ফেরে বা তেমনি ভাবে ঘরের মানুষটি দিনরাত ঘরের কাজ করে ক্লান্ত থাকে তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য জায়গা খুঁজে পায় না। অপ্রাপ্তি এসে ভর করে মাথায়। একে অন্যের দোষ ত্রুটি নিয়ে নিজেদের সান্ত্বনা দিতে ভালবাসে। বলিনি টাকার প্রয়োজন নেই, আছেতো… না হলে যে পেট কেঁদে বেড়ায়। আর পেটের কান্না যে কোনো মানুষ সহ্য করতে পারেনা তাই বলে কি নিজের সময়ের কোনো মূল্য নেই? আছে, ঢের মুল্য আছে। আসলে কি আমরা জটিলতা খুব ভালবাসি। এই জটিল বিষয়গুলো নিজেরাই তৈরি করে আত্মতৃপ্তি পাই কিন্তু আত্মগ্লানিতে ভুগি না। মূল কথা হলো চাহিদা। চাহিদা রেখা কি নিম্নগামী না ঊর্ধ্বগামী তা অর্থনীতির বই খুঁজলে পাওয়া যাবে কিন্তু যখনই মন বই খুঁজে দেখি সেখানে দেখা যাবে এই রেখা কেবল উপরের দিকে ছুটে চলেছে। এই ছুটে চলা এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে সেখানে নেই কোনো ভালবাসা, নেই সহনশীলতা, নেই আদর- স্নেহ। আছে নিত্য দিনের পত্রিকায় পড়া এক একটি দুঃখজনক দুঃসংবাদ। কেউ চাইছে প্রেমিক বা প্রেমিকার মন জয়ের অপ্রাপ্তিতে আত্মহত্যা, আবার কেউ চাইছে পাশের বাড়ির মানুষটি এতবড় বাড়ির মালিক কিভাবে হলো তার জন্য অন্যায় পথে অর্থ চিন্তা। আবার কেউ নিজের পরিবারের একক চিন্তা করে নিজের জন্মদাতা পিতামাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার যুক্তি। কেউ চাইছে তার সন্তান শুধুমাত্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জায়গায় একাই জিতবে যেখানে প্রতিযোগিতার ভিড়ে সন্তানকে বলি দেয়ার খোঁড়া যুক্তি। আরে ভাই মন বলে কি আপনার আমাদের কিছুই নেই নাকি! দেখুন তো ভেবে আমরা যারা প্রাপ্ত বয়স্করা আছি তারা কতটুকু নিজের বাবা মা, ছেলেমেয়েদের মনের আসল কথাটা জানি! জানিনা…. রাগ করছেন তো? আচ্ছা মেজাজের পারদটা জলে ডুবিয়ে ভাবুন যেটুকু অপ্রাপ্তি আছে আমাদের তা আমরা নিজেরাই সমাধান করতে পারি আলোচনা করে। অন্যে কি করলো না করলো তাতে কান না দিয়ে নিজের যোগ্যতা মেধা দিয়েই তো পারি নিজেদের ভালো রাখতে। নিজেদের একটু সময় দিতে। বিশ্রাম শুধু খেলে বা ঘুমালে হয়না, মনের বিশ্রামের প্রয়োজন খুব বেশি। আর তার জন্য চাহিদার পারদকে নিচে নামাতে হবে। চাহিদা থাকবেনা একথা একবারও বলা হয়নি। থাকবে, তা যোগ্যতা অনুযায়ী। যোগ্য হতে দিন নিজেকে তার জন্য বই পড়ুন, গুনীজনদের সাথে মিশুন, দরকার হলে ঘুরে আসুন বাংলার অপার বিস্ময়কর স্থানগুলোতে। আপনাতেই আপনার মন প্রশান্তিতে ভরে যাবে। নিজের ভুল নিজের কাছে আগে স্বীকার করুন দশজনের কাছে আর করতে হবেনা। নিজের সমালোচনা নিজেই করুন কেউ আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করবে না আর করলেও আপনার কষ্ট হবে না। কারণ আপনি যে যোগ্য মানুষ তা আপনি জানেন। কথায় আছে ‘কাজ বেশি কর কম কথা বল।’ কথাটা সত্যি। আপনার কাজের ধারা যত মজবুত ততই আপনার কদর বাড়বে। কথা বলবেন অবশ্যই সেটা আপনার সীমাবদ্ধতার ভেতর রেখে। হাসিখুশি থাকার জন্য পয়সা লাগে আবার লাগেওনা। সেটা নির্ভর করবে আপনার মন অনুযায়ী। ধরুন কেউ দূরের দেশ ভ্রমণ করছে কিন্তু আপনার যে সামর্থ্য আছে তা আপনার নিজের শহর ভ্রমণ করবার মতো। তাই বলে কি আপনি কষ্ট পাবেন? পাবেন না তখন যখন আপনি সেই দেশ ভ্রমণ করতে না পারার জন্য সেই দেশের ছবি দেখবেন, সেই দেশের বই পড়বেন, সেই দেশের কৃষ্টি নিয়ে জানবেন। সাথে নিজের দেশের অবস্থান নিয়ে ভাববেন। আমরা পারিনা এসব…. চেষ্টা তো করে দেখতে পারি। নিজের আত্মশুদ্ধি নিজেরাই করা শিখে গেলে অন্যের অশুদ্ধতা দেখবোনা। অনেক উপদেশমূলক কথা হয়তো বলা বা লেখা যায় কিন্তু যার যার অবস্থানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে যাই আমরা। অতীত শিক্ষা নেব কিন্তু সেই অতীত নিয়ে পড়ে না থেকে এগিয়ে যেতে তো পারি। একটু চেষ্টার পর চেষ্টা আমাদের এগিয়ে নিতে পারবে। নিত্য অনেক কিছুর যেমন পরিবর্তন হচ্ছে তেমনি মনের ভালো দিকের পরিবর্তন করতে হবে। সকল কাজে প্রেম থাকবে, মন শুদ্ধ হবে, যোগ্যতা থাকবে আর জগৎ সংসার সুন্দর হবে এমনিতেই। মোহময় জগতের বিদায় হোক, শুভপথের উদয় হোক এই কামনা নিখিল বিশ্ববাসীর কাছে। লেখক : সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক

Advertisement