শুধু ব্যাংকই নয়, সংসদও ঋণ খেলাপিদের দখলে

সুজনের গোলটেবিল বৈঠকে মইনুল ইসলাম

রবিবার , ১৩ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:০৯ পূর্বাহ্ণ
134

সরকার ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা বললেও সেটি তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম। খেলাপি ঋণ নিয়ে পাতানো খেলা চলছে দাবি করে তা বন্ধ করে সমস্যা সমাধানে অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক।
গতকাল শনিবার জতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে ওল্টোপাল্টা পদক্ষেপ বন্ধ করুন : ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করুন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সরকারের প্রতি এই সুপারিশ রাখেন অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। খবর বিডিনিউজের।
সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহীম খালেদ, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি আবু নাসের বখতিয়ার ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মাকসুদ।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক মইনুল বলেন, সরকারের হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ আছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ হবে ইনজাংশনের কারণে ঝুলে থাকা ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টে আছে ২৭ হাজার ১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভুতভাবে রিশিডিউলিং করা আরও ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। এই অংকের সঙ্গে অবলোপন করা মন্দ ঋণ যোগ করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
তিনি বলেন, আসলে দেশে ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটি পাতানো খেলা চলছে। সমস্যার প্রকৃত রূপটি সরকার, ব্যাংকার এবং ঋণখেলাপি সবারই জানা আছে। সমস্যার সমাধানের উপায় সম্পর্কেও এই তিন পক্ষের সবার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু জেনেশুনেই সরকার সমাধানের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করছে না। ফলে এখনও দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে রাঘববোয়াল ঋণ খেলাপিদের কাছে আটকে থাকা বিপুল খেলাপি ঋণ। এই ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, মানে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে, ঋণ ফেরত দেবেন না। কারণ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং আর্থিক প্রতাপ দিয়ে তারা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, দেশের সংসদকেও দখল করে ফেলেছেন। এখনতো দেশের শীর্ষ ঋণ খেলাপি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, এটা আমার কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের জোরালো উদ্যোগ না থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, অবলোপন করা মন্দঋণ বাড়া মানেই হল এর ফলে শ্রেণিকৃত ঋণ ওই পরিমাণ কম দেখানো যাবে। মন্দঋণ আদায়ের জন্যে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে দুই শতাংশ ঋণ প্রাথমিক কিস্তিতে পরিশোধ করে যে দশ বছরের সময় দেওয়ার ব্যবস্থা হল, সে সুবিধা নিয়মনিষ্ঠ ঋণ ফেরতদাতারা পান না। কিন্তু এধরনের পরিবর্তন খেলাপি ঋণ সমস্যাটিকে আড়াল করার পন্থা হলেও মন্দঋণ আদায় করতে কোনো নিষ্ঠাবান প্রয়াস জোরদার করার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওল্টো একজন ‘ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী’ তার ঋণ খেলাপি ব্যবসায়ী বন্ধুদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত দরদ দেখিয়ে ওল্টোপাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১৪-১৯ মেয়াদের সরকারের সময়েও খেলাপি ঋণের অবস্থা সংকটজনক থাকা সত্ত্বেও কোনো রহস্যজনক কারণে প্রধানমন্ত্রী ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠনের বিষয়টিকে বারবার এড়িয়ে গেছেন। বর্তমান সংসদ সদস্যদের ৬১.৭ শতাংশই ব্যবসায়ী আর তাদের সিংহভাগই ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক বলে জানান অধ্যাপক মইনুল।
এই অর্থনীতিবিদ খেলাপি ঋণ কমাতে কয়কটি পরামর্শ দিয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ জন খেলাপিকে দ্রুত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। ব্যাংকিং খাতের জন্য আলাদা ন্যায়পাল নিয়োগ, মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য ‘ডেট রিকভারি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন, অর্থঋণ আদালতে কোনো ঋণ খেলাপির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হলে জামানত বা বন্ধকী সম্পত্তি নিলাম করার জন্য মামলা করার যে নিয়ম রয়েছে, তা বাতিল করা, প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ দশ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম এক বছরের বেশি তালিকাভুক্ত হলে ওই প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি তার পাসপোর্ট জব্দ করা ইত্যাদি।
আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহীম খালেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু কখনও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দিয়ে দেশের উন্নয়ন মাপেননি। ১৯৭৪ সালে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধির কথা বঙ্গবন্ধু কোনো দিন কোথাও বলেননি। আর বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়নের পারিমাপক হিসেবে ধরা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মানুষের মধ্যে যে সম্পদের পার্থক্য এটিকে কমিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ তিনি বৈষম্য কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে উন্নয়নের কথা বলেছিলেন। অথচ বর্তমানে দেশ চরম বৈষম্যের দেশে পরিণত হয়েছে। ৯৫ জনকে শোষণ করে পাঁচজনের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তিনি সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ব্যাংক সাধারণ মানুষের আমানত রেখে লুটপাটকারীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। জনগণ ব্যাংকে আমানত রাখা বন্ধ করে দিলে সকল ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক কর্মী যখন ব্যাংক চালাতে আসবে, তখন অবশ্যই ব্যাংকের নিয়ম পালন করা সম্ভব নয়। সরকার রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাংক পর্ষদে নিযুক্ত করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে বলে তিনি মনে করেন।

x