শুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চার প্রসার ঘটাতে চায় সঙ্গীততীর্থ

শোভন দাশ

বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
8

শান্তা গুহ, নন্দিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। গানের সাথে তাঁর সখ্য আশৈশব। এই গানের প্রতি কাস্টমস্‌ কর্মকর্তা মায়েরও ছিল অন্যরকম ভালোবাসা। মা ভানুমতি গুহ চেয়েছিলেন, মেয়ে সঙ্গীতকে সাথী করেই বড় হবে। হয়েছেও তা-ই। শৈশবে শান্তার গানের হাতেখড়ি হয় সঙ্গীত গুরু মনোরঞ্জন শর্মার কাছে। দ্রুত সুর, তাল, লয় আয়ত্ত করে নেয়ার ক্ষমতা অবাক করতো প্রশিক্ষককে। মায়ের অনুপ্রেরণার পাশাপাশি বাবা প্রয়াত রাখাল চন্দ্র গুহ এর উৎসাহে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।
চট্টগ্রামের পটিয়ার হাইদগাঁও গ্রামের মেয়ে শান্তা পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তালিম নেন সংগীত সাধক পংকজ সূত্রধর, ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া, মায়া চক্রবর্তী ও শীলা মোমেনসহ গুণী শিল্পীদের কাছে। ধীরে ধীরে এই সংগীতই হয়ে ওঠে শান্তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৯৬ সালে কোলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন শান্তা গুহ। সেখান থেকে বিএ (অনার্স) এবং প্রথম শ্রেণিতে এমএ (রবীন্দ্রসংগীত) ডিগ্রি লাভ করেন। কোলকাতায় অবস্থানকালে তিনি রবীন্দ্র সংগীতে তালিম নেন তপন ঘোষ ও দেবারতী সোম এর কাছে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন সুপ্রিয়া দে ও নন্দিতা গুহ’র কাছে।
২০০১ সালে দেশে ফিরে সঙ্গীত নিয়ে নিজের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নেন শান্তা গুহ। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সংগীতপিপাসু শিক্ষার্থীদের গান শেখাতে শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি অবসর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম একাডেমিতে রবীন্দ্র সংগীতের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেন। ২০০৬ সালে স্বামী অ্যাডভোকেট প্রতীক কুমার দেব-এর সর্বাত্মক সহযোগিতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র ‘সঙ্গীততীর্থ’। প্রতিষ্ঠার ১২ বছরে এসে হাজারো তরুণ প্রাণের ভালোবাসায় ‘সঙ্গীততীর্থ’ হয়ে উঠেছে সঙ্গীতের সত্যিকারের তীর্থস্থান।
‘সঙ্গীততীর্থ’ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামে শুদ্ধ রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চার প্রসার ঘটানো। আর এই চর্চার মাধ্যমে নিজের অর্জিত শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে অনেকাংশে সফল হয়েছেন শিল্পী শান্তা গুহ। শহরের হেমসেন লেইনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে সপ্তাহে দু’দিন একঝাঁক শিক্ষার্থীকে তিনি পরম মমতায় শেখাচ্ছেন সঙ্গীত। ‘সঙ্গীততীর্থ’ মূলত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের চর্চাকেন্দ্র হলেও পাশাপাশি এখানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চাও হয় বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শান্তা গুহ।
দুই সন্তান প্রতুল ও প্রান্ত দেবের জননী শান্তা গুহ বাংলাদেশ টেলিভিশন-ঢাকা ও বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে প্রভাষক (খন্ডকালীন) হিসেবে কর্মরত আছেন।
১৯৯০ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পুরস্কার, ১৯৯১ সালে জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মেলন পুরস্কার, ১৯৯২ সালে বিভাগীয় শিক্ষা সপ্তাহ পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে তুলি প্রতিযোগিতায় স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক, একুশে মেলা পদকসহ শতাধিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মাননাও। শান্তা গুহ জড়িত আছেন বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, চট্টগ্রাম বিভাগীয় শাখার সাথেও। প্রতিবছর ‘সঙ্গীততীর্থ’ এর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও কণ্ঠশিল্পীরা।
তাঁর মতে, সঙ্গীত মানুষকে আলোকিত করে। একটা সমাজ-জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটে। সংস্কৃতি আঁধার তাড়ানিয়া গান। একজন শিল্পীকে অন্তরে ও বাইরে শিল্পী হতে হয়। শুধু গাইলেই শিল্পী হয় না। সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পেলে ‘সঙ্গীততীর্থ’ এর প্রসার ঘটবে, দেশে তৈরী হবে প্রকৃত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী।
প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নসারথী রবীন্দ্রপ্রেমী অ্যাডভোকেট প্রতীক কুমার দেব বলেন, রবীন্দ্রসংগীতের কথায় উপনিষদ্‌, সংস্কৃত সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ও বাউল দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্ট। গানের সুরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, তরানা, ভজন ইত্যাদি ধারার সুর এবং সেই সঙ্গে বাংলার লোকসংগীত, কীর্তন, রামপ্রসাদী, পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সংগীত ও পাশ্চাত্য লোকগীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রসংগীত কাব্য ও সুরের মধুর মিলনের অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বরচিত অধিকাংশ গানে সুরারোপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী এবং আভোগ- এই চারটি রূপবন্ধের ক্রমিক সমন্বয়ে যে একটি গান সম্পূর্ণ হয় তা তিনি সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর এই উপলব্ধি সর্বভারতীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। কবিগুরুর সেই কালজয়ী সুর সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে ‘সঙ্গীততীর্থ’ কাজ করে যাচ্ছে।

x