শুদ্ধ যে কোনও শুদ্ধি অভিযান

সতত স্বাগত

শনিবার , ২ জুন, ২০১৮ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
39

মাদকবিরোধী অভিযান চলছে দেশজুড়ে। জাল পাতা, ফাঁদ পাতা, সাইনবোর্ড পাতা নানা নামের অভিযানে ধরা পড়ছে নানা পেশার নানা বয়সের নানা জাতগোত্রের মাদক ব্যবসায়ী। মাইকে ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার পুলিশ মাদক অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। ধরা পড়ছে শত হাজার লক্ষ পিস ইয়াবা, কেজিকে কেজি গাঁজা, বোতলের পর বোতল ফেনসিডিল, হাজার হাজার লিটার চোলাই মদ। মামলার পর মামলা হচ্ছে অস্ত্র ও মাদক আইনে। না, এটাকে বিশেষ অভিযান বলতে নারাজ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কারণ, এ অভিযান, এমন অভিযান চলতেই থাকবে যতক্ষণ মাদক নিয়ন্ত্রণে না আসে। এটা নিয়মিত অভিযান। নিয়মিত যুদ্ধ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। আমরা অলআউট যুদ্ধে নেমেছি। জয়ী আমাদের হতেই হবে। কবে এ যুদ্ধ শেষ হবে আমরা জানি না। এর কোনও সময়সীমা নেই। যতদিন প্রয়োজন যুদ্ধ চলবে। চূড়ান্ত বলে থেমে যাবার প্রশ্ন নেই।

এ অভিযানের ফলে বন্দুকযুদ্ধে প্রতিদিন ক’জন আহতনিহত হচ্ছেন, কারা ‘ভুল টার্গেট’ হচ্ছেন, এ ব্যবসার মূল হোতা কারা এসব নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তোলার তাঁরা প্রশ্ন তুলবেন বা তুলছেনণ্ড সেটা তাঁদের বিষয়। আমরা চাই অভিযানের সর্বাঙ্গীন সাফল্য। কারণ সমাজের সুস্থতা আমাদের একমাত্র চাওয়া। আমরা বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স নীতি’র প্রসাদ পাবে আমাদের নারী সমাজ যারা অকারণে (শুধু একটি নারী দেহের কারণে) নির্যাতিত, নিপীড়িত, ধর্ষিত এবং নিহত হচ্ছে ঘরেবাইরে, শহরগ্রামে, বাঁশঝাড়ে কি বাগবাগিচায়, নির্মাণাধীন বাড়িতে কি পোড়োবাড়িতেসর্বত্র, সবখানে। অবুঝ, অরক্ষিত শিশুকন্যা বা কিশোরীই শুধু নয়, জীবন ও জীবিকার তাগিদে পথে নামা শ্রমজীবী নারীই শুধু নয়, স্কুলে কলেজে, মাদ্রাসায় এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী নিগ্রহের খবরের মিছিল চলছে তো চলছেই। শান্ত গৃহকোণের গৃহবধূটির জীবনও আর ধর্ষণাতঙ্ক মুক্ত নেই। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। বিচারপ্রার্থী ধর্ষিতা ও তার পরিবারের হেনস্তা ও হয়রানির খবরও পাচ্ছি আমরা। এরই মধ্যে গত ২৮ মে হাইকোর্টের এক রায়ে ধর্ষণ বিষয়ক কিছু নির্দেশনা আমাদের স্বস্তি দিয়েছে। ঘটনাটা খুলে বলি।

রাজধানীতে মাইক্রোবাসে এক গারো তরুণী গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল ২০১৫ সালের ২১ মে তারিখে। এ মামলা নিতে বিলম্ব হওয়ার প্রেক্ষাপটে ৫টি মানবাধিকার সংগঠনের করা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে। দু’বছরের কিছু বেশি সময় পরে গত ২৮ মে (২০১৮) ঘোষিত হলো সেই রায়ের নির্দেশনাবলী (১৮টি) পর্যবেক্ষণসহ পূর্ণাঙ্গ রায়।

হাইকোর্টের ১৮ দফা নির্দেশনার একটিতে একটি ওয়েবসাইট খোলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে অনলাইনে ভুক্তভোগী তার অভিযোগ জানাতে পারে। প্রতিটি থানায় ২৪ ঘণ্টার জন্য এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা (কনস্টেবলের নিচে নন এমন) রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিউটি অফিসার একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে তা রেকর্ড করবেন। ভিকটিমের পরিচয় গোপন রাখতে হবে। প্রতিটি থানায় নারী সমাজকর্মীদের একটি তালিকা থাকবে ভিকটিম যাদের সাহায্য নিতে পারে। তথ্য পাওয়ার পর পর তা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারকে জানাবেন দায়িত্বরত কর্মকর্তা। অভিযোগ লিপিবদ্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে অনতিবিলম্বে তদন্ত কর্মকর্তা একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাবেন। প্রতিটি তদন্ত কর্ম সম্ভবপর দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, মেডিকেল পরীক্ষা (ডিএনএ) ও কাউন্সেলিং সহায়তা এবং সুরক্ষা দানের লক্ষ্যে প্রতিটি মহানগরে একটি কার্যালয় স্থাপন করতে হবে।

মোটকথা ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত লিপিবদ্ধকরণ, বাধ্যতামূলক ডিএনএ টেস্ট (প্রসঙ্গত নারী আন্দোলনকারীদের বিরামহীন প্রচেষ্টা ও মহামান্য আদালতের মহান উদ্যোগের ফলে বাতিলকৃত টুফিঙ্গার টেস্ট বাতিল ঘোষণার জন্যও আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই) থানায় ২৪ ঘণ্টা নারী পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি এবং তাঁরই উপস্থিতিতে ভিকটিমের সুবিচার পাবার পথের প্রতিবন্ধকতা অঙ্কুরেই বিনষ্টিকরণ ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। আশা করছি হাইকোর্টের এ নির্দেশনার আলোকে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরিতে আইন মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ মহাপরিদর্শক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আর কালবিলম্ব করবেন না।

গত কয়েকদিন ধরে সীতাকুণ্ডে দুই ত্রিপুরা কিশোরীর হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন, প্রতিবাদ মিছিল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের যৌথ কর্মসূচি থেকে নারীশিশু ধর্ষণ ও হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠছে। এরই মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত এবং চাকরিচ্যুত এক শিক্ষকের চাকরিচ্যুতির আদেশ অবৈধ ঘোষণার রায়ের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আপিলের অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশও বহাল রেখেছেন আদালত। শুনানিতে আদালত বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হচ্ছেন অভিভাবক সমতুল্য। আর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছে। এ ধরনের ব্যক্তিকে কি ছেড়ে দেওয়া যায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। (দৈনিক যুগান্তর, ২৫..২০১৮)

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গত বছরের ২৪ আগস্ট খুবি গণিত ডিসিপ্লিনের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. শরীফ উদ্দিনকে (পদ ও নামের কলঙ্ক) চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সিন্ডিকেটের ১৯২তম সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। অন্যদিকে বিপরীত চিত্রেরও অভাব নেই এখনও। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কলতা গ্রামে পূজা দেখতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হয় এক কিশোরী। জনতার হাতে ধরা পড়া তিন ধর্ষককে ছেড়ে দিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান। (পদ ও নামের আরেক কলঙ্ক) এসব ঘটনায় প্রমাণ হয় যে সমাজে একটা তোলপাড় হচ্ছে। মহামান্য আদালতও সদয় এবং সত্যনিষ্ঠ। নারী আন্দোলন কর্মীদের একান্ত যে চাওয়াধর্ষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বিবেচনা করা হোক তা যেন সত্য হয়। সাবধান, আপনার আশেপাশেই ধর্ষক ঘোরাফেরা করছেএমন সতর্কবার্তা যে ধর্ষণের মতো অপরাধের মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত, মাদকের চেয়ে তা যে কম ভয়াবহ নয় সে সম্পর্কে অতঃপর আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্সে’র অপেক্ষা করছি।

শেষ পাতে সেলিব্রেট করার মতো খবরটি হচ্ছে এই যে ‘মি টু’ আন্দোলনের হোতা হার্ভি ওয়াইনস্টিন নিউইয়র্ক পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে শতাধিক নারীর সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন যে অপরাধী তার বিরুদ্ধে তাদের একজনকে ধর্ষণ এবং আরেকজনকে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার অভিযোগ আনা হলো। ম্যানহাটনের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় ও নিউইয়র্ক পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগ এনেছে। অভিযোগ ওঠার পর নিজের প্রযোজনা সংস্থা থেকেও বরখাস্ত হয়েছেন তিনি। বহিস্কৃত হয়েছেন অস্কার বোর্ড থেকেও। ইনি সেই ব্যক্তি যাঁর তিনশ’র বেশি ছবি অস্কারের মনোনয়ন পেয়েছে এবং অস্কার জিতেছে যাঁর ৮১টি ছবি। হ্যাঁ, এক সকালে তিনি আত্মসমর্পণ করলেন এবং বিকেলে ১০ লক্ষ ডলার নগদ বেইলে তাঁর জামিন হলো। তাঁকে হাতকড়া পরেই আদালতে নেয়া হয়েছে, পাসপোর্ট সমর্পণে তিনি বাধ্য হয়েছেন এবং তাঁর ভ্রমণ আপাতত নিষিদ্ধ।

প্রসঙ্গত এশিয়া আর্জেন্টোর গল্পটা শোনাতে চাই। গত ১৯ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে এই অভিনেত্রী মঞ্চে ওঠেন উৎসবের সেরা অভিনেত্রীর হাতে পুরস্কার তুলে দেবার জন্য। কি হলো তাঁর, মঞ্চে উঠেই তিনি ফিরে গেলেন ১৯৯৭ সালের এক অন্ধকার রাতে। ২০ বছর আগে সেই রাতে ২১ বছরের এশিয়া আর্জেন্টোকে ধর্ষণ করেন সেই হার্ভি ওয়াইনস্টিন। ভবিষ্যৎ বাণীর মতো করে তিনি বলেন, হার্ভি আর কোনদিন এ অনুষ্ঠানের অংশ হতে পারবে না। অতঃপর আজীবন তাকে ঘিরে থাকবে অপমান ও অসম্মান।

এশিয়া আরো বলেন, এক সময় যারা তার পাপ ঢেকে রেখেছে আজ তারাই তাকে এক ঘরে করতে প্রস্তুত। উপবিষ্ট অনেককে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি এও বলেন, জবাবদিহিতার জন্য তাঁরাও যেন প্রস্তুত থাকেন কারণ অনেক নারী হাটে হাঁড়ি ভাঙার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। কোন কর্মক্ষেত্রেই এ ধরনের অন্যায় আর বরদাশত করা হবে না। স্পষ্ট করে এই নারী আরো বলেন, তোমরা কে কেমন আমরা জেনে গেছি। তাই আমার সঙ্গে যা হয়েছিল তা আর কারো সঙ্গে হতে দেব না। সহ্য করব না।

শ্রবণ বধির করা গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের সেই খই ফোটা করতালি আমরাও যেন শুনতে পেলাম। এ বক্তৃতার এক সপ্তাহের মধ্যে শোনা গেল হার্ভির আত্মসমপর্ণের খবর।

x