শীতের বুড়ি

উৎপলকান্তি বড়ুয়া

বুধবার , ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ
79

তপুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রায় শেষ রাত। কেনো জানি ঘুম আর চোখে ঘেষতেই চায় না। পড়ার টেবিলে ঢেকে রাখা গ্লাস থেকে দু’ঢোক পানি পান করে । হঠাৎ টক্‌ টক্‌ টক্‌ দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দ। তপু কান সজাগ করে। আবারও টক্‌ টক্‌ । কড়া নাড়ার শব্দ। তপু জানতে চায়- কে?
-আমি, দরোজা খোলো। দরোজার বাইরে থেকে জবাব আসে।
-কে তুমি?
-আহা খোলোই না! বলছি তো বাপু আমি কে!
তপু বরাবরই সাহসী। তার বয়েসী অন্যান্য আর দশটি ছেলে-মেয়ের মতো সে ভীতু নয়। তপু দরোজা খোলে এবার। সাথে সাথে এক ঝটকা হিম-ঠাণ্ডা তপুর চোখে মুখে এসে লাগে। সাদা ধবধবে শাড়ি পরা এক কুঁজো বুড়ি লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে দরোজায়। পিঠে সাদা ঝুলানো এক ঝোলা।
-কাকে চাই?-তপুর প্রশ্ন।
-তোমাকে। তোমার কাছেই এসেছি।
-আমাকে? কিন্তু কে আপনি? এত রাত-দুপুরে আমাকে আপনার কি প্রয়োজন?
-বারে! বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি? ভেতরে আসতে বলবে না? তারপর তো সব কথা বলি।
-হ্যাঁ, আসুন।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই কুঁজো বুড়ি বলতে থাকে- আজ সারাদিনতো তুমি আমাকেই খুঁজলে। পেলে না তো! ভাবলাম, তোমার সাথে দেখা করেই আসি। যেই ভাবা সেই কাজ। চলেই আসলাম। -একটানা কথাগুলো বলে কুঁজোবুড়ি থামলো। দরোজা বন্ধ করার পরও তপু শীতে কাঁপছে। শীতে কাঁপতে কাঁপতেই তপু বললো- কিন্তু তুমি কে? বললে না তো! আমার কাছেই বা কেনো এসেছো?
-বলছি বলছি। এ সময়ে আমি প্রায় সবার কাছেই এসে থাকি। আমার কোনো তেমন নাম নেই। আমি শীতের বুড়ি। তুমি শীতে কাঁপছো। আজ সারাদিন তুমি আমাকে খুঁজেছো। স্কুল থেকে এসেই নতুন বছরের পয়লা তারিখে তোমার নতুন বাংলা বইয়ের গদ্যে-পদ্যে আমাকে তুমি অনেক খুঁজেছো। পাওনি। পত্রিকায় প্রকাশিত তোমার ছোট্‌কার ‘শীতের বুড়ি’ কবিতাটি পড়েই তুমি শীতের বুড়ি সম্পর্কে তোমার নতুন বইয়ে আরো কি কি রয়েছে তা জানতে ছেয়েছো। তোমার নতুন ক্লাস ফাইভের বাংলা বইয়ে ঠিক সে রকম কিছু খুঁজে পাওনি। ভাবলাম, তোমার সাথে নিজেই দেখা করে আসি। তাই তোমার কাছে চলে এলাম।
-এসে ভালোই করেছো শীতের বুড়ি।
-তা তুমি কি জানতে চাও আমার সম্পর্কে, বলো?
-তোমার বাড়ি কোথায়?
-অচিন পুর।
-অচিন পুর? সে আবার কোথায়?
-অনেক দূরের এক দেশে।
-হ্যাঁ, ছোটকার কবিতায়ও অবশ্য তোমার বাড়ি অচিন পুর লেখা আছে, পড়েছি।
“ঠাণ্ডা হাওয়া ঠাণ্ডা রূপ
ধল কুয়াশার শিশির টুপ
শীতের বুড়ির শীতল সুর
শীতের বাড়ি অচিন পুর।”
ছোট্‌কার কবিতার মর্ম তপু কিছুটা বুঝেছে। কিছুটা বোঝেনি। ভাবলো নতুন পাঠ্য বইয়ে নিশ্চয়ই শীতের বুড়ির গল্প-কাহিনী বা কথা থাকতেই পারে। তাই তপুর এই চেষ্ঠা।
-আর কী প্রশ্ন আছে, বলো?
-তোমার পিঠে এটা কিসের ঝোলা? তুমি এতো ঠাণ্ডা কোনো?
-অচিন পুরের দেশ আমার হিমালয়ের ঠাণ্ডা বরফে ঢাকা। সেখানে আমার জন্মতো, তাই আমি এত ঠাণ্ডা।
-তোমার সর্দি লাগে না।
-না।
-তোমার কি গরম লাগে?
-গরম আমার সহ্যই হয় না।
-তুমি এই সময়ে আসো কেনো?
-এই সময়-মানে পৌষ-মাঘ মাসেই আমার আসার নিয়ম। এই দেশে জন্ম থেকেই এই দুই মাসে আমার আসার নিয়ম প্রচলিত।
-গরমকালে তুমি কোথায় থাকো?
-আমার অচিনপুরে হিমালয়ের দেশে। সেখানে গরম নেই। সারাবছর বরফেই ঢাকা থাকে। আর বরফ মানেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তুমি কী শীত ভালোবাসো? -শীতের বুড়ি এবার পাল্টা প্রশ্ন করে।
-হ্যাঁ, শীতকে আমি খুব ভালাবাসি। শীতকালে গরম কাপড়-সোয়েটার পড়ে দারুন মজা পাই। শীতের সকালে গরম খেজুর রসে ভাপা পুলি পিঠা খেতে খুবই মজা। আচ্ছা শীতের বুড়ি, তোমার কি গরম খেজুর রসের ভাপা পিঠা খুব পছন্দ?
-এ সব মজার খাওয়া তোমাদের জন্য। এ সব আমার অলংকার। এ সব আমার শোভা।
-অলংকার ! শোভা! মানে-
-এ সব তুমি এখন হয়তো সব বুঝবে না। আরেকটু বড় হও। অনেক অনেক পড়ো, শেখো- দেখবে আজকের আমার এ কথার উত্তর তুমি ঠিকই তখন খুঁজে পাবে।
বুড়ির এ কথার কোনো মানেই তপু বুঝলো না। এ সময় দরোজায় আবারও টক টক শব্দ।
-তপু গলার স্বর উঁচু করে প্রশ্ন করে- কে?
-দরোজার বাইরে থেকে জবাব আসে- আমি ভোর! নতুন ভোর!
-নতুন ভোর!
-হ্যাঁ, ভোর এসেছে। আরেকটি নতুন দিনের চলা শুরু হলো। এবার আমার যাওয়ার পালা- বলেই শীতের বুড়ি দরোজার দিকে টক্‌ টকা টক্‌ লাঠি হাতে এগিয়ে যায়।
তপু ডান হাত বাড়িয়ে কিছু বলতে যাবে-অমনি শীতের বুড়ি থামিয়ে দিয়ে বলে,
-অন্যদিন, অন্য কোনো এক সময় আবার দেখা হবে, কথা হবে। আজ চলি। বলতে বলতে শীতের বুড়ি নিজেই দরোজা ফাঁক করে বেরিয়ে যায়। তপুর মুখে আর কোনো কথা নেই। শীতের বুড়ির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। দরোজার ফাঁক গলে নতুন কচি ভোরের এক চিলতে আলো ছড়িয়ে পড়ে তপুর চোখে মুখে।

x