শীতল আতঙ্কের অ-সরল দিন-যাপন

রূপা দত্ত

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ
3

পাহাড় নিয়ে যেহেতু আধিকাংশ মানুষের মাথাব্যথা নেই মানে সেখানে কে কখন কাকে ধর্ষণ করল, তার বিচার হয়েছে কিনা কিংবা সেখানে ধর্ষণভীতি তৈরি করে অন্য কোন ম্যাসেজ কেউ দিতে চাচ্ছে কিনা কিংবা এইসব থেকে কে কোন রাজনৈতিক ফায়দা নিবে এই বিষয়ে সমতলের মানুষের ভাবার খুব একটা সময় নেই বলে এই দাবি আন্দোলনে রূপ নেবার সুযোগ পায়নি। তাই এই দাবির কথা আপাতত থাক।

বাচ্চারা আন্দোলনে নেমেছে। সবাই ফেসবুকে লিখছে। সবাই স্ট্যাটাস দিল। কিন্তু, খবরটা শুনে কিছুতেই উচ্ছ্বসিত হতে পারিনি। প্রথমেই মনে এল শাহবাগ আন্দোলনের কথা তারপর কোটা আন্দোলনের কথা। সাধারণ মানুষের দাবির আন্দোলন কি করে নানাবিধ রাজনৈতিক প্যাঁচের গ্যাঁড়াকলে পড়ে যায়, এই অভিজ্ঞতা আমাদের ইতোমধ্যে হয়েছে। তাই ‘নিরাপদ’ সড়কের আন্দোলন গড়িয়ে কোথায় যাবে সেই নিয়ে শঙ্কা জেগেছে। কোন দলগত আলোচনায় যাচ্ছি না কারণ আমি নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। আবার নীতিগতভাবে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলকেও সমর্থন করি না।

গেল সপ্তাহে দেশে দুটো দাবি উঠেছে. নিরাপদ সড়ক চাই; . নিরাপদ পাহাড় চাই। দুটো দাবিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় নিয়ে যেহেতু আধিকাংশ মানুষের মাথাব্যথা নেই মানে সেখানে কে কখন কাকে ধর্ষণ করল, তার বিচার হয়েছে কিনা কিংবা সেখানে ধর্ষণভীতি তৈরি করে অন্য কোন ম্যাসেজ কেউ দিতে চাচ্ছে কিনা কিংবা এইসব থেকে কে কোন রাজনৈতিক ফায়দা নিবে এই বিষয়ে সমতলের মানুষের ভাবার খুব একটা সময় নেই বলে এই দাবি আন্দোলনে রূপ নেবার সুযোগ পায়নি। তাই এই দাবির কথা আপাতত থাক।

ফিরে আসি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে। আমার বাবা যুবক বয়সে মোটরসাইকেল কিনতে চেয়েছিলেন, অফিস থেকেও উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু, আমার মা কখনো চায়নি আমার বাবা ব্যস্ত রাস্তায় সাইকেল চালাক। অ্যাক্সিডেন্টের ভয়। প্রিয় মানুষের খারাপ কিছু হোক তা আমরা কেউই চাই না। আবার রুঢ় বাস্তবতা হল, বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। তাই বাবার সুস্থ থাকা সব দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তারপর আমার মামাও মোটরবাইক কিনতে চাইলেন। এবারও মা কিনতে দিলেন না। তারপর এল আমার ভাই। মার্কেটিং থেকে পড়াশোনা করে, মার্কেটিং এ চাকরি শুরু করল। কিছুদিন পর অফিস থেকে চাপ মোটরসাইকেল কিনতে হবে চাকরির সুবিধার্থে। মা এবারও বিরোধী। মাকে বোঝানো হল চাকরি বাঁচাতে হলে কিনতেই হবে। তোশেষ পর্যন্ত আমার ভাই, আমার একমাত্র ভাই মোটরসাইকেল কিনল। মায়ের মনের কি অবস্থা হলো জানি না, আমার নানাবিধ মানসিক চাপের সাথে আর একটি চাপ যুক্ত হল। বাড়ি থেকে দূরে থাকি যার ফলে সব খারাপ খবর সাথে সাথে পাই না। কোথাও কোন অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনলেই আগে ভাইয়ের কথা মনে আসে। আর সাথে সাথে মা’কে ফোন, “মা, আপনার ছেলেকে সাবধানে চালাইতে বলিয়েন। হ্যালম্যাট মাথায় দিতে মনে করাই দিয়েন।” ভাইকে মিনমিন করে বলি, “তুমি একটাই ছেলে, সাবধানে চালাইও। রেস দিও না।” ভাই আমার মাথা নাড়ে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি যাবার সময় বাসের কয়েক ঘণ্টা সময় যে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতে হয়, সেটা বোধকরি যারা লেখাটা পড়ছেন তারা সমানভাবেই অনুভব করছেন। আমার চেয়েও বাবামা বা পরিবারের অন্যদের চাপ আরও অনেক বেশি। তাই একসময় বাসায় নিয়ম ছিল বাসের নাম্বার ম্যাসেজ করে দিতে হবে। যাতে অন্তত খবর পাওয়া যায় কোন দুর্ঘটনা ঘটলে। আর এখন বাসে উঠে একটা ফোন, মাঝপথে ফোন তারপর বাস থেকে নেমে ফোন। এই বিশাল মানসিক চাপের জায়গা থেকেই ‘নিরাপদ সড়ক’ এর আমিও একজন দাবিদার। তথাপিও আন্দোলনের খবরে মোটেই আনন্দিত হতে পারিনি। শঙ্কিত হয়েছি বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে। ভয় পেয়েছি জটিল রাজনীতিকরণের। এই দেশ নিয়ে চলছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি। যার কোনটিই আমার বোধগম্য নয়। কেবল জানি, শেষ পর্যন্ত বলির পাঠা হই আমরা সাধারণ জনগণ। শেষ পর্যন্ত মরে আমারই প্রিয় পরিচিতজন। তারমানে কি আমরা কখনো আর কোন আন্দোলন করব না? করব, অবশ্যই করব। একই সাথে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ সঠিক আন্দোলনকারীর হাতে রাখার কথাও মাথায় রাখা জরুরী। আন্দোলনের হাল অন্যের হাতে চলে যাওয়ার আগে কি করে আন্দোলনকে গুটিয়ে নিতে হয় এই দূরদর্শিতার কোন অবকাশ নেই। যে দুটো আন্দোলনের কথা দিয়ে শুরু করেছিলামশাহবাগ আর কোটা আন্দোলন। তাৎক্ষনিক সঠিক দূরদর্শী সিদ্ধান্তের অভাব আমরা দেখেছি দুটো আন্দোলনেই। কোটা আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দুটো আন্দোলন দেখে একটি জিনিস মাথায় এল, তাহলো আন্দোলনকারীদের বয়স। কোটা

আন্দোলনে ছিল আঠারোর্ধ ছাত্রছাত্রী। সেই আন্দোলন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থাকে খুব একটা নাড়ায়নি। আন্তর্জাতিকভাবেও এর তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। তারপর এই ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলন। এখানে সব আঠারোর নিচের ছাত্রছাত্রী। সবাই শিশু। শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলনকে ব্যাবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ থেকেই যায়। আবার অন্যদিকে সরকার তার নিজের জনগনের কথা কতটা ভাবে, সাধারণ মানুষের দাবি সরকারের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাও দেখার সুযোগ হয় এই আন্দোলনগুলোর মাধ্যমে।

এবং আমরা দেখলাম একটা ইনোসেন্ট আন্দোলনের মধ্যে কতরকম ভাইরাস ঢুকে গেল। রাজপথ রক্তাক্ত হলো। এর সরলীকরণ কি এত সোজা? রাজনীতির সেয়ানা হিসাবের নাগাল সাধারণ মানুষ কি আসলে পায়? যার হারায় কেবল তারই হারায়। আমাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু মায়ের বুক তো আমৃত্যু শূন্যই রয়ে যায়। দিনশেষে চাওয়া নিরাপদে থাকুক আমাদের সন্তানেরা।

x