শিশু শিক্ষা সমাচার

নাহিদা সুলতানা

শনিবার , ১৫ জুন, ২০১৯ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ
37

জাতি হিসেবে আমরা অনেক আবেগপ্রবণ। আমাদের সেই আবেগের ভার আমাদের শিশুদের বিকাশের অন্তরায় হয়ে উঠছে অনেক ক্ষেত্রে। শিশুরা হাঁটতে শেখার পর পরই তাকে স্কুলমুখী করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় অভিভাবকেরা স্থান করে দেয় তাদের সোনালী শৈশব। বইয়ের যাঁতাকলে, সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় কখন যে ওরা রোবট মানব হয়ে ওঠে তা দৃষ্টিগোচর হয় না। জাপানীদের সাথে আমাদের আবেগের জায়গাটা মিলে যায়। তবে পার্থক্য হলো ওরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু আমরা তা পারি না। ১০ বছর বয়স পর্যন্ত জাপানে শিশুদেরকে কোন পরীক্ষা দিতে হয় না। আর আমাদের শিশুরা কঠিন পরীক্ষা যুদ্ধের মাধ্যমে স্কুলে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে। ১০ বছর বয়সে আমাদের শিশুরা পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। আরো বড় চমক হলো, যে শিশুটি ৫ম শ্রেণিতে ৬টি বিষয়ে পড়াশুনা করে, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে সে এতটাই বড় হয়ে যায় যে তাকে তখন ১৪টি পাঠ্যবই পড়তে হয়! আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে যে সৃজনশীল মানুষ তৈরির কথা বলা হয়েছে, তা পরিণত হয়েছে গাইডশীল বা এ প্লাসশীল মানুষ তৈরির কারখানাতে। পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে ওঠা এসব শিশুরা যে যার অবস্থান থেকে, পেশাদারিত্ব থেকে সমাজের বা দেশের জন্য ভালো কিছু করতে আদৌ পারবে কি? যদি না পারে সে দায় কি তাদের? আমরা, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এসব শিশুদেরকে বড় করছি রবীন্দ্রনাথের তোতোকাহীনির তোতাটির মতো। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা গিলে যেভাবে পাখিটার শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল, আমাদের শিশুদেরও একই অবস্থা। সুশিক্ষিত হওয়ার পূর্বশর্ত স্বশিক্ষিত হওয়া। কিন্তু আমাদের শিশুরা না পারছে সুশিক্ষিত হতে, না পারছে স্বশিক্ষিত হতে। তারা শুধু ঔষধের মতো গাইডবই গিলছে। আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো,পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর গণমাধ্যমে দেখতে পাই, কাঙ্ক্ষিত করতে না পেরে ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যা, স্ট্রোক বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। একটা পরীক্ষা মানেই একটা জীবন নয়। কিন্তু শৈশবেই তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয় ‘এ প্লাস’ মানেই জীবন। শিশুদেরকে সফল ব্যাক্তিদের ইতিহাস শোনানো হয় বা পড়ানো হয়, একথা কি বলা হয় এসব সফলতার পেছনে কয়টি এ প্লাস ছিল? জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাস গৌরবের এবং ক্রমান্বয়ে উন্নতির পথে অগ্রসরমান। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মানবিক গুণাবলি বর্জিত মানুষরূপে গড়ে উঠলে তা সত্যিই ভয়াবহ হবে। তাই পরিকল্পিত শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত ভবিষ্যৎ নির্মাণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।
প্রথমেই উপস্থাপন করতে চাই বিশ্বের ১০টি দেশের কথা, যেসব দেশ বর্তমান বিশ্বের শিক্ষার রোল মডেল। এসব দেশের কথা এজন্যই শুরুতে আলোচনা করছি, যেন আমরা তাদেরকে অনুসরণ করে আমাদের দেশের শিক্ষা কাঠামোকে উন্নত ও টেকসই করতে পারি।
১ম: ফিনল্যান্ড : বিশ্বের সেরা শিক্ষা ব্যবস্থার এই দেশটিতে শিক্ষার্থীদেরকে খুব বেশি হোমওয়ার্ক করতে দেয়া হয়না। শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দময় করে উপস্থাপন করা হয়। ১৬ বছর বয়সে মাত্র একটি বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়।
২য়: সুইজারল্যান্ড : এখানে প্রাথমিক পর্যায়ের পর শিশুদের দক্ষতা পর্যবেক্ষণ করে তাদেরকে বিভিন্ন স্কুলে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে শিশুদের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী সেই উপযোগী শিক্ষা প্রদান করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন ভাষা শিক্ষাও দেয়া হয়।
৩য়: বেলজিয়াম : মাধ্যমিক পর্যায় হতে চার ধরণের স্কুল আছে এই দেশটিতে। ক. সাধারণ স্কুল খ. কারিগরি শিক্ষা বিষয়ক স্কুল গ. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ স্কুল ঘ. আর্ট স্কুল। প্রাথমিক স্কুলের যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে, মাধ্যমিক পর্যায় হতেই শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ পায়।
৪র্থ: সিঙ্গাপুর : বিজ্ঞান, রিডিং ও গণিত বিষয়ে বিভিন্ন দেশের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মান যাচাইয়ের পদ্ধতির নাম ‘পিসা’। এই তালিকায় সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা সব সময় এগিয়ে। শিক্ষাজীবনের প্রথম থেকেই তারা এই বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
৫ম: নেদারল্যান্ডস : ২০১৩ সালের ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী নেদারল্যান্ডসের শিশুরা সবচেয়ে সুখী জীবন যাপন করে। মাধ্যমিক পর্যায়ের আগ পর্যন্ত তাদেরকে বাসায় কোন পড়া দেয়া হয়না। কোন বিষয় পড়তে শিশুদেরকে বাধ্য করা হয়না। শিশুরা তাদের পছন্দের বিষয় বেছে নেয়ার সুযোগ পায় বলে স্বীয় বিষয়ে তারা পারদর্শীতা অর্জন করে।
৬ষ্ঠ : কাতার : ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে দেশটি। সে দেশের নাগরিকরা তাদের সন্তানদেরকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনামূল্যে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পান, আর নাগরিক ব্যতিত অন্যান্য বসবাসকারীরা তাদের সন্তানকে পাঠাতে হয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
৭ম: আয়ারল্যান্ড : এই দেশটির অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত হয় কিন্তু সকল অর্থ দেয় সরকার। কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হয়।
৮ম: নিউজিল্যান্ড : তিন ধরনের মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে এখানে। ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ে সরকারি স্কুলগুলোতে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি স্কুলে পড়ে ১২ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকি ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী যায় বেসরকারি স্কুলে।
৯ম: এস্তোনিয়া ও বার্বাডোজ : এই দুইটি দেশই নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থায় এগিয়ে। এস্তোনিয়া ১০১৫ সালে তাদের মোট জিডিপির ৪ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করেছিল। অপরদিকে বার্বাডোজ সরকারের শিক্ষাখাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে দেশটির স্বাক্ষরতার হার ৯৮ শতাংশ। এদেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি।
১০ম: জাপান : সাহিত্য, বিজ্ঞান ও গনিত চর্চার ক্ষেত্রে ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। জাপানের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে ছয় বছর। এ সময় তাদেরকে কোন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়না। এরপর তিন বছর জুনিয়র হাই স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে আরো তিন বছর হাইস্কুলে পড়ে। এরপর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয়ে পড়াশুনা করে।
বিশ্বের ১০টি শিক্ষাবান্ধব দেশের শিক্ষাপদ্ধতি থেকে আমাদের দেশের সরকার উপযুক্ত কিছু পদ্ধতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করলে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটবে বলে বিশ্বাস করি। কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হলে যথাস্থানে যথাযথ ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণ আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করতে চাই-
‘পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে ইসরায়ল সরকার ১৯৫২ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলো। আইনস্টাইন বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, আমি পদার্থবিজ্ঞানের নগন্য একজন ছাত্র। রাষ্ট্রের বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা কিছুই আমার নেই। আমি রাষ্ট্র পরিচালনার কি বুঝি?’
শুধুমাত্র শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে কার্যকর ফলাফল আশা করা যাবেনা। যাদের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হবে তাদেরকেও স্বীয় কাজে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সকল শিক্ষাবোর্ড, সকল শিক্ষকের সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যাবশ্যক।

x