শিশু যখন অন্তর্মুখী

রুহি আফরোজ

রবিবার , ২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
77

লাজুক শিশুকে বড় করে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল তাকে ঠিকমতো বুঝতে পারা। অনেক শিশুই জন্ম থেকে লাজুক স্বভাবের অধিকারী। আবার নিরাপত্তাহীনতাও শিশুদের অনেকসময় অন্তর্মুখী করে তোলে। একটু খেয়াল করে দেখুন তো আপনার সন্তান শারীরিকভাবে দুর্বল কিংবা ভিতু বলেই কি ও বেশি চুপচাপ থাকে? ওর সমবয়সী বন্ধু বা ভাইবোনদের সঙ্গে পেরে উঠবে না বলেই কি ও একা থাকতে পছন্দ করে?

বাসায় আজ খুব হই চই। সকাল থেকে বাবা, মা, দাদা, দাদী- সবাই খুব ব্যস্ত। আজ বাসার সবার আদরের রাইয়ান পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পা দেবে। সন্ধ্যা থেকেই নিমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। রাইয়ানের প্রিয় কার্টুন চরিত্র মটু পাতলু কেক চলে এসেছে। মাথায় জন্মদিনের টুপি পরে স্কুলের বন্ধুরা কেক কাটার জন্য রেডি। একটা টেবিল ভর্তি হয়ে গেছে উপহারসামগ্রী দিয়ে। কিন্তু এত আনন্দের মধ্যেও দেখা নেই বার্থডে বয়ের। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাইয়ানের মা তাকে আবিষ্কার করলেন খাটের তলায়। সেখানে নিজের খেলনা নিয়ে একাই খেলছে, তাকে ঘিরে থাকা উৎসব নিয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

আসলে রাইয়ান খুব লাজুক, মুখচোরা। বাসায় কেউ আসার কথা শুনলেই ও গিয়ে খাটের তলায় কিংবা দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। কারো সামনে কথা বলতেও চায় না। রাইয়ানের বাবা-মা খুব মিশুক, তারা বুঝেই উঠতে পারেন না ওর মনে এত ভয়, দ্বিধা কিংবা সংশয় কীসের?
আবার খেয়া কিন্তু রাইয়ানের মতো লাজুক নয়। খুব হাসিখুশি, মিশুক। খেয়ার বাবা-মা দুজনই গ্রুপ থিয়েটার করেন। ছোটবেলা থেকেই বাসায় নাটকের মহড়া দেখতে দেখতে বড় হয়েছে সে। তিন বছর বয়স থেকেই খেয়ার বাবা ওকে আবৃত্তি শেখাতে শুরু করেছেন, আর মা শেখান গান। চটপট নিখুঁত কবিতা আবৃত্তি করে বা সঠিক সুরে গান তুলে বাবা-মাকে চমকে দেয় নয় বছরের খেয়া। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বাবা-মা ছাড়া অন্য কারো সামনেই মুখ খুলবে না খেয়া। মঞ্চে উঠলে তার রীতিমত হাত-পা কাঁপে। খেয়ার বাবা-মা মেয়ের এই ব্যর্থতা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
অধিকাংশ বাবা-মা নিজের সন্তানকে স্মার্ট, সপ্রতিভ হিসাবেই দেখতে পছন্দ করেন। এই যুগে ক্লাসে প্রথম না হলে, সবচেয়ে জোরে না ছুটলে, চটপট শক্ত শক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে ভবিষ্যৎ যে একেবারেই অন্ধকার তা বারবার সন্তানকে মনে করিয়ে দেন বাবা-মায়েরা। তাহলে কী হবে রাইয়ান বা খেয়ার মতো শিশুদের? ওরা লাজুক, একা থাকতে ভালোবাসে, লোকজনের সামনে কুঁকড়ে যায়, তাই বলে কি ওদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই?
নিজের জগৎ নিয়ে অন্তর্মুখী শিশুরা সদাই ব্যস্ত। একা একা খেলা করা, রঙ ছিটিয়ে ছবি আঁকা, কাগজ কেটে এটা ওটা বানানো- মোটকথা এরা একা থাকতেই স্বচ্ছন্দ। লাজুক, অন্তর্মুখী শিশুদের বড় করে তোলার জন্য কিছু পরামর্শ জেনে নিন।
* আত্মবিশ্বাস তৈরি : সাফল্যের জন্য নয়, সন্তানকে প্রশংসা করুন তার চেষ্টার জন্য। অচেনা লোকের সঙ্গে আলাপ করতে শিশু অস্বস্তি বোধ করলে আপনি ওকে সাহায্য করুন। বারবার ‘তোমার নাম বলে দাও’ কিংবা ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞাসা করে এসব বলে বলে ওকে অপ্রস্তুত করবেন না। শুধু ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। ধীরে ধীরে ওকে নিজ থেকে স্বাভাবিক হতে দিন। বাসায় কেউ আসার কথা থাকলে আগে থেকেই সন্তানকে তার সম্পর্কে ধারণা দিন। ওকে অতিথি আপ্যায়নের কিছুকিছু দায়িত্ব দিতে পারেন। ভুল হলে দেখিয়ে দিন। কিন্তু সবার সামনে বকাবকি বা সমালোচনা করবেন না। ভাইবোনের সঙ্গে তুলনা করে ওকে লজ্জায় ফেলবেন না।
* সন্তানকে বুঝুন : লাজুক শিশুকে বড় করে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল তাকে ঠিকমতো বুঝতে পারা। অনেক শিশুই জন্ম থেকে লাজুক স্বভাবের অধিকারী। আবার নিরাপত্তাহীনতাও শিশুদের অনেকসময় অন্তর্মুখী করে তোলে। একটু খেয়াল করে দেখুন তো আপনার সন্তান শারীরিকভাবে দুর্বল কিংবা ভিতু বলেই কি ও বেশি চুপচাপ থাকে? ওর সমবয়সী বন্ধু বা ভাইবোনদের সঙ্গে পেরে উঠবে না বলেই কি ও একা থাকতে পছন্দ করে? অনেকসময় বাসার অন্য শিশুর সঙ্গে অন্তর্মুখী শিশুটির নেতিবাচক তুলনা করা হলে সে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অজান্তে আমরা এই ভুলগুলো করে সন্তানের সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলি। শিশুটি হাজার চেষ্টা করেও তার খোলস ছেড়ে তখন বেরিয়ে আসতে পারে না। প্রথমেই শিশুর সমস্যার কারণটা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। পড়াশোনায় দুর্বল বলে সে যদি অন্তর্মুখী হয় তাহলে আপনি ওকে এই ব্যাপারে সাহায্য করুন। হয়তো আপনার সন্তান শিক্ষক বা গৃহশিক্ষকের কাছে সহজ হতে পারছে না। তাই এক্ষেত্রে আপনার সহযোগিতা ওকে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করবে। কোনও মানসিক সমস্যা আছে বুঝতে পারলে ওর সঙ্গে কথা বলে ওর কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতার কারণ আন্দাজ করুন। দরকার হলে সাহায্য নিন কাউন্সিলরের।
* শখ এবং আগ্রহ : লাজুক শিশুরা নিজেদের জগতে বিচরণ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। ছোটবেলা থেকেই ওর শখ এবং আগ্রহের জায়গাটা বুঝতে চেষ্টা করুন। বই পড়া, গান শোনার অভ্যাস তৈরি করুন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা যেগুলো ও মজা পায়, আপনিও ওর সঙ্গে খেলুন। ওর পছন্দের যেকোনো শখের ক্লাসে ওকে ভর্তি করে দিন। সেখানেই আপনার সন্তান তার বন্ধু খুঁজে পাবে।
* মনে রাখুন : শিশু যা অপছন্দ করে সেগুলো নিয়ে ওকে জোর করবেন না। সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে কোনও প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেবেন না। বাঁধাধরা ছকে পড়াশোনা বা খেলাধুলার রুটিন চাপিয়ে না দিয়ে ওর উৎসাহ অনুযায়ী ওকে এগোতে দিন। এতে যদি ওর পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়, মুষড়ে পড়বেন না। সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ হয়ে ওঠাটাই সবচেয়ে জরুরি।

x