শিশু মনস্তত্ত্ব আয়ত্ত করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জরুরি

শুক্রবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৪:০৪ পূর্বাহ্ণ
35

বাংলাদেশের রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকের দ্বারা অপমানিত হয়ে নবম শ্রেণির একজন ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় চলছে। অভিভাবক, শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে ঘটনাটি রেখাপাত করেছে। এই নিয়ে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার গণমাধ্যম। অরিত্রীর পরিবারের দাবি -পরীক্ষার সময় সঙ্গে মোবাইল পাওয়ায় মেয়েটির বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ তোলা হয়। পরে অভিভাবকদের ডেকে অপদস্তও করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। আর বাবা-মায়ের অসম্মান সইতে না পেরেই আত্মঘাতী হয় অরিত্রী। বিষয়টি শুধু শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, ইতোমধ্যে হাইকোর্টের নজরে এসেছে এটি। এই আত্মহত্যার ঘটনাকে ‘অত্যন্ত বাজে দৃষ্টান্ত ও হৃদয়-বিদারক’ বলে মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রী চৌধুরী কেন আত্মহত্যা করেছেন- এর কারণ খুঁজতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের নিচে নয় এমন একজন প্রতিনিধি, একজন শিক্ষাবিদ, একজন মনোবিদ ও একজন আইনবিদকে রাখতে বলা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের উপায় নির্ণয় করে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়েও এই কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, বিদ্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়ে হাইকোর্ট গত ১৩ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে একটি রায় প্রদান করে। এই রায়ে উল্লেখ করা হয় যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্তৃক কোনো রকম শারীরিক শাস্তি প্রদান এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, অপমানজনক আচরণ শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে তা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ ও মানবাধিকার পরিপন্থী।
শিশু আইন ২০১৩-এর ধারা ৭০ অনুসারেও কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলাসহ এ ধরনের ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেও শিশুদের আত্মসম্মান ও শারীরিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে স্বাক্ষর প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেকোনো শিশুর প্রতি যেন নির্যাতন, অমানবিক ও অশ্রদ্ধাজনক আচরণ করা না হয় সে বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ।
প্রাবন্ধিক ও শিক্ষা গবেষক আবুল মোমেন বলেছেন, অরিত্রী আমাদের ব্যবস্থার ভিকটিম। এই ব্যবস্থায় সবাই মিলে তার কাছে যে ফল চেয়েছেন, হয়তো তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। হয়তো বাস্তবতার চাপে সে মরিয়া হয়ে ভুল কিছু করেছে আর যখন দেখল সেই ভুলের মাশুল বিকট রূপ ধারণ করে তার ওপরে আছড়ে পড়েছে, তাকে রক্ষার কেউ নেই। তখন ওই ছোট মানুষটি কোনো পথের দিশা পায়নি। এমনকি তার পিতা-মাতার ক্ষমাভিক্ষাও যখন অগ্রাহ্য হয়, তখন সেই সমাজ বা পৃথিবীর কাছ থেকে একরত্তি মেয়েটি আর কী আশা করতে পারে। ওই মুহূর্তে তার মনের আকাশের সব প্রদীপ দপ করে নিভে গিয়েছিল। তার সব আশা ও ভবিষ্যতের ওপর নেমে এসেছিল যবনিকা।
অল্প কয়েক বছর আগেও শিক্ষাঙ্গনে শারীরিক শাস্তি সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বিষয় ছিল না। মা-বাবা এটিকে শুধু সমর্থন করা নয়, তাঁরা বরং শিক্ষকদের উৎসাহিত করতেন তাঁদের সন্তানদের মানুষ করার জন্য শাস্তি প্রদান করতে। কিন্তু সময় পাল্টেছে। সমাজের মানুষগুলো সচেতন হয়ে উঠছে। শিশুদের অধিকারগুলো স্বীকার করে নিচ্ছে। বিদ্যালয়ে শিশু-কিশোররা যাতে শাস্তি না পায়, তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে শুরু করছেন সকলেই। আজকালের শিশু-কিশোররাও বেশ সেনসেটিভ। আত্মসম্মানবোধ প্রখর ওদের। তাই তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শ্রেণিকক্ষের ভালো ব্যবস্থাপনা মানে শাস্তি দেওয়া নয়। এ দুটিকে এক করে দেখা যাবে না। শ্রেণিকক্ষে ভালো ব্যবস্থাপনার ভিত্তি জোরজবরদস্তি নয়, বরং এটি তৈরি হয় বোঝাপড়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কার্যকর যোগাযোগের ভিত্তিতে। শারীরিক শাস্তি খারাপ আচরণ শেখানোর চেয়েও গুরুতর ব্যাপার। আমাদের শিক্ষকসমাজকে এটি বুঝতে হবে। আমাদের সবার বোধের মধ্যে আনা দরকার যে বিদ্যালয়গুলোতে যে শিক্ষার্থীরা আছে, তাদের সবার মধ্যেই একটি স্বাধীনচেতা সত্তা আছে। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মন আছে। স্কুলে ও বাসায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। শিশুরা তাদের যে স্বভাবসুলভ আচরণ করবে, তার সঙ্গে শিক্ষকদের পরিচিতি থাকতে হবে। দুরন্ত ও চঞ্চল শিশুদের কিভাবে সামলাতে হবে, কিভাবে তাদের সাথে ব্যবহার করতে হবে-এগুলোর ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ দরকার শিক্ষকদের। শিশু মনস্তত্ত্ব আয়ত্তে থাকা জরুরি।

x