শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুন : লেখালেখি ও বিষয়প্রসঙ্গ

বিপুল বড়ুয়া

শুক্রবার , ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ
34

লেখক রমজান আলী মামুনের জীবন-জগৎ এবং লেখালেখির বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ। কিন্তু অতসবের পরে যখন দেখা যায় প্রায় সাড়ে তিন দশকের সময়কাল লেখায় ব্যাপৃত থেকে রমজান আলী মামুনের চৌদ্দটি বই প্রকাশিত হয়েছে-তখন বইয়ের সংখ্যা নিয়ে- ছোট্ট আক্ষেপের পরও বলা যায় তিনি বেশ রয়ে সয়ে এগিয়ে আসছেন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে। বারান্তরে নানা আড্ডা-আলাপচারিতায় রমজান আলী মামুন বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন-বইয়ের সংখ্যা নিয়ে তিনি খুব একটা আহ্লাদিত নন বরং তিনি চান বই হোক তবে তা যেনতেন প্রকার লেখা নিয়ে নয়- পাঠককে ভালো কিছু উপহার দিতে পারাটাই হলো আনন্দের কথা। অন্যথা বইয়ের সংখ্যা নিয়ে তার কোনো সিরিয়াস চিন্তা ভাবনা নেই।
রমজান আলী মামুনের লেখালেখির দিকে এ মুহূর্তে যদি ফিরে তাকাই- তাহলে দেখা যায়-১৯৯১-২০১৯ এই দীর্ঘ সময়ে তার প্রকাশিত হয়েছে চৌদ্দটি বই। দুটি কিশোর উপন্যাস-রেল ছোটে মন ছোটে (২০১৬), মিঠু তুমি স্বাধীনতা (২০১৯)। ছয়টি গল্পগ্রন্থ- হারিয়ে যাওয়া দুপুরে, আকাশ পরি ও পাপিয়া, এক যে ছিলো রাজকন্যে, দিবা ও রহস্যময় বুড়ো, কিশোর নেমেছে যুদ্ধে, রুশনি ও একটি পতাকার গল্প, খুকি ও রবীন্দ্রনাথ। কিশোর কবিতাগ্রন্থ তিনটি- ‘নীল ডানা এক পাখি’, ‘সবুজাভ কোনো গ্রামে, ‘আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ’। একটি ছড়াগ্রন্থ- ‘ছড়ার গাড়ি থামবে বাড়ি’, দুইটি কাব্যগ্রন্থ- আমার অনেক কষ্ট আছে ও তোর জন্য কষ্ট আমার।
রমজান আলী মামুনের বইয়ের নির্ঘণ্টের দিকে তাকালেই একটা ব্যাপার বেশ ঝলমলে পরিষ্কার হয়ে ওঠে পাঠকদের সামনে। দীর্ঘ সময় ধরে লেখালেখি করে আসা রমজান আলী মামুনের কাছে শিশুসাহিত্য রচনা সর্বাংশে বেশ প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। সেক্ষেত্রে প্রকাশিত চৌদ্দটি বইয়ের মধ্যে বারোটি বই-ই শিশুসাহিত্য নিয়ে লেখা। বাকী দুটি বই- কাব্যগ্রন্থ তথা বড়দের বিষয় আশয় নিয়ে। তাছাড়া সাহিত্য আড্ডা- আসর-সমাবেশে প্রায় সব সময় দেখা যায় রমজান আলী মামুন মূলত শিশুসাহিত্য ভিত্তিক লেখা পাঠ করে মাত করে দিয়েছেন। তাই রমজান আলী মামুন আদ্যোপান্ত একজন কুশলী শিশুসাহিত্যিক হিসেবে-নিজকে উপস্থাপন করতে অতিমাত্রায় সফল হয়েছেনও বলা যায়।
আজকের এই ছোট্ট আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুনের শিশুসাহিত্য নিয়ে বিশ্লেষণ ও তার গতিপ্রকৃতি অন্বেষণ। দেখা গেলা- রমজান আলী মামুন এক নাগাড়ে নিরলসভাবে শিশুদের জন্য লিখে চলেছেন এবং তাঁর শিশুসাহিত্য গ্রন্থের আধিক্যও শতভাগ। তাই পাঠক তাঁর শিশুসাহিত্যের আলোচনা দাবি করতেই পারেন। যার প্রেক্ষিতে রমজান আলী মামুনের শিশুসাহিত্যের যৎকিঞ্চিৎ পূর্বাপর আলোচনায় ফিরে যাই।
শিশুসাহিত্যের গতি প্রকৃতি কেমন হবে- তা বোঝাতে গিয়ে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ : শিশুসাহিত্য-সুলিখিত প্রবন্ধে অতি প্রাঞ্জলভাবে উল্লেখ করেছেন …রবীন্দ্রনাথ চিরকাল ‘দূর থেকে শিশুকে দেখেছেন, তার সঙ্গে বিচ্ছেদবোধ ব্যথিত হয়েছেন, বারবার তৃষিত হয়েছেন তাকে ফিরে পাবার জন্য।’ অন্যত্র ‘….সেই জন্যেই বাইরে থেকে সংগ্রহ করা কোন ব্যাপার নয়, ভিতর থেকে তা হয়ে উঠেছে- আয়োজনহীন, আড়ম্বরহীন, অনায়াস স্বয়ম্বশ- ঠিক যেমন ঘুমের ভেতর স্বপ্ন- আর সেই জন্যেই এই পৃথিবী যেমনভাবে দিনে দিনে উন্মোচিত হয়েছে তাঁর কাছে, তারার ভাষায়, জলের রোলে, মেঘের রঙে, গাছের গড়নে, ফুলের গানে- সরল, কুণ্ঠাহীন, অবারিত….।’ দীর্ঘায়িত এই ধারণাকে যদি আমরা আমাদের শিশুসাহিত্যের মূল সুর হিসেবে মানি-তা বিচার্যে আমাদের শিশুসাহিত্য এক্ষেত্রের রমজান আলী মামুনের শিশুসাহিত্য বলা যায় বহুলাংশে বেশ ভাবনা পরমপরা পথও চলছে।
শুরুতে বলা যায়- শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুনের দুটি কিশোর উপন্যাস রয়েছে। ‘রেল ছোটে মন ছোটে’ (২০১৬) ও ‘মিঠু তুমি স্বাধীনতা’ (২০১৯)। কিশোর উপন্যাস দুটিতে লেখক দু’ধরনের বক্তব্য- অনুপুঙ্খ বিস্তৃতিতে তুলে ধরেছেন। শিশু কিশোররা তাদের বড়ো হয়ে ওঠার সময়কালে কিশোর জীবনের কিছু কিছু সময় স্মৃতি দীর্ঘ দিন মনে রাখে এবং দীর্ঘ দিন পরেও তা মনে করে গভীর দীর্ঘশ্বাস যেমন ফেলে- তেমনি আবার সময় বিশেষে কিশোরেরা আবার দারুণ অনুসন্ধিৎসু হয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠে। সংগ্রাম মুখরতায় দ্বিধাহীন হয়ে উঠে- এমনকি আত্মবিসর্জনেও পিছপা হয় না। এই দুই অনুষঙ্গের যথার্থ অনুরণন দেখা যায় শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুনের উপযুক্ত দুটি কিশোর উপন্যাসে। ‘রেল ছোটে মন ছোটে’ উপন্যাসে দেখা মেলে অন্তর্মুখী কিশোর টুটুলের। পরম প্রকৃতিনির্ভর টুটুল নিজকে হারিয়ে ফেলে প্রান্তজনের মাঝে-গৃহকোণের আন্তরিকতা তাকে বড়ো বেশি আপ্লুত করে, প্রকৃতির বৈরীতা তাকে বিষাদিত করে, দ্রুত কারো সাথে ভাবও জমে তার, আবার চেনা মুখকে পিছনে ফেলে নতুন বসতে তাকে ফিরে আসতে হয়- কাহিনীর এই নানা টানাপোড়নের উপজীব্যতায় গড়ে ওঠে- টুটুলকে নিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলা উপন্যাস। ভালোলাগার কাহিনী কথা-‘রেল ছোটে মন ছোটে’। উপন্যাসে আমরা আমাদের চলমান জীবন যাপনে খুব কাছে থেকে দেখি- টুটুল, হাফিজ চাচা, দাদিমা, টিনু, হাবলু, কুদ্দুস, শান্তা, ঝর্নাদি, বাবা ও মাকে। নানা ঘটনা পরম্পরায়-স্বাদ-বিস্বাদ- বিষাদের-অন্তর্বেদনার এক ঝলমলে কথকতা-এই উপন্যাস। যার নির্মিতিতে রয়েছে পর্ব কুশলতা-ছোট ছোট বাক্য বিন্যাস-ঘটনা প্রবাহের বিস্তারণ উপন্যাসটিকে বেশ সুখপাঠ্য করে তুলেছে। রমজান আলী মামুনের এই উপন্যাস চমকিত করে পাঠক মহলকে।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি নিয়ে রমজান আলী মামুনের কিশোর উপন্যাস ‘মিঠু তুমি স্বাধীনতা’ (২০১৯) আমাদের শিশুসাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন বলা যায়। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের এক ঝাঁক নিবেদিত প্রাণ মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণ, যুদ্ধকালীন ভয়াবহ হত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ, কারো উদ্বাস্তু হয়ে পালিয়ে ফেরা, কারো বা যুদ্ধ বিরোধিতা, এক কিশোরের নির্মোহ আত্মত্যাগ- এতসবের পাশাপাশি আর এক দুরন্ত কিশোরের ঘটনাপ্রবাহ নিখুঁতভাবে অবলোকন এই কিশোর উপন্যাসটিকে বাঙ্ময় করে তুলেছে। অক্ষরবৃত্ত পাণ্ডুলিপি পুরস্কার-২০১৮ প্রাপ্ত কিশোর উপন্যাস ‘মিঠু তুমি স্বাধীনতা’য় দেখা মেলে- দিপু, মিজান চাচা, ফুলি, অপু, বন্যা আপু, মেজ কাকা, দেবানন, বাবলু, দিপালীদি, বিমল কাকা এবং মিঠুর আত্মত্যাগ কাহিনী কথা-মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনপণ যুদ্ধ-দেশ স্বাধীনের নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষার- ঝরঝরে বর্ণনা প্রসঙ্গ-পর্ব বিন্যাস-যথাযথ ঘটনাবলির সংযোজনের মাধ্যমে রমজান আলী মামুন শিশু কিশোরদের জন্য দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক উল্লেখযোগ্য সময়কালকে উপস্থাপন করেছেন। দুটি উপন্যাসের ঝকঝকে মুদ্রণ-প্রচ্ছদ-অলংকরণ আকর্ষণীয় চিত্র সম্ভার-প্রকাশনাকে আরো সৌষ্ঠবময় করেছে।
শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুন শিশুতোষ গল্প রচনার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংখ্যাধিক্য থাকার পরও তাঁর কিশোর নেমেছে যুদ্ধে, খুকি ও রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো আলোচনায় আনলে এ কথার যথার্থ সত্যতা মেলে। মুহম্মদ নুরুল আবসারের আবির প্রকাশন হতে প্রকাশিত মোমিন উদ্দিন খালেদের চোখ ধাঁধানো প্রচ্ছদের এ গল্পগ্রন্থে রয়েছে কিশোর নেমেছে যুদ্ধে, সামনে আলোর দিন, তমালের একদিন, কর্ণফুলী ডাকে, মেঘলা দিনের গল্প, মেঘ ছেড়েছে ঘর শিরোনামে ছয়টি গল্প। শিশু-কিশোর মন মানসের আর্তি-অনুভূতি, কিশোরের ভাবুলতা, নদীর সাথে সখ্যতা, মেঘ বলয়ের প্রতি অপার আকুলতা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথার ভাস্বর চিত্র এঁকেছেন লেখক এ গল্পগুলোতে। দারুণ বর্ণনা- কল্পনাবিলাস- দূর প্রকৃতির মেলবন্ধন লেখক গল্পগুলোতে যথার্থ ভাবে উপস্থাপন করে পাঠকদের ভালো গল্প উপহার দিয়েছেন। আকর্ষণীয় শিরোনামে ‘খুকি ও রবীন্দ্রনাথ’ গল্পগ্রন্থে রমজান আলী মামুনের পাঁচটি গল্প রয়েছে। মঈন ফারুকের চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন হতে প্রকাশিত মৌমিতা করের অলঙ্করণে গল্পগ্রন্থে রয়েছে- এক দুপুরের গল্প, আইসক্রিমওয়ালা, যেতে যেতে, এক যে আছে নীলপরী, খুকি ও রবীন্দ্রনাথ শিরোনামে পাঁচটি গল্প। একাকীর কথামালা, হারানো সময়, দু’মেরুর মেলবন্ধন, পরিকাহিনী ও প্রতীকী কথামালার সৌরভে আমোদিত এ গল্পগ্রন্থ। এই দুই গল্পগ্রন্থে আমরা খুঁজে পাই সংবেদনশীল, পোড়খাওয়া নিবিষ্ট গল্পকারকে। যার গল্পে আরোপিত বিষয় প্রসঙ্গ নেই, চটজলদি বিষয় সমাধান নেই। গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন লেখক প্রয়োজনের নিরিখে-হৈ হুল্লোড়ের মচ্ছব দিয়ে গল্প শেষ করার তাগাদা লেখক অনুভব করেন না। এখানেই গল্পকার রমজান আলী মামুনের কিশোর গল্প লেখার শ্রম সাধনার সার্থকতা। শিশুসাহিত্যের একজন মেধাবী গল্পকার হিসেবে খ্যাত হওয়ার যথার্থতা।
কিশোরকবিতার ক্ষেত্রে রমজান আলী মামুনের যথেষ্ট পারঙ্গমতা রয়েছে। তার তিনটি কিশোর কবিতা গ্রন্থ-নীল ডানা এক পাখি (১৯৯১), সবুজাভ কোনো গ্রামে (২০১৬) ও আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ (২০১৮)। গল্প-ছড়ার পাশাপাশি কিশোরকবিতায়ও তিনি ভাবনায় ধরে রেখেছেন শিশু কিশোর মনের আর্তি, দূরাগত স্বপ্ন সুবাস, হৃদয়ানুভূতির প্রগাঢ় ছায়া- নি:শব্দ, মন মানসের বিষণ্নতার পাশাপাশি দু’হাত ভরে অনেক কিছু পাওয়ার মনকাড়া আনন্দ উচ্ছ্বাস সর্বোপরি দেশ প্রকৃতির অফুরান সৌন্দর্য বিলাস। যার ফলে কিশোর কবিতা অঙ্গনে কম লেখালেখি করেও মামুন এক্ষেত্রে তার পারদর্শিতার সমূহ স্বাক্ষর রেখেছেন। কিশোর কবিতা নির্মাণে মামুনের নিগুঢ় মনোযোগ-নৈ:শব্দ অবলোকন চোখে পড়ে। তাঁর- ‘আমি যখন কবিতা- ‘লেখাপড়ায় মন বসে না মোটে/মনটা কেবল তেপান্তরে ছোটে/ সপাং সপাং বেতের আঘাত ভুলে/সেলফে রাখি বই খাতা সব তুলে/….সিটি দিয়ে দূরের জাহাজ ভেসে/ ছুটতে থাকে একটু যেন হেসে/ আমি তখন বাড়ির কথা ভুলে/ রাত্রি কাটাই কর্ণফুলির কূলে।’
‘নীল ডানা এক পাখি’ কবিতা ‘….‘মনটা থাকে মেঘের দেশে/ হওয়ার রেলে ভেসে/আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়/আবার কখন এসে/ স্বপ্নালু এই মনটা আমার/ নীল ডানা এক পাখি/ সজিব হাওয়ার গন্ধ নিয়ে/করবে মাখামাখি। (নীল ডানা এক পাখি)। কবির অন্তপ্রাণ চিন্তা চারপাশ অবলোকন করে তাঁর চেনা জানা মুখর মুখগুলো- মামুনের কিশোরকবিতায় তার প্রতিচ্ছবি বার বার ফিরে আসে রূপ অপরূপ হয়ে মুগ্ধ করে পাঠককে। তাঁর কিশোরকবিতা ‘একটি খুকির বুকে ‘…‘যোজন দূরে হাজার তারায়/ রাতের আকাশ থমকে দাঁড়ায়/ কিসের গন্ধ শুঁকে/ অন্ধকারের পাষাণ টুটে/কষ্টগুলো উথলে উঠে/ একটি খুকির বুকে।’ (সবুজাভ কোনো গ্রামে)। প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ মানুষ মাত্রই মনোসঙ্গী। যা হৃদয় মনকে আবেশে মুগ্ধ করে- বিমোহিত করে- অন্তরাত্মাকে। রমজান আলী মামুনের পাঠক প্রিয় ভালোলাগার ‘দূর পাহাড়ের ডাক’ কবিতাংশ এখানে উল্লেখ করার মতো ‘…এইখানে রাত আসে মায়াবী খামে/জোছনার ফুল ফোটে পাহাড় চূড়ায়/ বুনো ঝোপ লতাপাতা মাড়িয়ে একা/ এখানেই সুখ খুঁজি কলমি দামে।’ (সবুজাভ কোনো গ্রামে)। একটু দেরিতে বেরোলো মামুনের তৃতীয় কিশোরকবিতা গ্রন্থ ‘আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ’। আনিস সুজনের অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনের ফারজানা পায়েলের ঝলমলে এ প্রকাশনায় মামুন নিজকে যেনো আরো বর্ণিলভাবে তুলে ধরেছে পাঠকের কাছে। এ কবিতাগ্রন্থের বেশ কটি কবিতা লেখকের জাত চিনিয়েছে পাঠককে। মা-মাটি- চেনা জানা মুখ ফেলে আসা দিন বুকের ভেতর স্বপ্নালুতা এত সবের চালচিত্র মামুন অপূর্ব কাব্যময়তায় ধরে রেখেছেন এ গ্রন্থে। ‘রেলগাড়ি খুঁজে কাকে’ কবিতা-‘রেলগাড়ি ঝিকঝিক/ছুটে চলে গঞ্জে/ মা’র কথা মনে হলে/ শুধু কাঁদে মন যে।’/ রেল গাড়ি খুঁজে কাকে/ মেলে দুই দৃষ্টি/মার কথা মনে হলে/ চোখে নামে বৃষ্টি।’ (আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ)। দেশপ্রেম কবিকে নিশিদিন উদ্বেলিত করে তার সনিষ্ট উচ্চারণ মামুনের ‘কোথাও যাবো না মাগো’ কবিতায়-‘এদেশ ছেড়ে কোথাও যাবো না মাগো/ তোমার কেবল হারিয়ে যাওয়ার ভয়/ কেনো যে বুঝো না/এ কথা মানো না/ আমি তো এখন ছোট্টটি আর নই।’ (আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ) এ কবিতাগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা-‘ও-দরদী ’ কবির সমপ্রতি প্রয়াত মাকে নিয়ে লেখা। কবির অপার মাতৃস্নে ব্যথাতুর বিবাগী মন পেছন ফেরা সময় জীবন পাঠককে সত্যি বেদনার্থ করে তোলে নস্টালজিক করে তোলে…‘এমনি গেছে দিন/ মা ও ছেলের মন বেদনায়/বুক করে চিন চিন/আজকে আমি একা/ও-দরদি দু:খিনী মা/ দাওনা কেনো দেখা।’ (আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ)।
রমজান আলী মামুনের কিশোরকবিতা-আমাদের কিশোরকবিতার অনেক অনেক সমৃদ্ধ ভুবনে মামুনের ভাবনা-কবিতা নির্মাণ বিষয় বৈচিত্র্য-চিত্রকলা উপমা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলা যায়। ছোট্ট জমিনে মামুনের কাব্য ভাবনা এবং তার আয়েশ-আয়োজন ধরে রাখার কুশলতা আমাদের চমকিত করে আগামীর জন্য। আগ্রহান্বিত করে তোলে আরো জমজমাট কিশোরকবিতা সৃজনের মৌতাতের জন্য।
উপন্যাস-গল্প-কিশোরকবিতার ক্ষেত্রে রমজান আলী মামুনকে দেখা যায় নিরলস নিরন্তর অভিযাত্রার কুশলী লেখক হিসেবে। কিন্তু শিশুসাহিত্যের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছড়ার ক্ষেত্রে রমজান আলী মামুন তোড়জোড় করে এগিয়ে আসেননি। দেশের পত্র-পত্রিকা-সাময়িকী সংকলন-লিটলম্যাগ দীর্ঘ সময় নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া কিংবা কারো আহ্বানে সাড়া দিতে কিংবা আড্ডা-আয়োজন সরব থাকতে প্রচুর ছড়া লিখেছেন-ছড়াশিল্পী হিসেবে দারুণ পরিচিতি ও ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন। তার পরও হাতের কাছে পাওয়া ছড়াগুলো নিয়ে ২০১৪ সালে ছড়াশিল্পী মিজানুর রহমান শামীমের প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরিয়েছে তার একমাত্র ছড়াগ্রন্থ ‘ছড়ার গাড়ি থামবে বাড়ি।’ এ ছড়াগ্রন্থে হাতে গোনা তেরটি ছড়া রয়েছে। ছড়াগুলো মিষ্টি মজার, আশপাশের চালচিত্র নির্ভর। একান্ত ছোটদের বিষয় ভাবনার নিকেশ রয়েছে ছড়াগুলোতে-যা পাঠককে আনন্দ দেয়-মামুনের শিশু সুলভ মন মানসিকতা প্রকাশ ঘটায়। ছড়াগ্রন্থের ছড়া, ‘আজকে সারা দুপুর’- ‘সূর্য মামা কোথায় হাওয়া/রোদের কলস উপুড়/নিয়ম মাফিক/দেয়না ধরা/আজকে সারা দুপুর।’ ‘মা’-‘নাইবা থাকুক ডিগ্রি বড়ো/ যশ খ্যাতি সম্মান/ মা আছে তাই দুখের মাঝে/শান্তি অফুরান/।’ ‘চাঁদমুখ’-‘চাঁদপনা মুখখানা/ সেই তো সবার জানা/ কোন সে বাড়ির ঝি/ চাই যে খেতে ঘি।’ ‘পাপিয়া মনি’-‘পাপিয়া মনি ছুটিয়ে ঘোড়া/ তুই হবি রাজকন্যে/দুধমাখা ভাত পাতে রেখে/মা কাঁদে তোর জন্যে। ছড়া কম লিখেও ছড়াগ্রন্থ বের না করেও এ ছড়াগুলোর শানানো চমক দেখে ছড়াশিল্পী রমজান আলী মামুনের ছড়া নির্মিতির শক্তিমত্তার খুব পরিচয় পাওয়া যায়। বলা যায় ছড়ায়ও রমজান আলী মামুন বেশ পারঙ্গম।
শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুন। শিশুতোষ উপন্যাস-গল্প-কিশোরকবিতা-ছড়ার একজন কুশলী লেখক। তাঁর দুটি সাড়াজাগানো কবিতাগ্রন্থও রয়েছে-‘আমার অনেক কষ্ট আছে’ ও ‘তোর জন্য কষ্ট আমার।’ শুধু লেখালেখি নয় লেখক রমজান আলী মামুন একজন দক্ষ সংগঠকও। স্বকাল শিশুসাহিত্য সংসদের অন্যতম কর্ণধার। শিশুকিশোর সাময়িকী ‘কথন’এর নির্বাহী সম্পাদক। আলোর পাতার সম্পাদনা পর্ষদ এর সদস্য। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক ফোরাম’ এর সিনিয়র সহ-সভাপতি, টেরীবাজারস্থ বদরপুকুরপাড় উত্তরপাড় সামাজিক সংগঠন ‘যুবকণ্ঠের’ সভাপতি। একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবেও ঘাটফরহাদবেগ সরকারি প্রাথমিক বালক বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষক অভিভাবক কমিটির সভাপতি হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছিলেন জনপ্রিয় কিশোর সাময়িকী কিশোর সমাবেশের সম্পাদক।
রমজান আলী মামুন দীর্ঘ সাড়ে দিন দশকের লেখালেখির জগতে সম্পৃক্ত থেকে বহুমাত্রিক সৃজনশীল লেখালেখির জন্য সম্মানিত হয়েছেন-সম্মাননা পেয়েছেন-মনন সাহিত্য সম্মাননা-২০১২, বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি কর্তৃক কিশোর-কবিতা সম্মাননা-২০১৬, বঙ্গবন্ধু একাডেমি কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সম্মাননা-২০১৮ ও অক্ষরবৃত্ত শিশুসাহিত্য পাণ্ডুলিপি পুরস্কার-২০১৮।
শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুনের শিশুসাহিত্য নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে বলা যায়-শিশুতোষ ভাবনা, বিস্তার, মন মানসের সৃজনে কিংবা কাছে দূরের প্রকৃতির সাথে শিশু কিশোরেদের অন্তর্সংযোগ মামুন যথেষ্ট সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। একজন লেখক-লেখালেখির ঋদ্ধজন এভাবেই তার লেখনিতে চারপাশ জীবন-জগৎ-আনন্দ বেদনা বয়সানুক্রমে প্রকাশ করার মাধ্যমেই বলা যায় তার দায়বদ্ধতার স্বরূপ প্রকাশ করেন। এবং শিশুসাহিত্যিক রমজান আলী মামুনও তা করে খ্যাত হয়েছেন- সবার প্রশংসা পেয়েছেন।
[গত ২৪ সেপ্টেম্বর রমজান আলী মামুন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন অন্যলোকে। তাঁর অকাল প্রয়াণে আমরা শোকাহত]।

x