শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহ্‌মদ

আজিজুল কদির

বুধবার , ২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৮ পূর্বাহ্ণ
16

১৯৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন এখলাসউদ্দিন আহ্‌মদ। অনন্যসাধারণ শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহ্‌মদ। তাঁর এক যে ছিল নেংটি, তুনুর দুপুর, তুনুর হারানো পুতুলগুলো, বৈঠকি ছড়া, প্রতিরোধের ছড়া ইত্যাদি বাংলা শিশুসাহিত্যের স্বর্ণসম্পদ। তাঁর সৃষ্ট শিশুসাহিত্যিক চরিত্র ‘তুনু’ কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের প্রিয় চরিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পাশাপাশি সাহিত্য সংগঠক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ-এর মধ্য দিয়ে যে এখলাসউদ্দিন আহমদকে চিনতে শুরু করে,পরবর্তীতে তিনি ক্রমশ আমাদের সাহিত্য সাংস্কৃতিক জীবনকে যে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, তা কখনো ভুলবার নয়। ষাটের দশকে বাংলার সাহিত্য আন্দোলনের পুরো ভাগে যারা ছিলেন এখলাসউদ্দিন ছিলেন তাদেরই একজন। অর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা ভাষার শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন দৈনিক জনকণ্ঠে। তার লেখা একদিকে শিশু-কিশোরদের নির্মল আনন্দ দিয়েছে, অন্যদিকে তুলে ধরেছে দেশ ও সমাজের নানা অসঙ্গতি। কখনো আবার ছন্দে বাধা রাজনৈতিক প্রতিবাদও ধারণ করেছে তার ছড়া। শুধু ছড়া নয়, শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প, উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। তার সৃষ্টি ‘তুনু’, ‘তপু’ ও ‘কেঁদো’ চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে শিশুদের বন্ধু। নানা দেশের গল্প, ছড়া ও কবিতার সংকলনের সম্পাদনা করেও তিনি বাংলা শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
শিশুসাহিত্যের পত্রিকা টাপুর টুপুর সম্পাদনা এবং চট্টগ্রামের বইঘর প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে আধুনিকতা ও রুচিস্নিগ্ধতার স্বাক্ষর রেখেছেন এখলাসউদ্দিন। শিশুদের তিনি প্রকৃতি ও মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। বাংলাদেশের শিশু-কিশোর সাহিত্যকে যুক্ত করেছেন প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে। সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকাকালে গতানুগতিক বৃত্তের বাইরে সংবাদপত্রের মানবিক দিককে করেছেন সমৃদ্ধ। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। শামসুর রাহমানসহ আমাদের সেরা সাহিত্যিকদের তিনি শিশুদের জন্য লিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন। কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাস সংবাদপত্রের পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশেও তাঁর অবদান ভুলবার নয়। এই বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক এখন আমাদের মাঝে নেই। ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এখলাসউদ্দিন রচিত ছড়া ও কবিতার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হাসির ছড়া মজার ছড়া’, ‘তুনতু বুড়ির ছড়া’, ‘টুকরো ছড়ার ঝাঁপি’, ‘বাজাও ঝাঁঝর বাদ্যি’, ‘ইকরি মিকরি’, ‘বৈঠকী ছড়া’, ‘কাটুম কুটুম’, ‘ছোট রঙিন পাখি’, ‘প্রতিরোধের ছড়া’, ‘অষ্টাশির ছড়া’, ‘ছড়ানো ছিটানো ছড়া’, ‘বাছাই ছড়া’। এ ছাড়া এখলাসউদ্দিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে,টাপুর টুপুর,ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ,রঙিন ফানুস,দুই বাংলার ছোটদের গল্প,দুই বাংলার ছেলে ভুলানো ছড়া,দুই বাংলার একালের ছড়া,হাজার বছরের কিশোর কবিতা,বাংলাদেশের ছোটগল্প,ফিরে দেখা,তিনতানীর গপ্পো,ভর সন্ধ্যে বেলা,তুনতু বুড়ির ইচ্ছাকাঠি,তপুর ভুবন,তপুর যুদ্ধ যুদ্ধে ফেরা, ডাকাতের মুখোমুখি,তপু ও চন্দ্রপরী,কেঁদোকে নিয়ে,কেঁদোর ছক্কি তুনুর ঘরে,কেঁদোর ভিত্তি,বাছাই ছড়া,হাদারামের ভূত দেখা,খুঁজে ফেরা,কেঁদো,দশটি কিশোর উপন্যাস,আলসে ভূতের গপ্পো,তুনু ও তার বন্ধুরা,ভূষন্ডি ও কাকতাড়ুয়ার গপ্পো,তপুর হারানো দিনগুলো,তুনু ও তাকতুর গপ্পো,মেঘ বৃষ্টির গপ্পো,ছোটদের দশটি উপন্যাস,নির্বাচিত কিশোর উপন্যাস,জানালাটা খুলে দাও,গল্পগুলো অর্কের,তনুর ভালো লাগা না লাগা,তনু সমগ্র ১,এখলাসউদ্দিন আহমদের রচনা সমগ্র। সম্মাননা ও পুরস্কার মধ্যে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এখলাসউদ্দিন একুশে পদক পান ২০০০ সালে। এছাড়া ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গ যুব উৎসব পুরস্কার, ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু একাডেমি পুরস্কার উল্লেখযোগ্য,২০০৪ সালে কবীর চৌধুরী শিশু সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে ইউরো শিশু সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

x