শিশুর নানা রোগবালাই

প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

শনিবার , ১ জুন, ২০১৯ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
64

শিশুর বমি
বমি শিশু বয়সের এক সচরাচর উপসর্গ। শুধু যে আন্ত্রিক কারণে শিশুদের বমি হয় তা নয়, মানসিক চাপ, মস্তিষ্কের ও কিডনির নানা অসুখে শিশু বমি করে। বমিতে পাকস্থলীর জমাকৃত খাদ্য, পানীয় তীব্র বেগে বের হয়ে আসে। প্রথমে বমি বমি ভাব লাগে, তারপর জোরের সাথে বমি হয়ে যায়। তবে ছোট শিশুতে বা মস্তিষ্কের আভ্যন্তরীণ প্রেসার বৃদ্ধিজনিত অসুখে যেমন ব্রেইন টিউমারে বমিভাব ছাড়াই বমি হয়।
নবজাতক শিশু বুকের দুধ পানকালে কিছু বাতাস গিলে ফেলে, তা যখন উঠে আসে সাথে কিছু দুধও আপনা আপনি উঠে আসে। দিনে যা প্রায় অনেকবার হয়ে থাকে।
এটা বমি না- এটা হলো পোসেটিং। শিশুকে বুকের দুধ পানের পূর্বে, পান করানোর সময় বা পরে পিঠের ওপর আলতো চাপ দিয়ে এই বাতাস বের করে দেয়া যায়।
তবে যে শিশু বমি করে তার আদ্যোপান্ত ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে নিতে হয়। কতক্ষণ ধরে বমি, কতবার, সাথে রক্ত বা পিক্তরস পেটব্যথা আছে কিনা, তার খাদ্যাভাসে সাম্প্রতিক পরিবর্তন, প্রস্রাবের রঙ, ঔষধ সেবনের ইতিহাস, জ্বর, চেতনা লোপ, পানিস্বল্পতা, শাসতন্ত্র, মূত্রতন্ত্র ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ এসবের খোঁজ বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
নবজাতক বয়সে তীব্র বমি সেপসিস বা মারাত্মক ইনফেকশানস্‌ জাতীয় অসুখ, মেনিনজাইটিস কিংবা অন্ত্রের অবস্ট্রাকশান এর প্রথম লক্ষণ হয়ে আসতে পারে।
শিশু বয়সে বমির সাথে যেসব লক্ষণ থাকলে ‘লাল নিশান’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত সেসব হলো:
১. দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বমি
২. পেট ফেঁপে যাওয়া
৩. পেটে চাকা
৪. বাচ্চা ওজনে বাড়ছে না বা ওজন পড়ে যাচ্ছে
৫. তার ওজন লোপ পাচ্ছে
৬. মাথার চাঁদি ফুলে আছে বা দীর্ঘক্ষণ ধরে
শিরঃপীড়া
৭. একদম সুস্থ শিশু, তার হঠাৎ বমি বা অসুস্থ
শিশুতে বমির সাথে জ্বর দেখা দিয়েছে
৮. বমিতে রক্ত বা পিত্তরস দেখা গেছে প্রভৃতি।
এসব ক্ষেত্রে ত্বরিত রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা জরুরি।

শিশুর হার্টের অসুখ?

অনেক শিশু হার্টের জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মায়। এরুপ শিশুর জীবন সংহারক জটিলতাসমূহ নিরসনে আশুরোগ নির্ণয় জরুরি। শিশু যদি হার্টের সমস্যায় ভোগে তবে শিশু নির্দিষ্ট উপসর্গ ও রোগলক্ষণ দেখা যায়। এরি সাথে শিশুবয়সে হৃদরোগ ঝুঁকি বা হার্টের অসুখ তৈরিতে জড়িত রোগ ইতিহাসও পাওয়া যায়। যেমন :
১. মুখাবয়ব বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ত্রুটি। শিশু যদি ডাউন, টারনার প্রভৃতি জেনেটিক, মেটাবলিক জন্মরোগে আক্রান্ত থাকে তবে তার চেহারার অস্বাভাবিকতার সঙ্গে হার্টের জন্মত্রুটি থাকার সম্ভাবনা থেকে যায়।
২. গর্ভপূর্ব বা গর্ভকালিন সময়ে মায়ের জ্বর, জ্বরের সাথে র‌্যাশ, ডায়বেটিস, খিঁচুনি রোধক ঔষধ যেমন- ভেলপ্রোয়েট প্রভৃতি সেবন ইতিহাস
৩. জন্মের পর পর শিশুর বার্থ এসপাইয়েশিয়া বা শ্বাসরোধ অবস্থা, ভূমিষ্ট হবার প্রথম সোনালি মিনিটে কান্না না করা, অক্সিজেন মাত্রা কম থাকা, প্রথম বছরগুলোতে স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া জন্মহৃদরোগ হওয়ার আশংকা বাড়িয়ে দেয়
৪. পূর্বের সন্তানে হৃদরোগ থাকলে বা নিকটাআত্মীয়ের বিয়েতে শিশুর হার্টের অসুখের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শিশুর হার্টে অসুখের লক্ষণনামা
১. নবজাতক বয়সে বা প্রথম বছরে হার্ট ফেলিওর, বুকের দুধ পানকালে শিশুর শ্বাসহার বেড়ে যাওয়া। স্তন্যপানকালে একটুতে হাঁপিয়ে ওঠা, মাথা- কপাল ঘেমে যাওয়া, ওজনে না বাড়া
২. এছাড়া শিশুর ঠোঁট জিভ নখ নীল হয়ে যাওয়া। মা সন্তানের বুকের ধুপধুপ আওয়াজ শুনতে পান
৩. ঘুমে ব্যাঘাত, ঘনঘন শ্বাসতন্ত্রের অসুখেপড়া, চেহারার অস্বাভাবিকতা
৪. বড় শিশুতে সমস্যা : দৌড় ঝাঁপ করলে পরিশ্রান্ত হয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, চোখ মুখ আঁধার করে আসা, মুর্চ্ছা যাওয়া। খেলাধুলা করলে বুকে ব্যথা, বুকে মারমারধ্বনি শুনতে পাওয়া, উচ্চরক্তচাপ, খিচুঁনি প্রভৃতি লক্ষণাদি।

শিশুর জ্বর
সাথে র‌্যাশ

জ্বরের সঙ্গে ত্বকে র‌্যাশ দেখা দিলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিতে হয়। ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ইনফেকশানসে বা অ্যালার্জী জনিত কারণে এটা হয়ে থাকে। শিশু বয়সে দেখা যাওয়া র‌্যাশের অধিকাংশ হয় ভাইরাস সংক্রমনে যা তেমন ক্ষতিকারক না, আপনা আপনি কোনো চিকিৎসা ব্যতিরেকে চলে যায়।
তবে তাদের কতক বেশ মারাত্মক প্রকৃতির ও জীবন সংহারক হয়ে দেখা দেয়। এজন্য এগুলোকে প্রথম থেকে চিহ্নিত করে ফেলতে হবে।
আবার অনেক র‌্যাশ আছে যারা প্রায় একই রকমের। ফলে নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
তবুয়ো ক্লিনিকেল প্র্যাকটিসে এসব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।
যেসব কারণে শিশুতে জ্বরের সাথে র‌্যাশ দেখা যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
১. অ্যালার্জিঘটিত : ঔষধ, আরটিকেরিয়া, রক্ত নালির প্রদাহ
২. ইনফেকশানস্‌ : হাম, জলবসন্ত, ডেঙ্গু জ্বর, টাইফইড, রুবেলা, হারপেস ঝোসটার, মেনিনগোককসেমিয়া
৩. অন্যান্য : কাওয়াসাকি ডিজিজ, এসএলই, টেন প্রভৃতি রোগ
শিশুতে জ্বরের সঙ্গে র‌্যাশ দেখা দিলে যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. কতদিনের জ্বর ও তার গতি প্রকৃতি, ঔষধ বহনের ইতিহাস, র‌্যাশের অবস্থান, চুলকানো, ইত্যাদি ইতিহাস
২. রক্তের সিবিসি ও আনুষঙ্গিক ল্যাব পরীক্ষা
৩. সুনির্দিষ্ট কারণের চিকিৎসা

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

x