শিশুর কৈশোর ও বয়:সন্ধিকাল

প্রফেসর ডা. প্রবীণ কুমার চৌধুরি

শনিবার , ৩ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
25

কৈশোরকাল কি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী ১০-১৯ বছর শৈশবকাল থেকে যৌবনে পদার্পনের মধ্যবর্তী সময়) বয়সটাই হলো কৈশোরকাল বা বয়ঃসন্ধিকাল। অর্থাৎ মানব জীবনের যে সময়ে বা বয়সে শারীরিক ও মানসিক ব্যাপক পরিবর্তন হয়, সে বয়সের ছেলে-মেয়েদেরকেই বলা হয় কিশোর-কিশোরী।
জন্মের পর থেকেই ছেলেমেয়েদের দেহের যে দ্রুত বর্ধন প্রক্রিয়া আমরা দেখে থাকি তা চলতে থাকে ১৮/১৯ বৎসর বয়স পর্যন্ত। মেয়েদের ১ থেকে ১৩ বৎসর বয়সে এবং ছেলেদের ১১ থেকে ১৩ বৎসর বয়সেই বৃদ্ধি সর্বাপেক্ষা দ্রুত ঘটে থাকে। এর পর কিছটা স্থুল হলেও ছেলেদের এই বৃদ্ধি চলতে থাকে ১৮ থেকে ১৯ বৎসর পর্যন্ত। দেহ বৃদ্ধির সময়কে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা হয়-
কোলের শিশু জন্ম থেকে ১ বৎসর
প্রাক স্কুল বয়সী ছেলেমেয়ে ১-৫ বৎসর
স্কুল বয়সের ছেলেমেয়ে ৬-১২ বৎসর
কিশোর/কিশোরী/ বয়ঃসন্ধিকাল ১০-১৯ বৎসর
বয়ঃসন্ধিকাল কি?

অপরদিকে বয়ঃসন্ধিকাল হলো এই বয়সমীমার (১০-১৯ বছর) একটি পর্যায়। বয়ঃসন্ধিকাল কোনো ব্যক্তির জীবনের নির্দিষ্ট বয়ঃসীমা নয়। এই পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের বিকাশ যেমন, যৌবনারম্ভের লক্ষণসমূহ এবং যৌন ও প্রজনন ক্ষমতা পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। মানসিক বিকাশ এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বের প্রতি সচেতনতা বাড়ে। এ পর্যায়ে কিশোর-কিশোরিরা আর্থ-সামাজিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করে। নিজেদের ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিও সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো সকলের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন এ চাহিদা এক রকম নয়। তাদের চাহিদা লিঙ্গ, বিকাশের পর্যায়, জীবনের পরিস্থিতি এবং পারিপার্শ্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। ছেলেদের তুলনাায় সাধারণত মেয়েদের বয়ঃসন্ধি আগে শুরু হয়।
লিঙ্গ বয়ঃসন্ধিকালের শুরু
মেয়ে ১০-১২ বছর
ছেলে ১১-১২ বছর

তবে বিভিন্ন কারণে বয়ঃসন্ধি বিলম্ব হতে পারে।
কৈশোরকালে রোগের ঝুঁকি

কৈশোরে মানুষের জীবনযাত্রা ও খাবারের রুচির পরিবর্তন হয়। কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগতে পারে কারণ সে সময় তাদের অধিক মাত্রায় পুষ্টির প্রয়োজন হয় এবং তাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সমস্যা প্রায়ই অসনক্ত অবস্থাঅয় থাকে। অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে কৈশোরকালীন স্বাস্থের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। যেমন:
আয়রনের অভাবে কৈশোরকালে শারীরিক বৃদ্ধি বিলম্বিত হতে পারে। বিশেষ করে কিশোরীদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মাসিক ঋতুস্রাবের কারণে শরীরে আায়রনের চাহিদা বেড়ে যায়।
আয়রন ঘাটতির কারণে শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, স্বাভাবিক জ্ঞান বৃদ্ধির বিকাশ কমে যায়। পড়ালোখার প্রতি মনোযোগ অনেকাংশে কমে যায় ফলে স্কুলে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণ ( বিশেষ করে মা যদি অপুষ্টিতে ভোগেন ও বেঁটে হন) মা ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
অতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম, মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে কৈশোরকালে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পারিবারে মধ্যে খাবার বিতরণ ও খাবার গ্রহণে ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রথাগত আচরণের কারণে অনেক দেশে শৈশব থেকে শুরু করে কৈশোরকাল পর্যন্ত মেয়েরা বিশেষভাবে অপুষ্টির শিকার হয়ে থাকে।
কৈশোরকালে পুষ্টি কেন প্রয়োজন

কৈশোরকালে শরীর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মেয়েদের শারীরিক বৃদ্ধি দ্রুত হয় ১০-১৩ বছর বয়সের মধ্যে আর ছেলেদের ক্ষেত্রে তা হয় ১২-১৫ বছর বয়সের মধ্যে।
এই সময় শরীরের কাঠামোগত বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।
এই সময় শরীরে গ্রোথ হরমেরন নামক এক বিশেষ হরমোন বেশি করে তৈরি হয় যা দ্রুত বৃদ্ধির কাজ করে।
এই সময় দেহের চাহিদামাফিক পুষ্টিকর ও সুষম খাবার না পেলে শরীরের বৃদ্ধি পুরোপুরি হয় না।
কৈশোরকালে মোট উচ্চতার ১০-২০% এবং মোট ওজনের ২৫-৫০% ওজন বৃদ্ধি হয়। এজন্য ছেলে মেয়েদের এই সময়কার পুষ্টির উপর নির্ভর করে তাদের শারীরিক উচ্চতা বৃদ্ধি।
এছাড়াও গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ঝুঁকি ও কম ওজনের শিশু জন্মদানের সম্ভাবনা কমানোর ক্ষেত্রেও কিশোরীর পুষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৈশোরকালের অপুষ্টিজনিত ক্ষতিকর সমস্যা

সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে কৈশোরকালের পাঁচটি মূল পুষ্টিজনিত সমস্যা নির্ণয় করা গেছে। কম এবং মাঝারি উপার্জনকারী দেশগুলির কিশোরীদের জন্য-
১. অল্প পুষ্টি এবং পুষ্টিশক্তিজনিত অভাব
২. মাইক্রো খাদ্য উপাদানের অভাব-লৌহ অভাবজনিত রক্ত স্বল্পতা
৩. খাদ্যাভ্যাস সমস্যা- স্থুলতা ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা, এনোরেক্সিয়া নার্ভোসা
৪. অল্প বয়সে গর্ভধারণ
৫. অস্বাস্থকর খাবার এবং জীবনযাত্রার মান।
লৌহ ঘাটতি জনিত রক্তস্বল্পতার কারণ

ওজন কামনোর জন্য ভোজন প্রণালী এবং স্বল্প আহার
কিছু সংক্রমণ যেমন ম্যালেরিয়া, গুড়া কৃমি-যেখানে লৌহের প্রয়োজন বৃদ্ধি পায়
অতিরিক্ত রক্তস্রাব
অতিরিক্ত বা দীর্ঘকালীন পরিশ্রম
রক্তস্বল্পতার পরিণতি

শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষমতা হ্রাস
শিশু এবং কিশোরিদের বোধশক্তির পরিবর্তন
গর্ভধারণের খারাপ পরিণতি
শারীরিক বুদ্ধির ক্ষতি/হ্রাস
কৈশোরকালীন অপুষ্টি প্রতিরোধে করণীয়

সুষম খাবার খাওয়া
শর্করা জাতীয় খাবার (ভাত, রুটি, মুড়ি, চিনি, গুড়, মধু, আলু, চিড়া ইত্যাদি) খাওয়া।
আমিষ জাতীয় খাবার (ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম, বীচি ইত্যাদি) খাওয়া।
আয়রন সমৃদ্ধ খাবার (মাংস,কলিজা এবং গাঢ় সবুজ শাক-সবজি ) খাওয়া।
ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার (কলিজা, পাকা পেঁপে, আম, গাজর, মিষ্টিকুমড়া, ছোট মাছ, ডিম,
সবুজ শাক-সবজি ও হলুদ রঙের ফল-মূল) খাওয়া।
প্রতিদিন ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাওয়া।
আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবার (সামুদ্রিক মাছ এবং সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার শাক-সবজি) এবং
আয়োডিন যুক্ত লবণ খেতে হবে।
প্রতিদিন ১০-১২ গ্লাস পানি খাওয়া, গরম কালে বেশি পানির প্রয়োজন হতে পারে।
ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়া।
প্রত্যেক কিশোর-কিশোরীকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ছয় মাস অন্তর কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানো।
খাবার খাওয়ার আগে ও পরে সাবান ও নিারাপদ পানি দিয়ে হাত ধোয়া।
স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করা এবং জুতা বা স্যান্ডেল পরে পায়খানায় যওয়া।
মাসিক ঋতুস্রাবের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। সবধরনের খাবার খাওয়া যায় এবং তাদেরকে মনে রাখতে হবে যে এ সময় সব ধরনের স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যায়।
দেরীতে বিয়ে ও দেরীতে গর্ভধারণ করা।
কিশোরীকে টিটেনাস টিকার ৫টি ডোজ সম্পূর্ণ করা।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

x