শিশুরাই নতুন পৃথিবী গড়বে

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ
36

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আধুনিক চিন্তাবিদরা বলেছেন একটি জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থাটাই হচ্ছে শিক্ষক। শিক্ষকতা পেশায় কেবল ওদের আসা উচিত যারা সমাজে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চান। কারণ এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মুহাম্মদ (স.), ছিলেন সক্রেটিস, রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দসহ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষগন। তারা এই বিষয়টিকে শ্রেষ্ঠ হিসাবে দেখেছেন বলেই কেবল নিজেরাই দেশ-জাতি ও সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের মত আজকাল এই পেশাকে ভালবেসে কেউ আসেন না, কেউ আসেন দেখে আর কেউ ঠেকে। যারা ভালবেসে এসেছেন তারা উন্নতি করছেনও বটে। কারণ এ পেশায় যা আছে অন্য পেশায় তা বিরল। এখনও আমাদের সমাজ শিক্ষকদের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে জানে।
এই পেশাকে কেবল পেশা হিসাবে বিবেচনা না করে শ্রেষ্ঠ সমাজ সেবা হিসাবে ও বিবেচনা করা উচিত। তাই যাদের মধ্যে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, পরোপকারে যাদের থাকবে মনোযোগ কেবল তাদেরই শিক্ষকতায় আসা উচিত। কারণ তাকে অনুসরন করবে শিক্ষার্থী, সমাজ ও দেশ। তিনি পরিবর্তন করবেন সমাজের প্রতিটি দিককে। তিনি ফুটে তুলবেন সমাজব্যবস্থাকে, তার কাছ থেকে জাতি গ্রহণ করবে আগামীদিনের দিক-নির্দেশনা। সুতরাং শিক্ষকরাই হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সূতিকারগার। কিন্তু পরিতাপের সাথে লক্ষ্যনীয় যে আমাদের সমাজে শিক্ষকদের অবস্থার চিত্রটি ভিন্ন। সৌন্দর্যের বাসনাকে সুশৃঙ্খলিত এবং সজাগ করে জাতি গঠনে শিক্ষার্থীকে এগিয়ে এনে বিশ্ব জয়ের বাসনায় যিনি নিতে পারবেন তিনিই হবেন শিক্ষক। মানবিক মূল্যবোধে উৎসাহিত হয়ে দেশ গঠনে, পরিপূর্ণ মানবিক বিকাশ সাধনে, একটি উন্নত শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারে শিক্ষক। আর দেশের প্রতিটি শিক্ষক এই মহান কাজটি করতে এগিয়ে আসুক এই দাবি আমি সকলের সাথে করতে চাই। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের কিছু বিষয় দেখা যা নিম্নরূপ হতে পারে-
ক. বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণ
খ. শূণ্যপদ সমূহ পূরণের ব্যবস্থা করা
গ. বেতন বৈষম্য দূর করা
ঘ. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনা
ঙ. শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলা
চ. শিক্ষক সমাজকে দলীয় প্রভাব মুক্ত রাখা।
সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষার আধুনিকায়ন করতে হবে। তাহলেই কেবল শিক্ষক আনন্দের সাথে শিখাতে পারবেন। সমাজ রাষ্ট্রকে তুলে ধরতে পারবেন বিশ্বের মাঝে।
ইংরেজ পূর্বকাল : ইংরেজ আসার আগেরকার শিক্ষার দর্শন কি ছিল এবং কিভাবে এটি চলত তার কোন বিশদ বর্ণনা শিক্ষার কোন অংশে পাওয়া যায় না। বরং কোন বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়েরও ইতিহাস জানা নেই। মোঘল স্থাপত্যের যে ঐতিহ্যকে নিয়ে আমরা গর্ব করি তার রেশ কেবল অর্ধসমাপ্ত লালবাগ কেল্লায় এক ভাঙ্গা দেয়ালকে নিয়ে-একটি তোরণ দ্বারকে ঘিরে। তবে ইতিহাস থাকে যে, সেই সময় মসজিদ ও মক্তব কেন্দ্রিক কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। তবে এখানে কি পড়াত, কারা পড়াত, এর স্তর কি ছিল কিছুই জানা ছিল না।
অষ্টাদশ শতকে একটি জলাবদ্ধ-স্থবির ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সমাজকে সুন্দদর করার শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়-হিন্দু পন্ডিত চালিত টোল-পাঠশালা শিক্ষার মধ্য দিয়ে। এখানে বলাবাহুল্য যে মুসলিম চালিত কিছু মক্তবও তখন গড়ে উঠে। এই দুই জাতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল চিন্তা ছিল-মোল্লা ও পুরোহিত সুষ্টি করাই ছিল উদ্দেশ্য। এই দেশে শিক্ষা সর্ম্পকে প্রথম চিন্তা আসে ১৮২৩ সালে শিক্ষণ কমিটির কাজের মাধ্যমে।
আধুনিক শিক্ষার সূচনা : হিন্দু সচেতন সমাজের উদ্যোগে ১৮১৫ সালে শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আধুনিক শিক্ষার সূচনা বলে ইতিহাস গবেষক ও শিক্ষাবিদদের ধারণা। আধুনিক শিক্ষা চালুর জন্য ১৯শতকের দিকে আন্দোলন গড়ে তুলেন বিদ্যাসাগর। বদ্ধ জলাশয় থেকে সমাজকে সুন্দর চরমান স্রোতস্বিনীর দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজটি তিনি প্রথম করেন। এভাবে একের পর এক আন্দোলন ও সংগ্রামে ফসল হিসাবে আজকের শিক্ষা। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষার কাজ শুরু হয়।
শিক্ষানীতির কয়েকটি দিক নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই-
ক. প্রাথমিক শিক্ষাকে ৫ ক্লাসের পরিবর্তে ৮ ক্লাস : এই দুরহ কাজটি বাস্তবায়ন অনেকটা জটিল। কারণ এর সাথে অবকাঠামোর বিষয়, শিক্ষক, বিনাবেতনে পড়ানো, বই ইত্যাদি জড়িত। তবে বাস্তবায়ন করা গেলে নিঃসন্দেহে এ থেকে শিক্ষা সমপ্রসারণের কাজটি সঙ্গত কারণে এগুবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খুব বেশি যত্নবান ও সর্তক না হলে এই ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থেকে যাবে অনেকাংশে। স্বাক্ষরতার হার বাড়ানোর যে উদ্যোগ তা এইক্ষেত্রে বাধাও সৃষ্টি করতে পারে বলে আমি মনে করছি।
খ. তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষা প্রসঙ্গে : বিজ্ঞান আজ আমাদের অনেক দুর নিয়ে এসেছে। আমরা বিজ্ঞানের কল্যাণে এগিয়েছি। কিন্তু দেশের ৪৫ বছর বয়সে যেখানে থাকার কথা তা পারিনি। বর্তমান শিক্ষানীতিতে এর উপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা প্রজন্মকে বিজ্ঞান তথা প্রযুক্তি নির্ভর হতে সহায়তা করবে।
গ. কারিগরি শিক্ষা : আমাদের বর্তমান শিক্ষায় সাটিফিকেট সর্বস্ব-ডিগ্রিধারী ভাঙ্গা স্কুলের সহ-শিক্ষক বানানো ছাড়া একজন শিক্ষিত মানুষের হাতকে কর্মের হাতে জনগোষ্ঠী রূপান্তরে ভূমিকা রাখছে না। কিন্তু প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে এবং জনগোষ্টিকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্র প্রসারের কথাও বলা হয়েছে। বিবিএ এমবিএ নেয়ার একটি সুন্দও প্রতিযোগিতা তৈরী হয়ে গেছে। মধ্যবিত্তঘরের সন্তানরা এই শিক্ষার ভারে ইতিমধ্যে দিক হারা-কুল হারাদের দলে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে।
প্রচলিত শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে আমার কাছে কয়েকটি বিষয়ে এখনও পরিস্কার ধারনা দেয়া হয়নি বলে মনে হয়েছে। যেমন, কোন স্তর থেকে ইংরেজি বাধ্যতামূলক শিক্ষা হিসাবে পড়তে হবে। প্রথম শ্রেণি থেকে ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক দেখানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেখে যদি মনে করা হয়ে ৬৮ হাজার গ্রামের চিত্রও ইংরেজি পড়ার সুযোগ-সুবিধা সমান, তাহলে সরকারকে সেই অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখে দেখে ইংরেজি উচ্চারণ করে পড়ানোর মত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সেই বিষয়টি সরকার তথা কমিশনকে মাথায় রাখতে হবে।
‘বাংলাদেশ স্টাডিস’ নামে একটি বিষয়ের অবতারনা করা হয়েছে। বর্তমান সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের সাথে যদি এটি সঙ্গতিপূর্ণ হয় দোষ নাই। কিন্তু এর ব্যতিক্রম হলে এটি কেমন হবে, কারা পড়াবে তার বিষয়ে চিন্তার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে গেছে এক্ষং এই বিষয়টি অভশ্যই ভাবনায় আনতে হবে।
মাধ্যমিক স্তরে যেখানে এখন ১৪ শত মার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে তাও বিশদভাবে ভাবতে হবে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের এতবেশি মার্কের পরীক্ষা ও পড়াশোনা আদৌ সম্ভব কিনা তাও বিবেচনায় আনতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূল ধারার শিক্ষার সাথে এনে বৈষম্য দূর করার যে চেষ্টা তা যেন ঈমান আকিদার বিষয়ে হস্তক্ষেপ না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে এটি করতে পারলে অবশ্যই দেশের জন্য মঙ্গল। মাদ্রাসায় শিক্ষায় শিক্ষিতদের অবশ্যই বৈষম্যের হাত থেকে বের করে আনতে হবে।

লেখক : ফাউন্ডার প্রিন্সিপাল
রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এণ্ড কলেজ

x