শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাদেরকেই ভাবতে হবে

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
42

আমরা ছোটবেলা থেকে কী শিখেছি? বাবা-মা কী শেখাচ্ছেন? সেটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার স্কুলের শিক্ষকরাও কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা কী শিখাচ্ছেন? যারা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে, তারা কিন্তু বিপথে যায় না। যারা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে না, তাদের অনেকেই বিপথে চলে যাচ্ছে বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। তাছাড়া প্রযুক্তিরও একটা বড় প্রভাব রয়েছে। একটা ছোট বাচ্চা ঘরের মধ্যে মোবাইল নিয়ে কী করছে আমরা কিন্তু খোঁজ রাখছি না। এগুলোর খোঁজ রাখা দরকার।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে ‘হ্যাশট্যাগ মি-টু’ আন্দোলনের সূত্রপাত, তা ইদানিং ভারতেও আলোড়ন তুলেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এম জে আকবর থেকে বলিউড তারকা নানা পাটেকর এই ‘মি-টু’ সূত্রেই খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন তনুশ্রী দত্তের মতো অভিনেত্রী থেকে মহিলা সাংবাদিকও। কিন্তু, এটা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। সমস্যা আদতে আরও বড় এবং তার অধিকাংশটাই প্রকাশ্যে আসে না। বাংলাদেশে এই ‘মি-টু’ ম্যুভমেন্টে এখনও কেউ নাম লিখাননি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেককেই দেখছি- এ বিষয়ে সোচ্চার হতে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের দেশে যৌন হেনস্থা দিনদিন বেড়েই চলছে। নানাসময়ে সেটি ছোট-খাট গবেষণায় উঠেও এসেছে। যদি বলি- আমাদের এই সমাজের বাসায় কিংবা অফিসে, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে গণপরিবহনে তথা বাসে-ট্রেনে-ট্যাক্সিতে প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে- তবে কি ভুল বলা হবে? পাশে বসার অছিলায় আপত্তিকর স্পর্শের অভিজ্ঞতা তো মেয়েদের হামেশাই হচ্ছে। আমি বলবো- এই বিকৃত মানসিকতার শিকার কিন্তু হচ্ছে আমাদের শিশুরাও। সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি কি?
বলাই বাহুল্য যে- আমাদের দেশে শিশুদের নিয়ে অনেকভাবে কাজ হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর চিত্রটা হতাশাজনক। শিশুদের নিপীড়িত হওয়ার ঘটনা কিন্তু দিন দিন বাড়ছেই। পত্র-পত্রিকা খুললেই এর সামান্য রেশ হয়তো পাওয়া যায় বৈকি। কিন্তু, বাস্তবতা যে কতোটা ভয়াবহ- সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আসলে আমাদের শিশুদের নিয়ে যে গবেষণা, সেখানে আমরা দেখি যে, নিপীড়নের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।
গত দু’বছরের একটা পরিসংখ্যানে আমি বলতে পারি। শিশু অধিকার ফোরামের যে রিপোর্ট আছে, সেখানে বলা হয়েছে, তিন মাসের মধ্যে ১৭৬ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে এবং তার মধ্যে ১১০ জন মারা গেছে, যা খুবই দুঃখজনক। কথা হচ্ছে- আমাদের শিশুদের আমরা সব সময় নিরাপদে রাখতে পারছি না। এটা খুবই দুঃখজনক যে, কখনো বাড়িতেও নিপীড়িত হচ্ছে, কখনো পথে হচ্ছে। আমরা যদি রাস্তার বাচ্চাদের দেখি, আমাদের মনে হয় যে, ওদের বেশি নির্যাতিত হওয়ার কথা। কিন্তু যারা বাড়িতে থাকে খুবই কাছের স্বজনের মাধ্যমেও তারা নিপীড়িত হচ্ছে। আমরা এমনও দেখি যে, বাবা-মা খুব যত্ন করে শিশুটিকে লালন-পালন করছেন। তাঁরা যখন অফিসে যাচ্ছেন, তখন বাসায় তাকে যে পরিচর্যা করছেন তার দ্বারাও শিশুটি নিপীড়িত হচ্ছে। আসলে সবাইকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।
আমি মনে করি, এটা একটা মানসিক অসুস্থতা। এটা আসলে অনেকের মধ্যে কিশোরকালেও পাওয়া যায়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে একটু বড় হয়েও দেখা যায়। আবার মধ্যবয়সিদের মধ্যেও দেখা যায়। এখানে আসলে বয়স কোনো বিষয় না। এটা মূল্যবোধের একটা ব্যাপার। আমরা ছোটবেলা থেকে কী শিখেছি? বাবা-মা কী শেখাচ্ছেন? সেটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার স্কুলের শিক্ষকরাও কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা কী শিখাচ্ছেন? যারা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে, তারা কিন্তু বিপথে যায় না। যারা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে না, তাদের অনেকেই বিপথে চলে যাচ্ছে বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। তাছাড়া প্রযুক্তিরও একটা বড় প্রভাব রয়েছে। একটা ছোট বাচ্চা ঘরের মধ্যে মোবাইল নিয়ে কী করছে আমরা কিন্তু খোঁজ রাখছি না। এগুলোর খোঁজ রাখা দরকার। আবার অনেক বাসাতেই শুনি- বাচ্চারা সারা রাত জেগে থাকে এবং সকালে স্কুলে যেতে তাদের দেরি হয়ে যায়। স্কুলের ক্লাসে তারা মনোযোগ দিতে পারছে না। তাদের দৈনন্দিন কাজ-কর্মেও ব্যাঘাত ঘটছে। শিশুর বাবা-মাকে এ বিষয়টি দেখতে হবে। বিশেষ করে- বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কিন্তু- ইন্টারনেট একটা রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এবং এই রোগে পড়ে বাচ্চারা তাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রম করতে পারছে না। পরিণতিতে, তাদের মনে একধরনের আসক্তির জন্ম নিচ্ছে।
কিন্তু, এর সমাধান কী? আমি বলব আমাদের সর্বজনীনভাবে অনেক কিছু করার আছে। এটা আমাদের ঘর থেকে শুরু করতে হবে। শিক্ষকদের সচেতন হতে হবে। যাঁরা শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। শিশুদের সচেতনতামূলক অনেক প্রোগ্রামের আয়োজন করতে হবে। এখানে মিডিয়াকেও একটা ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের শিশুদের তাদের শরীর সম্পর্কে জানাতে হবে। সে যদি এটি সম্পর্কে না জানে, তখন সে বুঝবে না যে, তার কোন অঙ্গগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায়ই ওদের শিখাতে হবে- কোনটা ‘গুড টাচ’ আর কোনটা ‘ব্যাড টাচ’। সেই জিনিসগুলো তাদের ভালো করে বোঝাতে হবে। এখন কিন্তু নয় বছরের একটা শিশুও এগুলো খুব ভালোভাবে নিতে পারে। এই শিশুকে বাবা-মা, স্কুল শিক্ষক সবাই মিলে এভাবে তৈরি করতে হবে। শুধু পাঠ্যপুস্তক না, মূল্যবোধের জন্য তাদের এই জিনিসগুলো শেখানো খুব প্রয়োজন। আসলে শিক্ষার কারিকুলামের মধ্যে এই জিনিসগুলো থাকা দরকার। এখন অনেক কিছু আছে। তবে আরো কিছু বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি এর চর্চাটাও বাড়ানো দরকার।
আমি যদি মানবাধিকারের দিক থেকে বলি, তবে একজন মানুষের যে অধিকার, তার যে কথা বলার অধিকার, তার চর্চা শেখানো থেকে আমরা অনেক দূরে আছি। আমাদের যে শিশুটি নির্যাতিত হচ্ছে, তার পরিবার কী কথা বলছে? প্রতিকারের জন্য তিনি কিছু বলছেনই না। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, এটা আমার একার লজ্জা না। আমি যে ভুক্তভোগী হয়েছি, সেটার প্রতিবাদ করতে হবে। শুধু আমার জন্য নয়, সমাজের সবার জন্য। আমি সচেতন হলে আরেকটি পরিবারকে এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে হবে না। এখন আর আমরা চুপ করে থাকব না। আমদের চুপ করে থাকা উচিত না। উচিত হবে না। কিছুদিন আগে আমি একটা পোস্ট দেখলাম সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। স্কুলপোশাক পরা একটি মেয়েকে পাশের লোক গায়ে হাত দিচ্ছে। পরে মেয়েটা যখন প্রতিবাদ করল তখন বাসের অন্যান্য লোকজন ওই ছেলেটিকে বাস থেকে নামিয়ে দিল। এত মানুষের মধ্যে যখন একটা মেয়ের সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন কিন্তু বুঝতে হবে যে, সবাইকে এর প্রতিবাদ করতে হবে। আমরা সবাই মিলে যদি সাহস নিয়ে, মনের জোর বাড়িয়ে প্রতিবাদ করি, তাহলে কিন্তু এই ধরনের প্রবণতা অনেক কমে যাবে। আমরা যদি কর্মজীবী হই, তাহলে খেয়াল রাখতে হবে, বাড়িতে যে তার দেখাশোনা করছে, সে ঠিকমতো করছে কিনা। বাসায় সে কী করছে প্রতিক্ষণ সেটাও মনিটরিং করতে হবে। কোন পরিবেশে আপনি শিশুটিকে রেখে যাচ্ছেন, তার খোঁজ-খবর নিতে হবে। শিশুটি স্কুল থেকে ফেরার পরে হঠাৎ কেন মনমরা হয়ে গেল, তার মধ্যে পরিবর্তন আসছে কিনা, সেই জিনিসটা জানার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের একটা বড় ভূমিকা রাখতে হবে। শিশুর শিক্ষকদেরও খেয়াল রাখতে হবে যে, শিশুটি কেন পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছে না। কেন মন-মরা থাকছে। এগুলো কিন্তু শিক্ষকদের নজরেই আগে আসবে। শিক্ষকরা যদি কোনো শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখেন, তখন কিন্তু অভিভাবকদের শিশুটির এই পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
একটা আশার কথা হলো, পরিস্থিতি অনেক বদলাচ্ছে। স্কুলের অনেক শিক্ষকই এই ধরনের শিশুদের নিয়ে তাদের পরিবারের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলছেন। গণমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে অনেক টক শো করতে পারে, যেখানে অংশ নেবে শিশুরা। তাদের কথা বলবে, তারা কথা বলতে শিখবে, হয়তো এভাবেই একদিন তারা প্রতিবাদ করতে শিখবে। এভাবেই শিশুদের তৈরি করতে হবে। অপর একটি গবেষণার কথা এখানে বলা যায়- এদেশে প্রতি চারজন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আর প্রতি ছয়জন ছেলে শিশুর মধ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার হয় একজন। শুধু পুরুষ নয়, শিশুরা কখনো কখনো নারীর হাতেও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দরকার।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩-এ ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডের বিধান আছে। তবে এটাকে মৃত্যুদণ্ড করার দাবি আছে বিভিন্ন মহল থেকে। আর অন্যান্য যৌন নিপীড়নের অপরাধেরও সর্বোচ্চ সাত বছর থেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের বিধান আছে। আর আইনে যৌন নিপীড়ন ও যৌন হয়রানি কোন কাজকে বলা হবে, তা-ও সুনির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। এই বিষয়গুলো সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একদিন আমরা শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যত তৈরি করতে পারবো।

x