শিশুদের জন্য আলাদা বাজেট প্রণয়নের তাগিদ

লায়ন্স ক্লাবের সেমিনারে শামসুজ্জামান খান

আজাদী প্রতিবেদন 

বৃহস্পতিবার , ১৫ মার্চ, ২০১৮ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ
89

আজকের শিশু, পৃথিবীর আলোতে এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই। আজকের শিশু মায়ের হাসিতে হেসেছে। আমরা চিরদিন সেই হাসি দেখতে চাই।’

লায়ন্স ক্লাব অব ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫বি৪ এর গভর্নর লায়ন মনজুর আলম মনজুর বিশ্বাস এটি। অনেকেই ভাবেন এ আর এমন কী? আমরা সবাইতো শিশুদের ভালোবাসি। কিন্তু গতকাল ‘শিশুদের জন্য আমরা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন পারদর্শী আবদুল্লাহ আল মামুন সমাজের হতদরিদ্র, দুস্থ, নিরন্ন শিশুদের মুখে হাসি ফুটানোর কথা বলেছেন তাঁর প্রবন্ধে। লায়ন এম মনজুর আলম মনজু জেলা গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে এই আহবানই জানিয়েছিলেন এবং তাঁর সে চেষ্টা সার্থক করে চলেছেন প্রতিটি লায়ন্স। শুধু তাই নয়, গতকাল তারা পুনরায় সংকল্পবদ্ধ হলেন, লায়ন্স গভর্নরের সেই আপ্তবাক্যটি সত্যি করার চেষ্টা তারা করে যাবেন আমৃত্যু।

আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠন লায়ন্স ক্লাব অব ইন্টারন্যাশনাল, চট্টগ্রাম জেলা আয়োজিত ‘শিশুদের জন্য আমরা’ শীর্ষক সেমিনার গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। লায়ন এম মনজুর আলম মনজুর সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, লোক গবেষক শামসুজ্জামান খান। সেমিনারের মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন শি াবিদ অধ্য ড. আনোয়ারা আলম এবং শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ লায়ন ডা. বাসনা মুহুরী।

বক্তব্য রাখেন সদ্য প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন শাহ আলম বাবুল, প্রথম ভাইস জেলা গভর্নর লায়ন নাসিরউদ্দিন চৌধুরী ও দ্বিতীয় ভাইস জেলা গভর্নর লায়ন কামরশুন মালেক ও প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন এম এ মালেক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সেমিনার আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান লায়ন মো. শাহেদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে নারী জাগরণে অবদানের জন্য মহিয়সী লায়ন আসেদা জালালকে সম্মাননা জানানো হয়।

উপস্থিত ছিলেন, প্রাক্তন জেলা গভর্নর লায়ন সফিউর রহমান, লায়ন আলহাজ রফিক আহমেদ, লায়ন প্রফেসর এমডিএম কামালউদ্দিন চৌধুরী, লায়ন সিরাজুল হক আনসারী, নুরশুল ইসলাম, লায়ন এম শামসুদ্দিন, লায়ন মো. মোস্তাক হোসাইন, কেবিনেট সেক্রেটারি লায়ন জাফরউলহ্মাহ চৌধুরী, কেবিনেট ট্রেজারার লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, অনুষ্ঠান কমিটির সেক্রেটারি লায়ন মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

প্রধান অতিথি ড. শামসুজ্জামান খান শিশু অধিকার বিষয়ে সেমিনার আয়োজনের সার্থকতা তুলে ধরে বলেন, গত ফেব্রশুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে আমরা শিশু অধিকার নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান করেছিলাম। সে অনুষ্ঠানে শিশুদের অধিকার বিষয়ে এত গভীরভাবে আলোকপাত করা হয় নি, যা আজকে করা হলো। বলা চলে গত ৫/৬ বছরে বাংলাদেশে শিশু অধিকার বিষয়ে এতটা বিশদ আলোচনা হয় নি। শিশু অধিকার বিষয়টা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় সরকার যদি শিশুদের জন্য একটি আলাদা বাজেট প্রণয়ন করে। আমরা আজ সরকারের প্রতি সে দাবি করতে পারি। তিনি শিশুদের মানসিক বিকাশে বর্তমান সময়ে শিশু সংগঠনের অভাব অনুভব করে বলেন, শিশুর সাংস্কৃতিক, মনস্ত্বাত্তিক বিকাশে শিশুতোষ সংগঠনগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। এখন সে ধরনের সংগঠন নেই। এর বড়ো একটি কারণ হলো এখন স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ ধরনের সংগঠন পরিচালনা করার মতো লোকের অভাব খুব। একটা সময় সুফিয়া কামাল, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, রোকনুজ্জামান খান, কামরশুল আহসানের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ শিশুদের নিয়ে শিশুদের মানসিকতা বিকাশের তাগিদে সংগঠন করতেন। তাদের ছোঁয়া পেয়ে আমরা বিকশিত হয়েছিলাম। এখন সে সুযোগ কেউ করে দিচ্ছে না শিশুদের। শিশুরা টেলিভিশনের দিকে ঝুঁকছে, সিরিয়ালের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছে। প্রায় একই কাহিনী প্রতিটি সিরিয়ালে। পরিবার ভেঙে কীভাবে টুকরো টুকরো হয়ে যায় তাই শিখছে বর্তমান প্রজন্ম। এ থেকে উত্তরণের পথ খূঁজে বের করতে হবে। সম্ভাবনাময় প্রজন্ম অংকুরে ঝরে পড়লে তার দায় আমাদেরকেই বহন করতে হবে।

প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে আবদুলহ্মাহ আল মামুন বলেন, আমরা যারা নিজেদের শি িত, সচেতন বলে দাবি করি, তারা শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় কতোটা সচেতন, তা ভাবতে হবে। যেমন গ্রাম থেকে বাসায় দূর সম্পর্কের আত্মীয় বা পরিচিত কোন শিশুকে আনার সময় আমরা বলি, আমার বাচ্চার সাথে খেলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই খেলা শুরশু হয় শিশুটির ভোর ছয়টায় রশুটি বানানোর মধ্য দিয়ে। আর তার খেলা শেষ হয়, রাত বারোটায় মশারি টাঙানোর মাধ্যমে। এরপর খুঁজতে হয় সে কোথায় ঘুমাবে। আবার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করতে গিয়ে আমরা একজন আরেকজনকে বলি, পাঁচটা বাচ্চা পাঠান। কেন সেটা পাঁচটা হবে, পাঁচজন নয় কেন? এই যে গোড়ায় গলদ এর থেকে বের হতে না পারলে শিশু অধিকার র া মুখরোচক হ্মোগান হয়েই থাকবে, কাজের কাজ হবে না কিছুই। পরিসংখ্যান বলে, নিগ্রহের শিকার সবচেয়ে বেশি হয় শিশু তার আত্মীয়স্বজন থেকেই। এ কথা সে জানাতেও পারে না। তাই বলছি শিশুকে শুনুন, বুঝার চেষ্টা করশুন। লায়নিজম এ েতে্র নানা পদ েপ গ্রহণ করতে পারে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শি া উপবৃত্তি চালু করতে পারে। পথশিশুদের শি া ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু করা, শিশুশ্রম বন্ধে সামাজিক সচেতনতা মূলক কার্যক্রম চালু করা, শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, চিলড্রেন ফার্স্ট। এর অর্থ হিসেবে আমরা বলি সবার আগে শিশু। শিশুকে আমরা সবার সাথে তুলনা করছি। না, শিশুই সবার আগে; আজ থেকে এ চর্চাটাই শুরশু করি।

প্রবন্ধের উপর আলোচনা করতে গিয়ে অধ্য ড. আনোয়ারা আলম বলেন, এই নগরীর শৈশব নষ্ট হওয়া শৈশব। শিশুর বিকাশের পথটা আমরাই রশুদ্ধ করে দিয়েছি। আমরা অভিভাবকরা শিশুদের দৌঁড় প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়েছি। ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, সেখানি থেকে কোচিং, কোচিং থেকে ফিরে আবার প্রাইভেট টিউটর ইত্যাদি। এভাবে বেড়ে উঠতে উঠতে সে নিজেই যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। আমরা যারা নিজেদের সচেতন বলে দাবি করি, তারা কতোটা সচেতন? নিরানন্দের শৈশব শিশুকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। আসুন আজ থেকে শিশুদের জন্য আমরা গড়ে তুলি আলোকিত শৈশব, যার মধ্য দিয়ে আলোকিত হবে সমাজ।

ডা. বাসনা মুহুরী বলেন, আমাদের দেশে যথেষ্ট আইন আছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। আমার ঘরে প্রতিবন্ধী সন্তান আছে, এটা বাইরে জানাতে লজ্জা পাই। কেন এটা হবে? সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ার দায় তো আমার নয়, তার বাবারও নয়। তার নিজেরও নয়। এমনও দেখা গেছে আপনার ছেলে মেয়ে ক’জন এর উত্তরে অনেকে প্রতিবন্ধী সন্তানটিকে বাদ দিয়ে তারপর বলে। আমাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব আছে। এ বিষয়ে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কাজে লাগানো যেতে পারে। মসজিদ, মন্দিরে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা অনেকটাই জাগ্রত হবে।

প্রাক্তন জেলা গভর্নর ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক লায়ন এমএ মালেক বলেন, আমার হ্মোগান ছিল ওদের মুখে হাসি ফুটাও। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই অন্যের প্রতি সেবার মানসিকতা থাকতে হবে। মানুষের জন্য সহমর্মিতা পূর্ণতা দেয় মানবজীবনকে। আমরা লায়নসের পক্ষ থেকে দান দিই না, সহায়তা করি। দুস্থ মানবতার সেবা করি। মানুষের প্রয়োজনে, মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আমরা সবসময় কাজ করে যাবো। তিনি বলেন, আমি একদিন শিশু ছিলাম। আজ এ পর্যায়ে এসেছি। তাই বলছি শিশুরাই সবকিছু। ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সবশিশুদের অন্তরে। শিশুদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় লায়নের প ে কী করা যায় তা আমরা করতে চাই। তিনি বলেন, আজ বর্তমান প্রজন্মকে ধ্বংসের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে মাদক। মাদকের বিরশুদ্ধে আমরা অনেক কথা বলি। কিন্তু মাদক বহনকারীর মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে নিরব থাকে আমাদের এমপি মন্ত্রীরা। আমরা আইন করি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন প্রয়োগ করতে হবে। এই যে আমরা শিশু অধিকার, নারীর অধিকার, মানুষের অধিকারের কথা বলছি, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। অধিকার আদায়ে আমরা যার যার অবস্থান থেকে হৃদয়ের ছোঁয়া যদি দিতে পারি, তবে শিশুদের মুখে হাসি ফুটানো খুব সহজ হয়ে পড়বে।

সভাপতির বক্তব্যে লায়ন্স জেলা গভর্নর মনজুর আলম মনজু বলেন, আমরা ভালো কাজ করি। ভালো কাজের নিদর্শন এটি। কিছু কাজ যদি করে যেতে পারি, তবে দেশ উপকৃত হবে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই শিশুদের অধিকার আদায়ে কাজ করছি। আমি ডাক দিয়েছি ওয়ান ক্লাব, ওয়ান চাইল্ড। আমি বলেছি প্রতিটি ক্লাব যদি একটি করে শিশুর দায়িত্বও নেয়, ববে সেই শিশুটি একদিন মানুষ হয়ে লায়নিজমের পতাকা বহন করবে। আমাদের টার্গেট ছিল ১২০টি শিশুকে মানুষ করার। এখন পর্যন্ত ৮২জন শিশুর দায়িত্ব পালন করছি। আগামীতে আরো বৃহৎ পরিসরে এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে চাই আপনাদের সহযোগিতায়।

x