শিল্পে সঁপেছি শরীর

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ২৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
17


শিল্পী ভাবলেন, তাঁর সাথে দর্শকদের সম্পর্কের সীমারেখা কতদূর হতে পারে সেটা পরখ করে দেখা যাক। চিন্তা করে দেখলেন, প্রদর্শন চলাকালে শিল্পী যদি অপ্রতিরোধ বা অক্রিয়ের অবস্থানে থাকে তাহলে দর্শকদের পক্ষ হতে এই সম্পর্কের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে। সেই মোতাবেক প্রদর্শনী যেখানে হবে সেখানের একটা বড় টেবিলে ৭২ (বাহাত্তর) রকমের জিনিস ছড়িয়ে রাখবেন তিনি। সেই বাহাত্তর রকমের জিনিসগুলো দর্শকেরা তাদের পছন্দ-মাফিক শিল্পীর সঙ্গে বলা ভালো শিল্পীর শরীরে প্রয়োগ বা ব্যবহার বা স্থাপন করবে! আর সেই বস্তুগুলো কী? কিছু বস্তু এমন যা দ্বারা আঘাত করলে মানুষের শরীর ব্যথায় ভরে উঠবে, কিছু বস্তু এমন যা যৌন অনুভূতি জাগাবে, কিছু বস্তু এমন যা মানুষকে আরাম দেবে…অর্থাৎ মানুষের কামুক, রিরংসা, মহানুভবতা, প্রেম এমন সব ইচ্ছার সবরকমের বন্দোবস্তই করা থাকবে। এবারে আমরা জানবো সেই বস্তুগুলোর কয়েকটা নাম, উদাহরণ হিসেবে: ফুল, কাঁচি, মধু, অলিভ অয়েলের শিশি, মদের খালি বোতল, হাতুড়ি, গুলিভর্তি পিস্তল ইত্যাদি-ইত্যাদি। ঠিক হলো শিল্পী প্রদর্শনীর জায়গায় একটানা ছয় ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকবেন আর এই ছয় ঘন্টায় দর্শকরা ওই বস্তুগুলোর ব্যবহারে যা ইচ্ছে-তা করতে পারবেন এবং শিল্পী তখন অনুচ্চারে, অপ্রতিরোধী অবস্থায় থাকবেন। ১৯৭৪-এর জুলাই, প্রদর্শনীর স্থান লোকে লোকারণ্য। রীতিমতো লাইন লেগে গেছে দর্শকের, কার আগে কে যাবেন তা নিয়ে হুজ্জতির একশেষ, এমনকী পুলিশও মোতায়েন হলো! শিল্পী এসে দাঁড়ালেন টেবিলের পাশে, মারিনা আব্রামোভিচ! লোকে যাকে ভালবেসে ডাকে ‘গ্র্যান্ড মাদার অব পারফর্মিং আর্ট’। শুরু হলো পারফর্মিং আর্টের এক নতুন প্রকরণ। ছয় ঘন্টার এক অবিমিশ্র অভিজ্ঞতার যাপন। ছয় ঘন্টার জন্য নিজের শরীরকে ছেড়ে দিলেন দর্শকের জিম্মায়। ফলাফল, পাঠক যেমন ভাবছেন, অবশ্যই ‘ভয়াবহ’। প্রদর্শনী চলাকালেই বিবস্ত্র হতে হয় মারিনাকে, ঘাড়ে ক্ষুরের পোঁচ হতে দরদর করে রক্ত ঝরেছে। আব্রামোভিচের জবানীতেই শুনি, ‘এই প্রদর্শনী থেকে আমার শিক্ষা একটাই, তুমি যদি মানুষের হাতে নিজেকে ছেড়ে দাও তাহলে নির্ঘাৎ তোমার মরণ ঘটবে। তখন সত্যিই আমার এই অনুভূতি হচ্ছিল। প্রথমদিকে প্রদর্শনীতে আসা লোকজন একটু দোনামোনা করছিল, ঠিক বুঝতে পারছিল না কোন পথে এগুবে। কিন্তু সময় যত এগুতে লাগলো মানুষের ভেতরকার শ্বাপদগুলো যেন একে একে বেরিয়ে পড়তে লাগলো। আমাকে কামড়ে দিলো, পেটের চামড়া কুঁচকে তাতে গোলাপের কাঁটাওয়ালা ডাল গুঁজে দিলো, স্তনবৃন্ত দুটোতে পাথর ঝুলিয়ে দিলো, কে একজন মাথায় পিস্তল তাক করলো, পরমুহূর্তে আরেকজন এসে তা সরিয়েও নিল…একটা জান্তব পরিবেশ হয়ে রইল ছয় ঘন্টা। সময় শেষ হলে পরে, আমি সমবেত দর্শকদের মধ্য দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গেলাম খানিকটা। তাদের চোখে চোখ রেখে, দেখলাম সবারই অধোবদন। কেউ কেউ কুঁকড়ে সরে গেলো ভিড়ের মধ্যে, ফুঁপিয়ে কান্নারও শব্দ পেলাম, লজ্জা আর অনুশোচনার ছায়াও দেখতে পেলাম অনেকের দৃষ্টিতে।’
রিদম জিরো শীর্ষক এই পারফর্মেন্স আর্ট মারিনার ধারাবাহিক কাজ রিদম-এর অংশ। রিদম টেন শিরোনামে তিনি ১৯৭৩ সালে প্রথম প্রদর্শনীটি করেন। ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে এই সিরিজের মোট পাঁচটি প্রদর্শন উপহার দেন তিনি। এই সিরিজের প্রত্যেকটি কাজের সঙ্গেই স্বীয় শরীরটি বড় নিয়ামক হিসেবে যুক্ত ছিল। তিনি বুঝতে এবং বোঝাতে চেয়েছেন মানুষের আদিম ইচ্ছা কী, আসলেই আদিম নাকি মানুষের এমন ইচ্ছা চিরায়ত। তাছাড়া জনমানুষের মধ্যে অবদমনের যে প্রভাব বা অবদমিত মানস সময়ে কতটা আগ্রাসী বহিঃপ্রকাশ ঘটায় সেসবের তালাশ। যা-ই হোক, মারিনা আর্ট কেবল এই একটিই তো নয়! তাঁর ক্লিনিং দ্য মিরর (১৯৯৫), স্পিরিট কুকিং (১৯৯৬), সেভেন ইজি পিসেস (২০০৫), দ্য আর্টিস্ট এট প্রেজেন্ট (২০১০) প্রত্যেকটিই অনবদ্য। আশা করছি সবগুলো প্রদর্শনী নিয়েই একে একে যৎসামান্য কিছু লিখে রাখবো খোলা হাওয়া-র জন্য। তবে শেষ করবার আগে মারিনা আব্রামোভিচ সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রাসঙ্গিক হিসেবে রেখে যাই।
যুগোশ্লাভিয়ার বেলগ্রেড শহরে ১৯৪৬-এর নভেম্বরে তাঁর জন্ম। মা ডনিকা রোজিক, বাবা ভজিন আব্রামোভিচ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেওয়ায় যারা ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। যদিও বৈবাহিক জীবনে উভয়েরই অশান্তির কথা আমরা জানতে পাই মারিনা’র বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। হাই স্কুল শেষে মারিনা ভর্তি হন বেলগ্রেডের একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ, পরে ক্রোয়েশিয়ার একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ। পেশাজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। কাজ করেন প্যারিসের একাদেমি দে বিউজ-আর্টস এবং বার্লিন ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টস-এর মতো প্রতিষ্ঠানে। পেয়েছেন অসংখ্য পদক আর সম্মাননা। উল্লেখযোগ্যগুলো হলো ১৯৯৭ সালের ভেনিস বিয়েনালে গোল্ডেন লায়ন, ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ডান্স এন্ড পারফর্মেন্স এওয়ার্ড, সম্মানসূচক ডক্টরেট অব আর্টস পেয়েছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব প্লে মাউথ, যুক্তরাজ্য’ এবং ‘ইন্সটিটিউতো দে সুপিরিয়া দে আর্ট’ ইত্যাদি।

x