শিল্পে সঁপেছি শরীর

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ৫ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ
48

শেষ পর্ব
[কয়েক সংখ্যা আগে, মারিনা আব্রামোভিচের প্রদর্শনী বিষয়ক একই শিরোনামের একটি লেখায় বলেছিলাম, তাঁকে নিয়ে আবারও কিছু কথা জড়ো করে খোলা হাওয়ার পাতায় তুলে রাখব। ইতমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব ছাপা হয়ে গেছে, আজ রইল শেষ পর্বটি। যারা আজই মারিনাকে পড়ছেন, তাদের জন্য একটি ছোট্ট পরিচিতি এখানে সংযুক্ত করছি। বিশ্ব বিখ্যাত পারফর্মিং আর্টিস্ট মারিনা আব্রামোভিচের জন্ম যুগোশ্লাভিয়ার বেলগ্রেড শহরে ১৯৪৬ সালে। মা ডনিকা রোজিক, বাবা ভজিন আব্রামোভিচ। হাইস্কুল শেষে মারিনা ভর্তি হন বেলগ্রেডের একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ, পরে ক্রোয়েশিয়ার একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ। পেশাজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। কাজ করেন প্যারিসের আকাদেমি দে বিউজ-আর্টস এবং বার্লিন ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টস-এর মতো প্রতিষ্ঠানে। পেয়েছেন অসংখ্য পদক আর সম্মাননা। উল্লেখযোগ্যগুলো হলো ১৯৯৭ সালের ভেনিস বিয়েনালে গোল্ডেন লায়ন, ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ডান্স এন্ড পারফর্মেন্স এওয়ার্ড, সম্মানসূচক ডক্টরেট অব আর্টস পেয়েছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব প্লে মাউথ, যুক্তরাজ্য’ এবং ‘ইন্সটিটিউতো দে সুপিরিয়া দে আর্ট’ ইত্যাদি। পারফর্মিং আর্ট জগতের লোকেরা ভালবেসে তাকে ‘গ্র্যান্ড মাদার অব পারফর্মিং আর্ট’ নামে ডাকেন।]
ইতোপূর্বে মারিনা আব্রামোভিচের বেশকিছু পারফর্মিং আর্টের কথা অল্প পরিসরে বলতে চেষ্টা করেছি। আমরা জেনেছি তার রিদম সিরিজ (সিরিজ ০, ২, ৪ এবং ৫), ক্লিনিং দ্য মিরর, দ্য স্পিরিট কুকিং-এর মতো প্রদর্শনীর কথা। শেষ পর্বে আরও কিছু জমাটি প্রদর্শনীর উল্লেখ করছি। সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ খানিক জানিয়ে রাখি। মারিনা’র এই শিল্পে উৎসর্গীকৃত জীবনে, তার একজন বন্ধুর কথা না বললেই নয়। বলা ভালো অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। বন্ধুটি হলেন জার্মানীর বিখ্যাত শিল্পী উয়ে লেজিয়েপে। যিনি ‘উলে’ নামে সমধিক পরিচিত। উলে’র সঙ্গে মারিনার পরিচয় ১৯৭৬ সালে, আমস্টারডামে। এবং শুরু থেকেই দুজন দুজনের কাজ দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করেন। সেসময় উভয়েই তাদের কাজ প্রকাশে যে বিবেচ্য বিষয়টি ঠিক করেন তা হলো মানুষের অহংবোধ বা আত্মমর্যাদা এবং শৈল্পিক পরিচয়। শিল্পে সহ-উদ্যোগ বা কোলাবোরেটিভ কাজের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠেন এই জুটি। প্রায় একযুগ (১৯৭৬-১৯৮৮) জুড়ে এই জুটি বেশকিছু পারফমির্ং আর্ট-এর প্রদর্শনী উপহার দেন। আর এই কাজগুলো করতে গিয়ে উভয়েই উভয়ের শারীরিক সীমবদ্ধতা, নারী এবং পুরুষের মুখ্য বৈশিষ্ট্য, আধ্যাত্মিক শক্তি, সীমাতিক্রমি ধ্যান এবং অগৌণ যোগাযোগ ধরনের কিছু বৈশিষ্ট্যকে উপজীব্য করেন। এই জুটির বিখ্যাত কিছু প্রদর্শনী হচ্ছে রিলেশন ইন স্পেস, রিলেশন ইন মুভমেন্ট, রিলেশন ইন টাইম, ব্রিদিং ইন/ ব্রিদিং আউট, ইমপন্‌ডেরাবিলিয়া, ট্রিপল এ – ট্রিপল এ ইত্যাদি। আব্রামোভিচ-উলে জুটির সর্বশেষ কাজটি নানা মাত্রায় ভাস্বর।

প্রত্যেকটি সম্পর্কেরই এক ধরনের পরিণতি থাকে, হতে পারে সেই পরিণতির পর থেকে সম্পর্কটি অন্যমাত্রায় বিরাজ করে কিংবা একেবারেই অন্তরালে অবস্থান করে। মারিনা-উলে জুটির সম্পর্কও ধীরে ধীরে জাগতিক সমাপ্তির দিকে এগুচ্ছিল। ১৯৮৮ সালে এই জুটি মনস্থ করলেন জাগতিক সম্পর্ককে বিদায় জানিয়ে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক চর্চায় মনোনিবেশ করবেন। আর সেই জাগতিক সম্পর্ককে কোন পদ্ধতিতে বিদায় জানাবেন? ঠিক হলো, সপ্তমাশ্চর্যের এক আশ্চর্য চীনের মহাপ্রাচীর বা গ্রেট ওয়াল এর দুইপ্রান্ত থেকে দুজন হাঁটা শুরু করবেন। উলে শুরু করবেন গোবি মরুভূমি প্রান্ত হতে, আব্রামোভিচ ইয়েলো সী প্রান্ত হতে। উভয়েরই দেখা হবে মহাপ্রাচীরের ঠিক মাঝখানে, আর দুই প্রান্ত থেকেই যেখানে তাদের দেখা হওয়ার কথা তার দূরত্ব আড়াই হাজার কিলোমিটার (দুই দিকেই)! কথামতোই ঘটলো সবকিছু। দীর্ঘ এই যাত্রায় মারিনার প্রাপ্তি অনেককিছু। তার জবানীতেই শুনি, ‘এমন লম্বা দূরত্ব পায়ে হেঁটে এসে, শেষটা কীরকম হয় সেটা আমরা দুজনেই দেখতে চাইছিলাম। অনুভূতিটা বেশ নাটকীয়, ঠিক যেমন কোনো চলচ্চিত্র একটির পর একটি দৃশ্য পেরিয়ে অন্তিমে পৌঁছায় তেমন। কেননা শেষ দৃশ্যের পর আপনি একমদই একা, যতো যা-ই বলুন বা ভাবুন না কেনো।’ আব্রামোভিচ-উলে এই অভূতপূর্ব প্রদর্শনীটির নাম দিয়েছিলেন লাভারস্‌। আগ্রহী পাঠক এই প্রদর্শনীর ভিডিও (খণ্ডাংশ)টি দেখতে পাবেন ইউটিউব চ্যানেলে।
২০১০-এ নিউইয়র্কের দ্য মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট (MoMA) মারিনার একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেই প্রদর্শনীর নাম দ্য আর্টিস্ট ইজ প্রেজেন্ট। আমার ধারণা পারফর্মিং আর্ট বিষয়ে যারা সামান্যতম আগ্রহ বোধ করেন, তারা এই প্রদর্শনীটি সম্পর্কে জানেন, বিপুল সংখ্যক হয়তো ইউটিউবে এ-র ভিডিওচিত্রটি দেখেছেনও। MoMA -র ইতিহাসে এটিই সবচে বড়ো প্রদর্শনী। চলে একটানা ২০১০-এর মার্চের ১৪ তারিখ হতে মে মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত। ঘন্টার হিসেবে সাতশো ছত্রিশ ঘন্টা ত্রিশ মিনিট! কেমন সেই প্রদর্শনী? MoMA -র সুবিশাল প্রদর্শন কক্ষের ঠিক মাঝখানে একটা চেয়ারে বসবেন মারিনা, তার সামনে থাকবে আরেকটি চেয়ার যেখানে দর্শক একে একে এসে বসবেন। ধরা যাক দর্শক প্রতি মিনিট পাঁচেক বা তারচেয়ে কম। বসা অবস্থায় (বলা ভালো প্রদর্শনের পুরোটা সময় জুড়ে) মারিনা কিংবা দর্শক কেউই বাক্য বিনিময় করবেন না, স্পর্শ তো দূরের কথা। উভয়ের মধ্যে শুধু দৃষ্টি বিনিময় ঘটবে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন কোনো দর্শক যদি কেঁদে ফেলেন তখন মারিনার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরা, বা অত্যধিক বিচলিত হয়ে পড়ার সময়গুলো ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরা হয়। মৌন হয়ে এই বসে থাকার মধ্যে দিয়ে মারিনা এবং দর্শকের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক আদান-প্রদান বা সংযোগ ঘটবে সেটিই ছিল মূল লক্ষ্য। আর এই প্রক্রিয়ায় মারিনার সামনে উপবিষ্ট হন মোট একহাজার পাঁচশত পয়তাল্লিশজন দর্শক। মজার ব্যাপার হলো এই দর্শকদের মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে উলে-ও হাজির হয়েছিলেন, বসেছিলেন মারিনার সামনে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণেও মারিনা ছিলেন অবিচল। তার সামনে বসার জন্য দিনের পর দিন লম্বা সারিতে দাঁড়িয়েছেন হাজার হাজার মানুষ, অপেক্ষা করেছেন ভোর হতে রাত অব্দি। প্রখ্যাত ইতালীয় আলোকচিত্রী মার্কো আনেলি এই প্রদর্শনীর আলোকচিত্র গ্রহণের কাজটি করেন। এবং ওই একহাজার পাঁচশত পয়তাল্লিশজন দর্শকের পোর্ট্রেট ছবি তোলেন যা পরে ফ্লিকার ম্যাগাজিনে ছাপা হয়।
soikatpstc@gmail.com

- Advertistment -