শিমুল মেঘ

হাসিবুল হোসেন

মঙ্গলবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
69

তখন টিনএজ বয়স। রেডিও চালিয়ে লেট নাইট শো শুনতাম। রাতে শোবার সময় মোবাইল বালিশের নীচে রাখতাম। রাত একটা দু’টার দিকে একটা গান প্রায়ই বাজতো। ‘আমার শহর’।
দুটো লাইন মাথায় থাকতো- ‘আমার শহর, খুব সহজে, একলা পাখির মতো, ভিজতে থাকে।’ এই পুরানো শহরে আমি তখনও নতুন। ক্লাস-কোচিং বাদ দিয়ে একা একা রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে শহরের বাইরে চলে যেতাম। সাথে নিয়ে ফিরতাম শিমুল মেঘ।
আমি তখনও মেঘদলকে চিনি না; একদিন কীভাবে যেন মেঘদলের সাথে দেখা হয়ে যায়। আমার শহর ততদিনে ছোট হয়ে আসছিল। আমি শুনলাম ‘শহরবন্দি’। এক অদ্ভুত বিপন্নতা অনুভব করলাম মনের ভেতর। ভাবি, আমরাও তো শহরবন্দি মেঘ। রাত দুপুর ঘুরে ঘুরে রাত্রিতে একা।
আরো অনেক পরে একদিন বুঝলাম আমরা সবাই আসলে গাছমানব। বেড়ে উঠি আকাশ ফুঁড়ে। মেঘে মেঘে। অসংখ্য দৃশ্য চোখের সামনে জেগে ওঠে তারপর :
‘কেটে ফেলা গাছ ভুলে যাবে সব শোক
কিছু সবুজ পাতার ক্রন্দন তুলে রেখো
ভেজা ভেজা চোখে কান্না লুকাতে পারো
ভুলে যেতে পারো চাইলেই বারবার।’
আমি কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। অদ্ভুত ঘোর। চতুর্দশী চাঁদ দেখলে যেমন বিদায় দাও বোধ জেগে ওঠে। সেইরকম।
২.
মেঘদলের ‘মুঠোফোন’ গানটার ভিজ্যুয়াল নাড়া দিয়ে গেছে। গল্পটা হইলেও হইতে পারতো।
আমি মেঘে মেঘে উড়তে শুরু করলাম। হাওয়া ঘোরের মতো মেঘদল আমাকে ভাসিয়ে রাখছিল।
‘দ্রোহে মন্ত্রে ভালবাসা’ অ্যালবামের ‘ওম’ শোনার পর হৃদয় হিম হয়ে গেল। মনে হলো থিওপলিটিক্যাল ইমেজের ভেতর সাম্যের গান। মেঘদলের ‘ক্রুসেড’ যেন বিশ্ব রাজনৈতিক নেতাদের গালে কড়া চড়। একদিন ভুলটুল করে শুনে ফেললাম ‘কুমারী’। নীল কাজলের কথা মনে পড়ে গেল খুব!
মেঘদল বুঝিয়ে দিলো ভালবাসার বিপরীত শব্দ বিষন্নতা। একটা অন্ধনদীর কথা বলে তারা। ভাবি, নদী অন্ধ নাকি আমরা? নিজস্ব নদী পাড় ভেঙে পড়ছে নিজ স্রোতে।
যে আকুতি নিয়ে প্রেমিকাকে আহ্বান জানিয়েছিলো মেঘ- তা প্রেমিকারা কেউই বুঝতে চায়নি। পৃথিবীর পথের সব ল্যাম্পপোস্ট নতজানু হয়ে ছিল নেফারতিতির প্রস্থানে। আমি বলতেই পারি অভিমানে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে তুমি পারো না!
আশ্চর্যভাবে আমার সেই পুরানো শহর ধীরে অপছন্দ হইতে লাগল।
৩.
থেকে যেতে হলো এই শহরে। যে শহরে রোজ বিকেলে ময়দানে মহিষের লড়াই হয়; দেয়াল বেয়ে বেড়ে ওঠে রাত। অন্ধকারের ভেতর জন্ম নেয় কোজাগরী চাঁদ। ক্রমশ হাওয়ায় মানুষগুলো হাওয়া হয়ে যায়। অস্থির সময়ের বিপরীতে প্রশ্ন তুলতেই জবাব চলে আসে ‘সব ঠিকঠাক’।
এই গানটা ‘ওম’ এর পরে অবস্থান করে। আর্টিফিশিয়াল অপটিমিস্টিক এটিটুডকে ভেঙে দেয়া হইছে গানটাতে। যা মগজের ভেতর আন্দোলিত হতে থাকে।
এক সাইকেডেলিক সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে শিমুল মেঘ সাথে নিয়ে শহর পার হয়ে যাই .. মেঘদল ও গাইলো- ‘আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে, প্রশ্বাসে ছুঁয়েছি আকাশ; দুঃখ ছুঁয়ে যায় বাতাসে বাতাসে…।’
গানটা যেন আমাকে মুক্তির পথ দেখিয়ে দিলো। যে করুণ বিষন্নতা পুষেও আমরা অপরিচিত থেকে যাই প্রিয় মানুষদের কাছে; তার সকল শূন্যতা দু’চোখে নিয়ে আকাশের কাছে চলে যাওয়া ঠিক!
কামনা তুমি ভালোবাসা হয়ো পরজনমে।
৪.
‘মেঘ’ গানটা জোয়ান বায়াজের ফেয়ারওয়েল এনেজলিনার সাথে মিল পাই। পরাবাস্তবতাকে আঁকড়ে বাংলা ব্যান্ডের গান খুব একটা নেই বললেই চলে। মেঘদল পরাবাস্তবতাকে নিয়ে এসেছে বন্য মহানগরে। নগরের নোনা দেয়াল, মহাশূন্যের নিস্তব্ধতা, করোটির ভেতরের যানজট জীবন্ত হয়ে এসেছে তাদের গানে।

‘এসো আমার শহরে’র ভিজুয়াল আমাদের এই ব্যান্ডকে বুঝতে সাহায্য করে। মিউজিক ভিডিওর নামে ভিডিও বেশি, মিউজিক কম- এই তরিকা সরাসরি অগ্রাহ্য করে এই মিউজিক ভিডিও।

x