শিক্ষা লাভ ও জ্ঞান অর্জন

মুহাম্মদ আবু তৈয়ব

শনিবার , ১৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ
120

 

প্রথমে জেনে নিই শিক্ষা কী?

সহজ কথায়: শিক্ষা একটি প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর অন্তনিহিত গুণাবলীর পুর্ণবিকাশের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়।

* প্রাযোগিক সংজ্ঞা: সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন সে গুলো অর্জনে সহায়তা করাই হল শিক্ষা।

* শিক্ষার লক্ষ্য : মূখ্য লক্ষ্য গৌন লক্ষ্য

র) জ্ঞান অর্জনউদ্যোমী করা

রর) দক্ষতা অর্জনসাহসী করা

ররর) মূল্যবোধ তৈরিসৃজনশীল করা

রা) আত্মবিশ্বাসী করাজ্ঞান পিপাসু করা

া) চরিত্রবান করামানবিক করা

বরণ্য ব্যাক্তিদের মতে-

* ১ মিথ্যার অপনোদন সত্যের বিকাশই শিক্ষা- সক্রোটিস

* ২ সুস্থদেহে সুস্থ মন তৈরি করাই শিক্ষা- এরিস্টটল

* ৩ শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্ব সত্ত্বার সাথে

সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে- রবীন্দ্রনাথ

শিক্ষা একটি প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়া হল ধারাবাহিক কতগুলো কাজ করা। তাই ধারাবাহিক কাজগুলো যে ধাপে যেটা করতে হয় সেটা সেই ধাপে করতে হয়। সেটা না করলে লক্ষ্য অর্জন হয় না। যেমন:-

একজন লোক অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে যাবে। লক্ষ্য অর্থ উপার্জন করা। এর জন্য ধারাবাহিক কাজের ধাপগুলো হল-

* খাবার তৈরি করা- ১ম ধাপ

* গোসল করা- ২য় ধাপ

* খাবার খাওয়া- ৩য় ধাপ

* পোষাক পরিধান করা- ৪র্থ ধাপ

* কাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা- ৫ম ধাপ

এখানে কর্মক্ষেত্রে যেতে উল্লিখিত ৫টি ধাপ ক্রমিকভাবে শেষ করতে হয়। এটি একটি তখনই প্রক্রিয়া হবে- যদি ধাপগুলো উলোট পালট করে করলে কাজে যাওয়া যাবে না বা কাজে যেতে জটিলতা দেখা যাবে। মোটাকথা এটি একটি প্রক্রিয়া, কারণ ৪র্থ ধাপের কাজটি (পোষাক পরিধান করা)

৪র্থ ধাপ না করে যদি ২য় ধাপে করি। আর ২য় ধাপের কাজটি (তথা গোসল করার কাজ) যদি ৪র্থ ধাপে করি তা হলে কাজে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ পোষাক পরিধান করে কেউ গোসল করে না। এতে লক্ষ্য অর্জন বিঘ্নিত হয়। তাই প্রক্রিয়া বলতে যে ধাপের কাজ সেধাপে কাজটি করাকে বুঝানো হয়।

আরও সুক্ষ্ম পর্যায়ে চিন্তা করা যায়। আটা বা ময়দার রুটি বানানোর পক্রিয়ায়। আটা, পানি, লবণ পরিমান মত মিশ্রণ, রুটি বানানো, আগুনে সেখা (তাপ দেওয়া) এর পর খাবার হিসাবে বিবেচনা করা। মজার বিষয় হল প্রক্রিয়ার ধাপগুলোর মধ্যে এমন কয়েকটি ধাপ থাকে যে ধাপগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বলে আপাতত বিবেচিত হয় না। তাই অসচেতনতার কারণে বা অবহেলা করে সেই ধাপগুলো বাদ যেতে পারে। ফলে কাজটির লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হয় না। যেমন আটার রুটির তৈরির সব ধাপগুলোর মধ্যে লবণ দেওয়া বা আগুনে সেখার ধাপটি করা না হলে রুটির মত লাগবে বটে। কিন্তু খাদ্য হিসেবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। রুটিটি দেখতে যতই ভাল লাগুক কাঁচা রুটি কখনো খাদ্য হয় না।

শিক্ষাও একটি প্রক্রিয়া সে প্রক্রিয়ার ধাপগুলো কি কি লক্ষ্য করি। শিক্ষা লাভের ধাপগুলো হল-

ক) শুনা- ১ম ধাপ চ) গল্প বলা বিবিধ ধাপ

খ) দেখা- ২য় ধাপ ছ) বির্তক করা বিবিধ ধাপ

গ) বলা- ৩য় ধাপ

ঘ) অনুশীলন- ৪র্থ ধাপ

ঙ) উপলব্ধি- ৫ম ধাপ

উল্লিখিত ধাপগুলো শিক্ষালাভের এক একটি পদ্ধতি (১৮ বছর পর্যন্ত বিবেচনা করে)। ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়। প্রত্যেক ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা প্রক্রিয়ার ১ম ধাপ/ পদ্ধতিঃ শুনা।

শুনে শুনেই শিশুদের শিখা শুরু হয়। শুনা ধাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানরা মুখস্থভাবে বাংলা বলতে পারে কিন্তু ইংরেজি ভাষা বলতে পারে না। কারণ বাংলা মাতৃভাষা হওয়ায় শুনার সুযোগ বেশি। অনুশীলন করার সুযোগ বেশি। কিন্তু ইংরেজি ভাষা তেমন শুনা হয় না। শুনা হয় না বলে বলাও হয় না। চর্চা করাও হয় না। তাই শিক্ষার্থীকে শেখানো বিষয়টি বার বার শুনানো প্রয়োজন। তাকে মুখে মুখে বলানোর পূর্বে শুনার সুযোগ করে দিতে হবে। ন্যূনতম ১০ বার করে কোন বিষয় শুনানোর জন্য পরামর্শ রয়েছে। যদি শুনানো ধাপটির গুরুত্ব বুঝতে না পারি বা অবহেলা করি তাহলে সেই আগুনে সেখাহীন রুটির মত হবে। রুটি হলেও সেখাহীন রুটি রুটি না। উপযোগিতার বিবেচনায়। ইংরেজি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এখানে শুনার ক্ষেত্র সীমিত বলে, ইংরেজি বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি নিলেও ইংরেজি শেখায় দক্ষ হতে পারে না। প্রকৃত ইংরেজি শেখা হয়ে উঠে না। ডিগ্রি নিলে কি হবে; সেই আগুনে সেখাহীন রুটির মত অখাদ্য হয়ে পড়ে। শুনার বিষয়টির উপর একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। যারা সচেতন অভিভাবক তারা সন্তানের পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলো উপর আগাম ধারনা নিয়ে রাখেন। পারলে দক্ষতা অর্জন করে রাখেন। যাতে সন্তানকে ঐ বিষয় নানা সময়ে ও সুযোগে শুনানো যায়। এ ব্যাপারে একটি পরিবারকে জ্ঞানি-

সন্ধ্যায় বা পড়ার সময় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয় টি আমাদের ভোগায়। অনেকের হা-হুতাস বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু জানা পরিবারটির জন্য বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়টি অভিশাপ না হয়ে আর্শিবাদ হয়ে যেত।

বিদ্যুৎ চলে গেলে, সন্তানরা তাদের দাদাকে ঘিরে ধরত/ দাদার হাত পাখার বাতাসে শীতল হতে। দাদা হাত পাখা ঘুরাত আর নানা সুর ছন্দে তাদের পাঠ্যবইয়ের কবিতা, পদ্য বা ছড়া গুলো সুরালা কণ্ঠে শুনায়ে যেত। কবিতা, ছড়া নিয়ে নানা প্রেক্ষাপট বলার পাশাপাশি নানা মূল্যবোধের কথাও শুনায়ে যেত। শ্রোতাদের মধ্যে কে বাবুই পাখি হবে আর কে চড়ুই পাখি হবে তার উপর নানা কল্প কাহিনী চলত। এভাবে তাদের কাছে কবিতা ছড়াগুলো আনন্দের বিষয় হয়ে উঠত এবং পাঠ্য বইয়ের কবিতা ছড়া গুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠায় বার বার তারা সেইগুলো চর্চা করত। এভাবে তারা একদিন কবিতা-ছড়া প্রেমিক হয়ে উঠে। বিদ্যুৎহীন নেতিবাচক পরিস্থিতিটিতে শুনার ধাপটি কার্যকর করায় তা ইতিবাচক হয়ে উঠল।

* শিক্ষার দ্বিতীয় পদ্ধতি / ধাপ হল : দেখা-

দেখা হল শিক্ষালাভের ২য় ধাপ। ৭০% থেকে ৮০% প্রাথমিক শিক্ষা দেখা থেকে লাভ হয়। এই দেখার ধাপটিতে আন্তরিক হতে দেখা যায় না।

বই খোলা হল-

আমের ছবিটা, ছোট নদীর দৃশ্যটা, সকাল বেলার দৃশ্যটা বইয়ের ছবিতে ভাল করে দেখার সুযোগ শিক্ষার্থীকে না দিয়ে বা সেই সব দৃশ্যের সাথে তার কল্প জগতের দৃশ্যের মিল খোঁজার সুযোগ না দিয়ে, পাঠদান বা তাকে শিখানো শুরু হল- আ-তে আম, অথবা কবিতাটি মুখস্থ করানোর উদ্যোগ। এতে পাঠের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। অর্জন করাতে চাইলে তাকে আগে দেখার অনুধাবন করার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

যেমন- “মা” নিয়ে সন্তানকে অনুচ্ছেদ বা রচনা লিখানো বা শিখানো হয়। লক্ষ্য মা এর ব্যাপারে সন্তানের মধ্যে যাতে ইতিবাচক ও সম্মানসূচক মানসিকতা গড়ে তোলা এবং মনের ভাব প্রকাশে দক্ষ করে তোলা। কিন্তু সন্তান যদি দেখে সমাজে বা তার পরিবারে মা কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বাবা মাকে সম্মান করে কথা বলে না। পারিবারিক সিদ্ধান্তে মায়ের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাহলে সে সন্তান যতই ‘মা’ রচনা/অনুচ্ছেদ শিখুক না কেন তার প্রকৃত শিক্ষালাভ হবে না। হবে উত্তর পত্রে নম্বর পাওয়া। এভাবে দেখার বিষয়গুলো যতই পরিশ্রুত ও গুণগত মানের হবে সন্তানের শিক্ষা লাভের বিষয়টি ততই সফল হবে। এজন্য বর্তমান শ্রেণি উপকরণ ও মাল্টি মিডিয়া মাধ্যমে ক্লাশ নেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুনা দেখার ধাপগুলো কার্যকর করার জন্য।

* ৩য় পদ্ধতি : শিক্ষা প্রক্রিয়ার ৩য় ধাপ হল বলা। কোন কোন শিক্ষাবিদ ‘বলা’কে শিক্ষা পদ্ধতিতে না ফেলে শিক্ষা লাভের লক্ষ্য বলে বিবেচনা করেন। যা শুনল, দেখল বা ভাবল তার প্রকাশ করার মধ্যে রয়েছে পূর্ণতা। বলার সক্ষমতা থাকলে বা শিক্ষা লাভের লক্ষ্য অর্জন ত্বরান্বিত হয়। এই দেখানো শুনানোর ধাপগুলোর পর সন্তানকে বলানোর জন্য সহায়তা করতে হয়। যদি সুষ্ঠুভাবে দেখানো ও শুনানোর ধাপগুলো সম্পন্ন হয় তাহলে বলানোর ধাপটা সম্পন্ন করা সহজ হয়। এজন্য তাকে দিয়ে শব্দ করে পড়ানো, আবৃত্তি করানো, বির্তক করানো, বিভিন্ন উপাদানের উপর বলতে উৎসাহিত করতে হয়। এই জন্য সন্তান বেড়ে উঠার পথে এক সময় সে প্রচুর কথা বলতে চায়। কথা বলার জন্য সহচরদের সাথে মিশে যদি সঠিকভাবে বা আগ্রহী হয়ে মনযোগ সহকারে তার কথা অভিভাবক শুনেন তাহলে তার প্রকাশ বা বলার ক্ষমতা ভালভাবে লাভ হবে। আবার এক সময় এই বলা ছড়ানো ছিটানো না হয়ে বিশেষ কাঠামোতে হবে। তখন হয়ত অভিভাবককে আর শোনাতে চাইবে না। অথচ আমরা সন্তানের কথা মনোযোগ সহকারে কয়জনই শুনি। সেই শুনা যে শিক্ষা সহায়ক তা ভেবে দেখি না।

* ৪র্থ পদ্ধতি : শিক্ষালাভের ৪র্থ ধাপ হল অনুশীলন বা চর্চা করা তথা দক্ষতা লাভ করা: এখানে পাঠের বিষয়টি শুধু জানলে হয় না। সেই জানার বিষয়টিতে দক্ষ হয়ে উঠতে হয়। এই ধাপকে গুরুত্ব না দেওয়ায় লক্ষ্য অর্জনে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে কম অনুশীলন শিক্ষা লাভে সফলতা আসে না।

এই যেমন ব্যায়ামাগারে বা জিমে শরীর চর্চার জন্য বিভিন্ন উপকরণ (ভারদন্ড, গোলকদন্ড, দড়ি, রানার বেল্ট ইত্যাদি) থাকে। সেই উপকরণগুলো শুধু ব্যবহার জানলে হয় না। ব্যবহার জানার মধ্যে দিয়ে ব্যায়ামগারে যাওয়ার লক্ষ্য অর্জিত হয় না। সেসব উপকরণ বার বার ব্যবহার করে তথা অনুশীলন করলে তবেই শরীর সুগঠিত হবে। শিক্ষা লাভ সফল হবে। জানা গুরুত্বপূর্ণ নয়। শরীর গঠন গুরুত্বপূর্ণ। অনুরূপ পাঠদানের বিষয় জানার পর তা বার বার অনুশীলন বা চর্চা না করলে সে জানা সফল হয় না। তাই “আমাদের ছোট নদী” বা “আবার আসিব ফিরে” কবিতাটি শুধু মুখস্ত বা জানলে হবে না। শিখতে পারলে হবে না। বার বার বলাতে হবে শোনাতে হবে। সে শুনা ও বলায় যখন আনন্দ যুক্ত হবে, উৎসাহ থাকবে তখন তার মানসিক জগতেও “আমাদের ছোট নদী”-র মত একটি নদী কুল কুল শব্দ করে তার মনের জগতেও প্রবাহীত থাকবে। বা “আবার আসিব ফিরে” কবিতার মত একটি দেশকে দরদ দিয়ে মমতা দিয়ে স্বপ্ন দিয়ে তার মত একটি দেশ তৈরি করবে। দেশের জন্য দৃশ্যকাতর হয়ে উঠবে স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। তার সাথে সাদৃশ্য আরও দু’একটি কবিতা (স্থানীয় ভাবে কোন নদীর বর্ণনা) যেমন কর্ণফুলী বা সৈয়দ আলী আহসানের “আমার পূর্ব বাংলা” কবিতা পাঠকের মানসিক জগতে স্থান করতে পারলে তো কথাই নেই। তার ভাবনার জগতের অনেক অংশ তা দখল করে নেবে।

* ৫ম পদ্ধতি: শিক্ষা প্রক্রিয়ার ৫ম ধাপ হল- উপলব্ধি: এ ধাপে দেখা শুনা জানার বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হয়। সমন্বয়ের মাধ্যমে তার উপলব্ধি শানিত হয়। এই উপলব্ধি ধাপ হল খুবই গুরুত্ব পূর্ণ। উপলব্ধি স্তরের ভিন্নতা ও গভীরতার মাত্রার জন্য এত নানা কাজের শিল্পকর্ম পাই। এত বৈচিত্র্য স্বাদ নেওয়ার সুযোগ থাকে। বাবুই পাখিকে চড়ুই পাখি অহমিকা করে কেন পাকা ঘরে থাকার কথা বলল আবার চড়ুই পাখি কেন সে পাকা ঘরে না থেকে কুঁড়ে ঘরে থেকে রোদ বৃষ্টি ঝড়ে ভিজতে চাইল তা শুধু জানলে বললে হয় না। অনুধাবন করতে হয়। এই অনুধাবন শানিত হয়- বেশি পড়া বেশি জানার মাধ্যমে। যেমন শিল্পী কামরুল হাসান নিজেকে “পটুয়া” (Artist) বলে পরিচয় দিতে গর্বিত বোধ করতেন। শিল্পী জয়নাল আবেদীন নব্য শিল্পীদের পেইন্টার (Painter ) বলতেন। এই পটুয়া আর্টিস্ট, পেইন্টার, শিল্পী ইত্যাদি শব্দের মূল অর্থ একই হলেও বোধে বা অনুধাবনের গভীরতার ভিন্নতা আছে। এর জন্য বাঙালী জাতিসত্ত্বার ইতিহাস জড়িত।

১) যেমন: ১৯৫২ খ্রি: বাঙালী জাতির জন্য গুরুত্ব পূর্ণ কেন? জানার বিষয় হল এই খ্রিষ্টাব্দে বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার আন্দোলন হয়েছিল। এতটুকু জানার মধ্যে সেই আন্দোলনের গুরুত্ব প্রয়োজনীয়ত অনুধাবন করা সম্ভব নয়। জানল, শিখল, পরীক্ষার উত্তর পত্রে লিখে দিল পাশ করল। এটাতো শিক্ষার লক্ষ্য নয়। এখানে মাতৃভদাষার প্রতি ভালবাসার গুরুত্ব ও স্বদেশ প্রেম জড়িত। এটা বোধে মননে আনার জন্য আরও কিছু জানার আগ্রহ থাকা চাই। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃদুগ্ধের মত এই মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের মানসিক পুষ্টি যোগায়ে বোধকে শানিত করে এই ভাষা। তাই জাতির চরম ও সুষ্ঠু বিকাশের জন্য মাতৃভাষা মৌলিক সোপান। আমরা অন্যান্য দিক দিয়ে ভিন্ন হলেও ভাষাগত দিক দিয়ে আমরা এক সত্তার। জাতি তৈরি হল, বাঙালী জাতি তৈরি হল বাঙলা ভাষার উপর ভিত্তি করে ধরে অথবা রাজকীয় মর্যদা এই ভাষা সহজে পায়নি। এই অঞ্চলে তুর্কি শাসকদের দরবারে ধরে এই ভাষা প্রবেশ করতে পারে নি। পরাসিকদের রাজদরবারেও না, পাল-সেনদের দরবারেও না। ইংরেজদের দরবারেও না, শেষ লড়াইটা করতে হল পাঞ্জাবদের সাথে। সেই পাঞ্জাবদের কে পরাজিত করতে চরম আন্দোলন হল ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে। ছয়/সাতটি জাতির সাথে টিকে থাকার সংগ্রাম করে ১৯৫২ সালে সেই টিকে থাকার সংগ্রাম আন্দোলনে পরিণত হল। আর ১৯৫৬ সালে বাঙলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেল। অর্থাৎ রাজদরবারে বাঙলাভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা হল। এভাবে নানা প্রেক্ষাপটের ভিতর দিয়ে প্রারম্ভিক উত্তরের গুরুত্ব অনুধাবন করার ক্ষেত্র তৈরি করা যায়। এক সময় এ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় জানা হলে তখন উত্তর দেওয়া লক্ষ্য না হয়ে উপায় হয়ে উঠবে। লক্ষ্য মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালভাসা দরদ তৈরির পাশাপাশি স্বজাতির প্রতি স্বদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা তৈরি। অনেকটা একজন সাধারণ নির্বোধ মানুষকে হেলিকপ্টার করে এভারেস্টের শৃঙেগ দাঁড় করায়ে দিলে তিনি যেমন অনুধাবন করতে পারবেন না তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন তেমনি ১৯৫২ সালের গুরুত্ব বুঝাতে তেমনি ভাষা আন্দোলন শিখলে জানলে হবে না। তার প্রাসঙ্গিক নানা প্রেক্ষাপটও জেনে জেনে ভালবাসার দরদি পলিমাটি পাঠকের মানস সাগরের তলায় জমাতে হয়। যা এক সময় দ্বীপ হয়ে ভেসে উঠবে। এতক্ষণ এই আলোচনা করা হল শিক্ষা প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পদ্ধতির উপর দৃষ্টি আর্কষণ করার জন্য। প্রক্রিয়াগুলো দিয়ে শিক্ষা নামক পথ দিয়ে হাটা শিখলাম। এখন শিক্ষা নামক এই পথ দিয়ে হেঁটে যাব কোথায়। রাস্তা তৈরি করা শিখলাম। কিন্তু সে রাস্তা কোথায় পৌঁছাতে, কোন দিকে তৈরি করব তার উপর আলোচনা প্রয়োজন। অর্থাৎ শিক্ষা হল উপায় বা পথ। সেই উপায় বা পথের লক্ষ্য কী তা জানতে হবে। শিক্ষা নামক উপায় দিয়ে কোন লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয় তার উপর আলোচনা করা হল।

শিক্ষার মূখ্য লক্ষ্য হল- ক) জ্ঞান খ) দক্ষতা গ) মূল্যবোধ ঘ) বিশ্বাসী ঙ) পরিশীলিত স্বভাব

শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা আরও কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে আগ্রহী দেখান সেগুলো হল-

১। উদ্যোমী হওয়া ২। সাহসী হওয়া ৩। সৃজনশীল হওয়া ৪। জ্ঞান পিপাসু হওয়া ৫। মানবিক হওয়া

লক্ষ্যগুলোর মধ্যে “জ্ঞান” কে প্রাথমিক ও মৌলিক লক্ষ্য বলে বিবেচনা করা হয়। অন্য যেকোন লক্ষ্য অর্জনে এই জ্ঞান অর্জন ধাপটি প্রয়োজন। তাই জ্ঞান এর উপর আলোচনা সীমিত রাখাব।

এছাড়া মনো-সামাজিক-জীব বিজ্ঞানীরা শিক্ষা লক্ষ্যকে এই এভাবেও চিহ্নিত করছেন

১। শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হল ক্রমোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা, আর উক্ত সুযোগসৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন প্রভাব দূর করা।

২। শিক্ষার লক্ষ্য প্রতিটি ব্যক্তিকে সংস্কৃতিবান করে গড়ে তোলা এবং ব্যক্তির দক্ষতার সর্বোচ্চ বিকাশ।

৩। শিক্ষার লক্ষ্য বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নয়, গোটা সম্প্রদায় এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে কেজো নাগরিক তৈরি করা।

শিক্ষার এসব লক্ষ্য ও পদ্ধতির ব্যাপারে যতই সচেতন থাকা সম্ভব হবে তত বেশি শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হবে।

লেখক: অধ্যক্ষ- খলিলুর রহমান মহিলা (ডিগ্রি) কলেজ, পটিয়া, চট্টগ্রাম।

x