শিক্ষার সংখ্যাগত অর্জন নয় গুণগত মান চাই

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ
221

আজ ২ ফেব্রুয়ারি, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এসএসসি পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষা শুরুর এই ক্ষণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য আমাদের শুভকামনা। সেই সাথে নতুন সরকার গঠনের পর এটি যেহেতু প্রথম কোন বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা তাই এটি সরকার বিশেষ করে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষামন্ত্রী-উপমন্ত্রী তাঁদের জন্যও একটি সুন্দর, নকল ও প্রশ্নফাঁস মুক্ত পরীক্ষা আয়োজনের পরীক্ষা বটে, তাঁদের জন্যও আমাদের শুভকামনা। আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের নবীন, মেধাবী ও প্রাজ্ঞ মন্ত্রীদ্বয় তাঁদের দূরদর্শিতা, মেধা ও প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটিয়ে জন আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাবেন।
প্রশ্নফাঁস রোধে এবার সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কোন সেটের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে তা পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে কেন্দ্রে জানানো হবে এবং কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কেন্দ্র সচিব এবং পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি ও স্বাক্ষরে নির্ধারিত সেটের প্রশ্নপত্রের মোড়ক খুলতে হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই সাথে প্রত্যেক কেন্দ্রের জন্য একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট বা কর্মকর্তা (ট্যাগ অফিসার) নিয়োগ দিতে হবে। তাঁরা ট্রেজারি বা থানা থেকে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা তাঁর মনোনীত উপযুক্ত প্রতিনিধিসহ প্রশ্নপত্র গ্রহণ করে পুলিশ পাহারায় কেন্দ্রে নিয়ে যাবেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়া প্রশ্ন বের করা বা বহন করা যাবে না সহ এমন আরও বেশ কিছু নির্দেশনা। আমাদের প্রত্যাশা, সরকারের এইসব ভালো উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে এবং পরীক্ষার্থীরা নকল ও প্রশ্নফাঁস মুক্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।
সে যাই হউক, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনও নানা অসংগতি থাকলেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার বাড়াসহ এরকম নানামুখী অর্জন আমাদের। কিন্তু, পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রচুর জিপিএ পাঁচ পাওয়া কী আদৌ আমাদের শিক্ষার সঠিক মান উন্নয়ন নির্দেশ করে? নিশ্চয়ই না।
যদিও আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যাবস্থা এখন অনেকটাই পরীক্ষানির্ভর! সেখানে একটি শিশু তার প্রাথমিক বিকাশকালীন সময়েই মুখোমুখি হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার! বিশ্বকে জানার এবং জ্ঞান আহরনের প্রতি শিশুর আগ্রহ সৃষ্টির আগেই আমরা তাকে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি, তাতে শিশু জানলো কি জানলো না তা নিয়ে আমরা বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই! আমাদের মূল চিন্তা সে জিপিএ পাঁচ/গোল্ডেন জিপিএ পেল কিনা! বেশীরভাগ অভিভাবকই সন্তানের জন্য কোচিং, গাদা গাদা টাকা দিয়ে টিউটর রেখে ভালো পরীক্ষার ফল চাইছেন, কিন্তু সন্তান মানবিক, সহনশীল আর ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা সেই চেষ্টা কী আদৌ আমাদের অনেকেরই আছে? কিছু অভিভাবকের কাছে নামী স্কুলে চান্স পাওয়াই যেন সন্তানের সব! অন্যদিকে, আবার কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা ক্ষেত্রে শুধু ‘প্রথম’ হওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামিয়েছেন এবং নিজেরাও নেমেছেন, তাতে দেখা যায় তাঁর সন্তান হয়তো পরীক্ষায় ‘প্রথম’ হতে পারে, কিন্তু, সত্যিকারের ‘মানুষ’ কী হতে পারে? আর সন্তান যদি মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুনাগরিক হতে না পারে তাহলে সেই ‘প্রথম’ হতে পারা শিক্ষার কোন মূল্য কি থাকে? অভিভাবকগন তাঁদের সন্তানদের ভালো ফল করতে বলবেন, তাতে দোষের কিছু নেই এবং সেটাই যৌক্তিক।
কিন্তু, সেই সাথে ‘মানুষ’ হওয়ার সাধনা যদি না করে, তবে চূড়ান্ত বিচারে তো ফলাফল শূন্য! অতীব দুঃখের সাথেই বলতে হয়, আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনই যেন আজ মূখ্য। ভালো শিক্ষাপূর্ণ বিদ্যালয় বলতেই আমরা বুঝি, যে স্কুলে শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষায় ভালো করে! তাই আমার মনে হয়, শিক্ষার হার, প্রাথমিকে ঝরে পড়া হ্রাস বা প্রায় শতভাগ পাসের সমাজই একটি আলোকিত ও সপ্রান সমাজ নয়। বিগত কয়েক বছর যাবত আমাদের পাবলিক পরীক্ষা গুলোতে সংখ্যাগত বিচারে পাশের হার বেড়েছে, কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধ কী সেই হারে বেড়েছে বা সেই অর্থে মেধাবী প্রজন্ম কী তৈরি হয়েছে? অনেক ক্ষেত্রেই উত্তর হচ্ছে, না। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, গোল্ডেন জিপিএ পাঁচ পেয়েও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বুয়েট এবং মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় তাঁরা মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারছেনা! আবার কিছু ক্ষেত্রে সমাজে চরম অধঃপতিত হয়েছি আমরা। এই পরীক্ষানির্ভর বাস্তবতায় আমরা ভুলে যাই, সমাজে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হলেই তাঁদের জ্ঞানী বলা যায় না। আর জ্ঞানী হলেও তাঁরা তো বিজ্ঞ মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ নাও হতে পারেন, এই উপলব্ধি আমাদের যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল। এই যে বিগত কয়েক বছরে আমাদের এত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিভিন্ন ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সমাজ জুড়ে মূল্যবোধের সংকট, আদর্শের অনটন আর সংবেদনশীলতার অভাব কী কেটেছে?
একটি সুস্থ, সুন্দর, সজীব ও প্রাণবন্ত সমাজের জন্য যে মানবিক ও সহনশীল শিক্ষা তৈরি করা প্রয়োজন সে রকম মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষাই পারে একটি আলোকিত ও সপ্রাণ সমাজের সন্ধান দিতে। আমাদের নতুন সরকার ও মেধাবী মন্ত্রীদ্বয়ের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, ২০১০ সালে প্রয়াত শিক্ষাবিদ কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীদ্বয় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করবেন। আর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য যে আইন প্রয়োজন তারও সুরাহা হবে দ্রুত। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমানে চলা নানা অসঙ্গগতি ও অব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রেই দূর হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। কারণ, প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে নোট বই, গাইড বই, কোচিং বন্ধের বিধান আছে। আর শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষকের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাসহ প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার পক্ষে যুক্তি ছিল যে একটি শিশুকে জ্ঞানের জগতের সঙ্গে মোটামুটি পরিচয় করাতে এবং জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জন্মাতে ন্যূনতম আট বছর পড়াশোনা করতে হয়। যদিও প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতির কিছু কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে, কিন্তু আমরা চাই তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। কারণ, উন্নত বিশ্বের কাতারে নিজেদের উন্নীত করতে হলে শিক্ষার বিকল্প কিছু নেই, আর লক্ষ্য স্থীর করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে যেতে হবে দ্রুত।

x