শিক্ষার ধরন : রবীন্দ্রনাথের কাল এবং একাল

করবী চৌধুরী

শুক্রবার , ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ
81

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলায় যে শিক্ষাপদ্ধতিতে তাঁকে শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল, আর তার প্রায় দেড়শ বছর পরে এসে বর্তমানে আমরা যে পদ্ধতিতে আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছি, মূলত এই দুইয়ের মাঝে বিশেষ কোন ফারাক নেই। এ যেন অনেকটা নূতন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশনের মতোই! তখনকার সময় থেকেই ঘাড়ে চেপে বসা মান্ধাতা শিক্ষাপদ্ধতির ভূত যে এখনও তার সদর্প শাসন চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ের ওপর কিছুটা তুলনামূলক আলোচনার চেষ্টা করছি।
সেকালে স্কুলগুলোতে পড়াশোনার নামে শিক্ষার্থীদের ওপর যে অত্যাচার চালানো হতো, সে ব্যাপারে কিছুটা আমরা রবীন্দ্রনাথের স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতির বিষয়ে লেখাগুলো থেকে জানতে পারি। তিনি নিজের স্কুল সম্বন্ধে লিখেছেন,’সেখানে কি শিক্ষালাভ করিলাম মনে নাই, কিন্তু একটা শাসনপ্রণালীর কথা মনে আছে। পড়া বলিতে না পারিলে ছাত্রকে দাঁড় করাইয়া তাহার দুই প্রসারিত হাতের উপর ক্লাসের অনেকগুলা শ্লেট একত্র করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইত। এইরূপে ধারণাশক্তির অভ্যাস বাহির হইতে অন্তরে সঞ্চারিত হইতে পারে কিনা তাহা অবশ্য মনস্তত্ত্ববিদ্দিগের আলোচ্য।’
এবারে আসি, একালের শিক্ষকদের শাসনপদ্ধতির বিষয়ে। আমাদের অধিকাংশ স্কুলগুলোয় পড়াশুনার নামে শিক্ষার্থীদের উপর যে অত্যাচার চালানো হয় তাতো সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে সরকারি স্কুলগুলোতে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের বেত দিয়ে, ডাস্টার ছুঁড়ে দিয়ে আঘাত করার সংস্কৃতি থেকে এখনও আমাদের শিক্ষক সমপ্রদায় বেরোতে পারেননি। অনেক সময় পড়া না পারার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক আঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তখন তাদেরকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন পর্যন্ত হতে হয়! সন্তানের কষ্টে ভেতরে ভেতরে রাগে -দুঃখে ফুঁসে উঠলেও জোরালো কোন প্রতিবাদ করতেও সাহস করেন না অভিভাবকেরা। পাছে যদি সন্তান শিক্ষকদের রোষানলে পড়ে! ভালো পরীক্ষা দিয়েও যদি তাকে ফেল করিয়ে দেয়া হয়! বর্তমান সরকার আইন করে স্কুলে বেত নিষিদ্ধ করলেও শিক্ষকেরা সেই আইনকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়েই চলেছেন।
অতীতেও কোন শিক্ষার্থী যদি তার স্বভাবে একটু অস্থির ও অধৈর্য প্রকৃতির হয়ে উঠতো তখন শাসনের নামে তার উপর চালানো হতো নির্মম শারীরিক ও মানসিক পীড়ন। ফলে শিশুমন হয়ে পড়তো সন্ত্রস্ত! বেশি করে পাঠ্যমুখী করার নির্দয় প্রচেষ্টার ফলে উল্টো পাঠ্যবইয়ের প্রতি তার দেখা দিত ভীতি আর অনীহা। একালের শিক্ষার্থীদের ব্যাপারেও কিনু্ত তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। নেহাৎ পিতামাতার ভয়ে, অথবা তাদের চাহিদা মোতাবেক ‘ সবসময় সবার থেকে এগিয়ে থাকতে হবে’.. এই ভাবনার বশবর্তী হয়ে তারা পাঠ্যবিষয়গুলো গিলে নিতে শিখছে। হজম করতে নয়।
সেকালের পাঠশালায় গুরুমশাইটিকে কেন্দ্র করে সকাল-সন্ধ্যায় যে শিক্ষাচর্চ্চা হতো তার অনেকটাই ছিল অন্তঃসারশুন্য। কোমলমতি শিশুদের পক্ষে কোন বিষয় কতটুকু গ্রহণ করা সম্ভব, কোন পদ্ধতিতে পাঠদান করলে তা শিক্ষার্থীর কাছে আনন্দের সামগ্রী হয়ে উঠবে, সে সম্পর্কিত কোন জ্ঞান তাদের ছিলো না। গুরুমশাইদের তেমন আধুনিক কোন মন ছিল না বলে তাদের শিক্ষাপদ্ধতিও ছিল পুরনো ধ্যান-ধারণামাফিক। তাদের এই অপরিণামদর্শিতা ফলে শিশুমন নানাভাবেই বিক্ষিপ্ত হত।
একালেও শিক্ষাক্ষেত্রে মান্ধাতা আমলের পাঠপদ্ধতির কারণে পাঠ্যবস্থ শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাণের স্থু্ত হয়ে উঠতে পারেনি। আনন্দের সাথে শিক্ষাগ্রহণ করতে তারা শিখেই নি! ‘এ প্লাস’, ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ নামক উদ্ভট মার্কি এর চাপে পড়ে তারা তোতাপাখির মত সব মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে আসে।

রবীন্দ্রনাথ বরাবরই মানবমনের স্বাধীনতায় আস্থাশীল ছিলেন। তিনি কখনওই বাঁধাধরা পদ্ধতির শিক্ষাক্রমকে সমর্থন করেননি। তিনি চেয়েছিলেন, জীবন শিক্ষাকে নয়, শিক্ষায় জীবনকে অনুসরণ করুক। ছোটকাল থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিক্ষা যদি প্রাণের আনন্দের সাথে যুক্ত না হয় তবে তার কোন ভবিষ্যৎ নেই। তাই তিনি লিখেছেন, ‘ভাণ্ডারঘর যেমন করিয়া আহার্যদ্রব্য সঞ্চয় করে, আমরাও তেমন করিয়া শিক্ষা সঞ্চয় করিতেছি। দেহ যেমন করিয়া আহার্য গ্রহণ করে তেমন করিয়া নহে।’
সেকালেও বাড়ি থেকে দূর -দূরান্তে অবস্থিত বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ক্লান্তি, বিদ্যালয় থেকে ফিরে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া, পাঠ বহির্ভূত কার্যক্রমের মত শত চাপ ছিল শিক্ষার্থীর মাথার ওপর। এছাড়াও বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের অতি তদারকি,উৎসাহ ভরে স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে তাদের শিক্ষাপ্রদান, ইত্যাদির চাপে পড়ে শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়তো ক্লান্ত, শ্রান্ত। ফলে প্রকৃত শিক্ষাগ্রহণ হতো ব্যর্থ!
শিশু রবীন্দ্রনাথকেও যে বিভিন্ন বিচিত্র বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল আমরা সেটা তাঁর ভাষ্যমতেই জানতে পারি। ‘ ভোরে অন্ধকার থাকিতে নেংটি পরিয়া প্রথমেই এক পালোয়ানের সঙ্গে কুস্তি করিতে হইত। তারপরে সেই মাটিমাখা শরীরের ওপর জামা পরিয়া পদার্থবিদ্যা, মেঘনাদ বধ কাব্য, জ্যামিতি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি শিখিতে হইত। বিদ্যালয় হইতে ফিরিয়া আসিলেই ড্রইং এবং জিমনাস্টিকের মাস্টার আমাদের লইয়া পড়িতেন। সন্ধ্যার সময় ইংরাজি পড়াইবার জন্য অঘোরবাবু আসিতেন। এইরূপে রাত্রি নয়টার পর ছুটি পাইতাম। নৈমিত্তিক আয়োজনও কম ছিল না। রবিবার সকালে বিষ্ণুর কাছে গান শিখিতে হইত। সীতানাথ দত্ত মহাশয় আসিয়া যন্ত্রতন্ত্র যোগে প্রকৃতিবিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন।’
একালেও অনুসরণ করা হচ্ছে একই ধারা। শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে ফিরে নাকেমুখে কিছু খাবার গুঁজে অথবা স্কুল থেকে সরাসরি ছুটছে কোচিংক্লাসে। বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় আবার গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে বসা! এতসবের পাল্লায় পড়ে ওষ্ঠাগতপ্রাণ হয়ে পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীটি। এর পর আছে ছুটির দিনে পিতামাতার উৎসাহে নাচ,গান, ছবি আঁকা,প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষালাভের জন্য সমানতালে প্রাণপাত করা! এতকিছুতে আবর্তিত হয়ে শিক্ষার্থীরাও ক্রমশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। পরিণামে তাদের মধ্যে সহনশীলতার অভাব দেখা দিচ্ছে।
সেকালেও স্কুলে শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠতো। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও হতে হয়েছিল তার শিকার।’ বাংলা ‘ বিষয়ে সর্বাধিক নম্বর পেয়েও পরীক্ষকের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে রবীন্দ্রনাথকে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘এবার স্বয়ং সুপারিন্টেনডেন্ট পরীক্ষকের পাশে চৌকি লইয়া বসিলেন। এবারেও ভাগ্যক্রমে আমি উচ্চস্থান পাইলাম।’
আর একালের শিক্ষকদের পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। আমাদের সবাইকেই কোন না কোন সময়ে এই তিক্ত অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষকেরা তাদের প্রাইভেট পড়ানো ছাত্রছাত্রীদের নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে যে পক্ষপাতিত্ব করেন তাতো সর্বজনবিদিত। পরিণামে অনেকসময় দেখা যায়, কোন মেধাবী পরীক্ষার্থী পরীক্ষার খাতায় তার প্রাপ্য নম্বরটা পাচ্ছে না, বিপরীতে কোন সাধারণ মানের পরীক্ষার্থী আশাতীত ফল করছে।
ছোট থেকে বড়, শৈশব থেকে পূর্ণতা – এই বলয়ের মধ্যে মানুষ তার ‘মান’ ও’ হুশ’ নিয়ে মনুষ্যত্বের পথে অগ্রসর হয়। আর এই অগ্রসরতার ক্ষেত্রে শিক্ষা মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকে কবিগুরু তাঁর অপরিণতবয়সে কলম হাতে নিয়ে ছেলেবেলাকার কথা লিখতে বসেও ভোলেননি, ঘর আর বাইরের প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডীতে বাধা পড়ার ফলে তাঁর শৈশবের মুক্ত দিনগুলোকে রূদ্ধ করার যন্ত্রণাটা। সেই আবদ্ধ প্রাণচাঞ্চল্যহীনতাকে তিনি কোনদিন মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর অবরূদ্ধ মনপাখি যে সবসময়ই মুক্ত আকাশ খুঁজে বেড়াচ্ছিল তা তাঁর লেখাতেই প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। আমাদের শিক্ষার্থীদের কচিপ্রাণগুলোও নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথের শিশু মনটির মতোই কেঁদেকেঁদে উঠে বারেবারে! পুরোটা না হলেও কিছুটা শিথিল শাসনের আকাশে উড়ে বেড়ানোর বাসনাতে তাদের মনও নিশ্চয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে! একটা সুস্থ-সবল উত্তরাধিকার পেতে হলে আমাদের অভিভাবকদের এই বিষয়টার প্রতি বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।

x