শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবসা- মনোবৃত্তি দূর করতে উদ্যোগ নিতে হবে

শুক্রবার , ৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ২:৪৫ পূর্বাহ্ণ
44

‘নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে ফুলের মতো ফুটব, বর্ণমালার গরব নিয়ে আকাশ জুড়ে উঠব’ এই স্লোগানটি চমৎকার। নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বছরের প্রথম দিন সারাদেশে উদযাপিত হয়েছে বই উৎসব। সরকার বছরের প্রথম দিন দেশজুড়ে ‘পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস’ উদযাপন করেছে। প্রথম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যের নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালে যখন বিনামূল্যে এই বই দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয় তখন শিক্ষার্থী ছিল আড়াই কোটির মতো। এখন অনেক বেড়েছে। এবার ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে বিদ্যালয়ের শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়া একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। সেজন্য নতুন বছরের জানুয়ারি মাসের পহেলা তারিখে সরকার বই উৎসবের ঘোষণা দিয়েছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা হলো সর্বজনীন অর্থাৎ বিনাখরচে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেজন্য আগে প্রতি বছরের শুরুতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক ক্লাসের ছাত্রদের বিনামূল্যে নতুন একসেট বই বিতরণ করা হতো, কিন্তু এখন তা আরো সমপ্রসারিত করে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলগুলোতে অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব স্কুলের সাথে যোগাযোগব্যবস্থা, প্রকৃত মনিটরিং, শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষকের সমানভাবে মনোযোগ না থাকা, সর্বোপরি শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য ও প্রাইভেট পড়ানোর প্রবণতার কারণে অল্পকতক স্কুলছাড়া বাকিগুলোতে মানসম্পন্ন লেখাপড়া হচ্ছে না। সেই সুযোগে শহরাঞ্চলে তো বটেই এমনকি এখন গ্রামাঞ্চলেও বিকল্প হিসেবে বেসরকারি পর্যায়ে হাজারো কিন্ডার গার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বই পড়ানো বাধ্যতামূলক। আর সেজন্যই সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে একই দিনে পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়ে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী শিশুদের ভালোবাসেন অত্যন্ত আন্তরিকভাবে। তাদের নিয়ে তিনি নিজেও খুবই সংবেদনশীল। তিনি জাতীয় শিশু দিবসসহ নানা আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। শিশুদের ভালো-মন্দ বোঝার চেষ্টা করে এক অনুষ্ঠানে অহেতুক শিশুদের বইয়ের বোঝা না বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। তা ছাড়া সরকারি স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন না করে সংশ্লিষ্ট স্কুলের এলাকাভিত্তিক মেধাক্রম ও কোটা বিবেচনায় ভর্তির পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ দেখা গেছে প্রতিবছরের শুরুতে স্কুলে ভর্তির জন্য কে কোন স্কুলে ভর্তি হবে, ভর্তির জন্য আবেদন করবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একটি হুলস্থূল কাণ্ড হয়ে যায়। অপরদিকে আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়- এখন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছে যাতে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষই লেখাপড়া শেষ করার জন্য যথেষ্ট। তিনি শিশুদের পাঠদান কর্মসূচিকে আনন্দময় করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সেহিসেবে বছরের প্রথম দিন তাদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া-অনেক আনন্দ ও গৌরবের ব্যাপার। বই বিতরণের বিষয়টিকে আনন্দময়, অর্থবহ ও সর্বজনীন করাই সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছা। তারই অংশ হিসেবে বই বিতরণের দিনে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেসব এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিশিষ্ট শিক্ষবিদের উপস্থিতিতে ওই উৎসব উদযাপন করা হয়েছে।
তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগে জানা যায়, পাঠ্যবই বের হওয়ার আগেই সেই বইয়ের গাইড বই বেরিয়ে পড়ছে। সে গাইড বইগুলোর আবার অনেক মূল্য। অভিভাবক মাত্রই মনে করেন যে, যদি তার ছেলেমেয়ের জন্য গাইড বই কিনে দেওয়া না যায়, তাহলে হয়তো সে পড়ালেখায় পিছিয়ে থাকবে। সেজন্য স্কুল থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে পাঠ্যবই পেলেও তাদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য পাঠ্যবই থেকে অধিকমূল্যে গাইড বই কিনতে হচ্ছে। তা ছাড়া প্রাইভেট পড়ানো কিংবা কোচিং সেন্টার তো রয়েছেই। এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে সবার ভিতর থেকে ব্যবসা মনোবৃত্তি দূর করতে হবে বলে শিক্ষাগবেষকরা মনে করেন। অপরদিকে উপবৃত্তির জন্য পাইলট প্রকল্প আস্তে আস্তে সারাদেশে সমপ্রসারিত করতে হবে।
সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়েই শিক্ষা কার্যক্রম আছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে নানা অভিযোগ সত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে যুগান্তকারী সাফল্য এসেছে। বিশেষ করে সংখ্যাগত দিক থেকে সাফল্য যুগান্তকারী। এখন বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জন করতে যা কিছু প্রয়োজন- আশা করি সরকার করবেন।

x