শিক্ষক সব সময় সম্মানের

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
66

শিক্ষকতা পেশায় সম্পৃক্ত থাকার জন্য সম্মান বোধ করছি। কতটুক শিক্ষক হতে পেরেছি তার মূল্যায়ন কেউ করলে হয়তো তলানিতে পড়ে থাকব। সে কথা ভিন্ন। আমাদের রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা বা প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা যখন নির্দিধায় নিবিড়ভাবে তাঁর ফেলে আসা স্মৃতি তাড়নায় স্কুল বা কলেজের প্রিয় শিক্ষক বা শিক্ষাগুরুকে সম্মান করে, সম্মান দেখায়, তখন নিজের ভিতর পুলক অনুভব করি। পুলকিত হই নিজের অজান্তে। বিচ্ছিন্ন সব দুঃখবোধ, ক্ষোভ, ক্লেদ নিমেষে মিলিয়ে যায় মনের সব কোনাকানি থেকে। সমাজ দেশটাকে খুব সুন্দর, খুব সার্থক মনে হয়। সরকারের একজন মাননীয় মন্ত্রী তাঁর প্রিয় শিক্ষককে কদমবুচি করেছেন, তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর সাথে কিছু সময় কাটিয়েছেন, তাঁর খোঁজ খবর নিয়েছে। এটা আহামরি কি? ভাবাই যায়। আরো ভাবা যায় এটি রাজনীতি কিনা।
ভাবনার জগৎ বিস্তৃত ও ব্যাপক। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সময়ে এ ব্যাপক ও বিস্তৃত জগৎ থেকে ভালোলাগা কিছু উপাদান সংগ্রহ করা গেলে ক্ষতি কি। অতীতে একজন তুখোড় সৎ কর্মঠ আমলাকে দেখেছিলাম তাঁর শিক্ষাগুরুকে কদমবুচি করে নিজে ব্যাপকভাবে সম্মানিত হতে। খুব ভালো লেগেছিল। ভারতের জাতীয় নেতা পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে দেখেছিলাম বিশ্ব কবির পায়ের কাছে বসে কথা বলতে। সর্বশেষ বাংলাদেশের স্বপ্নজয়ের অনিরুদ্ধ সারথি জনগনের নেত্রী শেখ হাসিনাকে দেখেছিলাম তাঁর প্রিয় শিক্ষক জীবন্ত কিংবদন্তী আনিস স্যারকে পরম শ্রদ্ধায় গায়ে শাল জড়িয়ে দিতে এবং নিজের জন্য পেতে রাখা লাল গালিচার বাইরে নিজে হেটে স্যারকে লালগালিচা দিয়ে হাটিয়ে পরম তৃপ্তি অনুভব করতে। বঙ্গবন্ধুকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে চ্যান্সেলর হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, ‘ওখানে আমাকে মানায় না, তোমরা আধ্যাপক ইউসুফ আলীকে নিয়ে যাও।’
‘আমরা অবক্ষয়ে জর্জরিত’-কথা শুনতে শুনতে, গুণতে গুণতে ভালোমন্দ বিবেচনার বোধ আমরা হারাতে বসেছি। এ জন্যেই কি আমাদের পুলক! চারিদিকে অবক্ষয়ের প্রতিযোগিতায় মানহীনতার ঘাটতি আমাদের দেহ মননকে আক্রান্ত করতে উদ্যত। সর্বক্ষেত্রেই অন্যকে, অন্যায়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মাতাল আমরা। মননশীলতার চরম দৈন্যতা আমাদের কখনও কখনও মানুষ থাকতে দিচ্ছে না। এ সংকটাবস্থা থেকে সর্বস্তরের শিক্ষক সমাজও বাইরে নয়। শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে, ব্যবসায়ী উপাদান-উপকরণ করে সমাজে যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তার সাথে শিক্ষক সমাজের একটি অংশের নিবিড় সম্পৃক্ততা চরম হতাশার। ছাত্রের সাথে শিক্ষকের যে সম্পর্ক, তার অর্থমূল্য বিবেচনায় নেয়া অন্যায়ের নয় শুধু অপরাধেরও। আমরা যখনই শিক্ষাকে পণ্য বিবেচনা করতে শুরু করেছি, তখন থেকেই আমাদের অপ্রাপ্তি শুরু হয়েছে মর্যাদার। শিক্ষক যখনই তার ছাত্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্নকে চাষকরা শুরু করেছে ভিন্ন পথ ও মত মাড়িয়ে, অবক্ষয়টা শুরু হয়েছে তখনই। এরই সুযোগে কোন কোন অর্বাচিন আমলা-রাজনীতিক শিক্ষকের হাত তার পায়ে লাগাতে বাধ্য করে দেশব্যাপী সমালোচিত হয়েছে। মর্যাদাটা এখন আমাদের হাতছাড়া। ওটা সংসার করছে আমলা, প্রশাসক, অপরাজনীতিকদের সাথে।
শিক্ষকদের অবক্ষয় এখন ডালপালা বিস্তার করেছে। একজন আদর্শ শিক্ষক দুটো জিনিস সবসময় মননে লালন করেন। প্রথমটি নিজেকে বারবার ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়টি শুধু শিক্ষার্থীর কাছে ছাড়া আর কারো কাছে পরাজয় না মানতে শেখা। আমাদের মনে রাখা দরকার, একজন শিক্ষককে সৃষ্টি করা যায় না। শিক্ষক সৃষ্টি হয়। মাটি, মানুষ এবং পরিবেশের শাশ্বত আবহ থেকে শিক্ষক সৃষ্টি হয়। প্রশিক্ষণ তাঁকে পদ্ধতিগত শাণ দেয়। শাণিত করে। তৈরি করে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকাল শিক্ষক তৈরি হয়। আমরা তৈরি হওয়া শিক্ষকদের সময়কালে অতিক্রম করছি।
শিক্ষক সমাজের বাতিঘর। সমাজকে আলো দেয়, আলোকিত করে। এ আলোর প্রভা যতো উজ্জ্বল হয়, সমাজ ততো বেশি সমৃদ্ধ হয়। শিক্ষক গুণী। শিক্ষকের আদর্শকে অন্তরে, অঙ্গে, মননে ধারন লালন করেই শিক্ষার্থী এগিয়ে চলার প্রেরণা-প্রেষণা পায়।
পাশ্চাত্যে আধুনিকতার উম্মেষের সাথে সাথে শিক্ষক ছাত্রের দূরত্ব কমতে থাকে। এর সুফল ছিলো, কুফলও কম ছিলো না। ওরা শিক্ষকের নাম ধরে ডাকে। বেশি ঘনিষ্ঠ হয়। কদমবুচির প্রশ্নতো আসেইনা, শুভেচ্ছা বিনিময়েও কৃত্তিমতায় পূর্ণ থাকে। আমাদের সংস্কৃতির ধরণ, প্রকৃতি, বোধ-সুগন্ধ আলাদা। আমরা সবাই ওদেরটা পছন্দ করিনা। ওরা আমাদেরটার প্রশংসা করে। আমাদের পারিবারিক সংহতি, সম্প্রতি সংশ্লিষ্টতায় ওরা আপ্লুত-আকৃষ্ট হয়। আমাদের সংস্কৃতি ওদেরগুলোর প্রভাবে হারিয়ে যাওয়ার আবহ তাই আমাদের জন্য কষ্টের। এটি রোধ করা অত্যাবশ্যক। অবক্ষয়ের বিস্তৃত বাজারে একজন রাজনীতিবিদ বা প্রশাসক যখন আদর্শ শিক্ষকের মতো কোন দৃশ্যমান ক্ষমতাহীন মানুষকে অন্তরের শ্রদ্ধা বা সম্মান জানায়, তখন আপ্লুত না হয়ে কি পারা যায় ? যায় না।
মনে পড়ে চট্টলবীর খ্যাত মরহুম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথা। আমরা যখন তাঁর কাছে যেতাম বিভিন্ন ইস্যুতে, তিনি সযত্নে পাশে বসাতেন। বিনয়ের সাথে কুশল জিজ্ঞেস করতেন। বারবার শ্রবণকটু ‘স্যার’ সম্বোধন করতেন। ঘরভর্তি লোকজন থাকতো। আমরা যারা কাছে বসার যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম তারা বেশি করে বিব্রতবোধ করতাম। শেষে একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন তিনি এতোবার স্যার বলেন।’ তিনি যে উত্তর দিলেন, তাতে মন-দিল উপচে গেল আনন্দে। সামনে উপস্থিত ছাত্রদের দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘স্যার এ প্রজন্মকে শিখাতে হবে শিক্ষকদের কিভাবে সম্মান করতে হয়। এরা বিপর্যয়ের খাদের কিনারায়। এরা একজন শিক্ষাগুরুর চেয়ে আমাদের বেশি সম্মান দেখাতে চায়। এটাকি ঠিক ?’ অবাক হলাম। তাঁর আন্তরিকতাপূর্ণ এ কথায় মনটা এমন ভাবে ভরে গেল যে, তাঁকে আর কখনও ভুলিনি। কখনও তাঁকে ভোলা যায় না। অনন্তকালের অমর তিনি। দেশের আবহে, আলো বাতাসে বিদ্যার্জন করেও, রাজনীতি করেও, সহপাঠি সহকর্মী রাজনীতিবিদদের ছাড়িয়ে তিনি আজ যে উচ্চতায় উঠে গেছেন, তা অতিক্রম করার জন্য অনেককে অনেকবার জন্ম নিতে হবে। আজ দেশে বিদেশে জ্ঞানার্জন করেও অনেকের ভিতর বিনয়ের দারুণ খরা। আহত মানসিকতা তাই শিক্ষকের প্রতি একজন মন্ত্রীর অবনত শিরের শ্রদ্ধা ও বিনয় দেখে আপ্লুত হয়।
অভিনন্দন মাননীয় মন্ত্রীকে। অভিনন্দন সংশ্লিষ্ট সকলকে, যারা শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে কিছু লিখে, কিছু বলে এখনও সমাজে তাড়নার ঢেউ তুলে তুলে আমাদের মননকে জাগিয়ে রাখার কাজটি নীরবে নিভৃতে করে যাচ্ছেন।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, কর্ণফুলী গবেষক।

x