শিক্ষকদের নৈতিক ব্যাপারটার দিকে জোর দিতে হবে

একান্ত সাক্ষাতকারে ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মু সিকান্দর খান

সাক্ষাতকার গ্রহণে : মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
29

শিক্ষার প্রতিটি স্তরে নৈতিকতার উপর জোর দেয়া উচিত বলে মনে করেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মু. সিকান্দর খান। দৈনিক আজাদীর সঙ্গে একান্ত তিনি বলেন, ‘শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষকে মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত করতে পারে মত সজ্জ্বিত করে তোলা। কারণ, অনেক লেখাপড়া জানার পরেও যদি কেউ অমানুষ থেকে যায় তাহলে সে লেখাপড়া সমাজের জন্য উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা করছেও। এগুলো ঠিক করবে কে? এখানে শিক্ষকদের নৈতিক ব্যাপারটার দিকে জোর দিতে হবে। নৈতিকভাবে দৃঢ়চেতা মানুষ তৈরি করতে হলে নৈতিক শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নৈতিক শিক্ষা মানে শুধু ধর্মচর্চা নয়। নৈতিক শিক্ষা হচ্ছে- আমি কোন মিথ্যা বলবো না, অন্যায় কিছু করবো না, কোথাও অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করবো ইত্যাদি। এখন দেখা যাচ্ছে, আমাদের সবাই সেগুলো করছে না। তাছাড়া আমরা যারা শিক্ষকমণ্ডলী তারা নৈতিকভাবে সজ্জ্বিত নয় শিক্ষার্থীদের পথ দেখানোর জন্য। সে জায়গায়ও উন্নতি করা প্রয়োজন।’
ড. মু. সিকান্দর খান আরো বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে এখন খুব বেশি রাজনীতি নিয়ে এসেছি। এবং সেটা সবকিছুকে প্রভাবিত করছে। কষ্টের কথা হচ্ছে, শিক্ষাটাকেও শেষ করে দিচ্ছে রাজনীতি। এখন দেখা যাচ্ছে শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এবং সবকিছুর মূলেই কিন্তু এ রাজনীতি। এখানে বলে রাখি, দেশে এখন সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন রাজনীতি। পেশা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের জন্য এটা প্রয়োজন। এভাবে রাজনীতিকে আকড়ে ধরতে পারলে দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। যা নৈতিকতার জায়গায় ধস নামাচ্ছে। এবং ধসটা থামানোর জন্য প্রস্তুতি নেই। সে প্রস্তুতি একেবারে রাজনীতির উপরের স্তর থেকে আসতে হবে। আমরা যত কথাই বলি না কেন রাজনীতি সব অঙ্গণকে প্রভাবিত করছে। বিদ্যার আসল যে উদ্দেশ্য বা সৎ মানুষ তৈরি করা সেটা রাজনীতির জন্য পারছে না।
তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গণগুলোকে রাজনীতি মুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে। রাজনীতিমুক্ত মানে এই না যে, ছাত্ররা নিজেদের ভালমন্দ চিন্তা করবে না বা তাদের সমস্যাগুলো সামনে আনবে না। অবশ্যই তারা সেগুলো সামনে আনবে। এবং সেটা ছাত্রদের প্রতিনিধি হয়ে আনবে। এখানে কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না আনার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মু. সিকান্দর খান আরো বলেন, শিক্ষা শিক্ষা বলে চিৎকার করলে হবে না। শিক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যারা মানুষ বা শিক্ষক আছেন তাদেরকে নৈতিকতার জায়গায় শক্ত হতে হবে। নৈতিকভাবে শক্ত করার উপায় কি? তার উপরে ভার না থাকা। সে বসবে তার মেধার জন্য এবং তার কর্মের জন্য।
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। যেখানেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলা হোক না কেন শিক্ষার্থীরা আসছেন। পণ্য কেনার জন্য আসছে। সার্টিফিকেট এখানে পণ্য। যখন পণ্য কেনার জন্য লোকজন আসবে তখন তো যে কেউ প্রতিষ্ঠান খুলবেই। সেখানে মান কতটা ঠিক রাখতে পারবে তা বিবেচনা করে না। এখানে বলতে হয়, আমরা সর্বস্তরে বিদ্যার প্রসার করছি এবং এটা ভাল দিক। কিন্তু বিদ্যার প্রসার করতে গিয়ে বিদ্যার নিজস্ব যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেটা যেন বিকৃত হয়ে না যায় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু এখন আমরা যে বিদ্যা বিক্রি করছি তার সবটুকু দেশের কাজে লাগছে না। তাই দেশের কাজে যেন লাগে এবং উপযুক্ত বিদ্যা যেন উৎপাদিত হয় সেটার ভার নেয়ার দায়িত্বও কিন্তু সরকারের।
তিনি বলেন, আমরা শিক্ষায় অঢেল ব্যবস্থা করে রেখেছি এবং এটার দরকার ছিল না। কোয়ালিটি মেইনটেইন করাটা বেশি দরকার ছিল। কিছু কিছু জায়গায় নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত যেটা এখন নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর অনুমতি দেয়া হচ্ছে। এটা এখন প্রকট হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষার স্তরকে তছনছ করে দিয়েছে।
বর্তমানে মেধাবী শিক্ষকের সংকট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাল ভাল শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে। যদি একশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দশটা ভাল হয় এবং সে দশটার মধ্যে দশ পার্সেন্ট শিক্ষার্থীও ভাল হয় এবং তারা যদি পড়াতে আসেন তাহলে সংকট থাকবে না। তাদের শিক্ষামুখী বা শিক্ষকতায় নিয়ে আসার জন্য তাদের উপযুক্ত পারিতোষিক দিতে হবে। ব্যাংকে চাকরি করে কেউ ৪০ হাজার টাকা পাচ্ছে। শিক্ষক যদি ৩০ হাজার টাকা পাই তাহলে সে হয়তো শিক্ষকতা করবে। কিন্তু তার ছোট ভাইকে তো এ পেশায় আসতে দিবে না তার পরিবার।
মু. সিকান্দর খান আরো বলেন, বর্তমানে অঢেল মানুষ এবং শিক্ষিত পাওয়া যায় বলে শিক্ষক সরবরাহে স্বল্পতা হয় না। এটা ঠিক প্রকৃত শিক্ষকের স্বল্পতা আছে। এখন যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় এবং যেভাবে আমরা উচ্চ শিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছি তাতে ভারসাম্য আর থাকছে না। এইক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় সেখানে দেখতে হবে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে কি না। তিনি বলেন, পাঠদানের ব্যাপারে বলবো, আমাদের যে শিক্ষকমণ্ডলী আছেন তারা উপযুক্তভাবে সজ্জ্বিত নন। এটা তাদের দোষও না। একজন অলস বসে আছে, সে দরখাস্ত করেছে। তাকে যাচাই-বাছাই না করে নেয়া হল এবং সেও গিয়ে কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছে। এটাকে বলে জোড়াতালি দিয়ে চালানো। এবং এভাবে হলে ভেতরে ফাঁপা থেকে যায়। এটা আমাদের থেকে যাচ্ছে। তাই আমাদের ছেলে-মেয়েরা জ্ঞানের দিক থেকে আসলে উপযুক্ত পরিমাণে সাহায্য পাচ্ছে না। এসব কারণে তারা দুর্বল ছাত্র বা দুর্বল ডিগ্রিধারী হয়ে যাচ্ছে।
উচ্চ শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা বেসরকারিভাবে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করছেন তাদেরকে শিক্ষার স্বার্থে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নাই। এখানে নৈতিকতার বড় ফাঁকি আছে। এ নৈতিকতার ফাঁকি সব জায়গায় অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে বা পাওয়া উচিত। এমন প্রশ্নে মু. সিকান্দর খান বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো ওভাবে সজ্জ্বিত না। তবে ১০ থেকে ১৫ পার্সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় অনেকগুলো শাখায় গবেষণা করাতে পারে। কিন্তু যে গবেষণা করবে, সে যদি দিনে চারটা-পাঁচটা ক্লাস নেয় তাহলে গবেষণা করার সময় কবে পাবে। লাইব্রেরি বা ল্যাব সজ্জ্বিত থাকলেও ওখানে ঢুকার সময় কয়? দ্বিতীয়ত, তাদের সিনিয়র শিক্ষকের অভাব। গবেষণা কর্মে নেতৃত্ব দেয়ার লোক সংখ্যায় কম। চট্টগ্রামে সরকারি স্কুলের সংকট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মত একটি বড় শহর, এখানে লোকসংখ্যার ভিত্তিতে কয়টা সরকারি স্কুল প্রয়োজন সেটা নির্ধারণ করতে হবে। সেভাবে হচ্ছে না। এখন বেসরকারি স্কুলগুলোকে সরকারিকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্টান তো পাঠদান করছেই। দরকার একেবারে নতুন নতুন সরকারি স্কুলের। এটাও ঠিক, কিছু পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গেছে সেগুলোকে সরকারি করা যায়। সুনামের সাথে কাজ করেছে এমন স্কুলগুলোর দৈন্যদশার কারণে সরকারিকরণের প্রয়োজন। কিন্তু এখন এমনিতেই ভাল হওয়ার পরেও অনেকগুলো স্কুলকে সরকারিকরণ করা হচ্ছে। সেটা না করে নতুন নতুন সরকারি স্কুল করা উচিত।

x