শিক্ষকদের দিয়েই পুনরুদ্ধারের শুরু

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ৩ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
86

৫ অক্টোবর পালিত হয়ে গেল বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘শিক্ষকদের দিয়েই পুনরুদ্ধারের শুরু’। নিঃসন্দেহে এই স্লোগান আমাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে। আমরা ভাবতে পারব যে, আমাদের দেশে আসলে শিক্ষকদের দিয়ে কিছু হবে। দেশে প্রায় ৫ লক্ষ শিক্ষক সরকারি বেসরকারি স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসায় কাজ করছে। নানা প্রতিকূলতা যাঁদের উপর সব সময় ভর করে আছে তার আরেক নাম শিক্ষক। দেশকে একটি সুন্দর ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য যাদের শ্রম সাধনা সরাদিন সারারাত তারাই অবহেলিত বঞ্চিত শিক্ষক। আমি আজ তাদের কথাই বলব, তাদের নিয়ে লেখব।
একথা একদম অস্বীকার করছি না যে, আমাদের শিক্ষকদের কোন উন্নতি হয়নি, হয়েছে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম ও স্বল্প। প্রবীণ ও দক্ষ শিক্ষকদের অধিকাংশই বিদায় নিয়েছেন আর মেধাবী তরুণ শিক্ষকরা এই পেশাকে স্বল্প সময়ের জন্য নিলেও তারা মূলত. সময়ে সরে পড়ছে। প্রবীণ শিক্ষকদের যে অভাব তা কে পূরণ করবে? এই প্রশ্নের যখন শুরু তখন একথা বলছি যে, এই অংশ ফাঁকা থাক। কারণ মেধাবী মানুষদের শিক্ষকতায় আনতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদী একটি পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনা তো চোখে পড়ছে না। ‘শিক্ষকদের দিয়েই পুনরুদ্ধারের শুরু’ এটি একটি আধুনিক, সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ বক্তব্য। কিন্ত এই বক্তব্যকে যথার্থভাবে কাজে লাগানোর জন্য সরকারের পরিকল্পনা কোথায়? আমি শিক্ষা বিষয়ে লেখালেখি ও পড়াশোনা করি যেখানে-এই বিষয়ে যা পাই তা একবার চোখ বুলানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কোথাও এর কোন কানাকড়িও দেখতে পেলাম না। হ্যাঁ একথা অস্বীকার করছি না যে, সরকার কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু হাজারো সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষকদের নিয়ে কোথাও এমন কিছু দেখছি না যা আমাকে অন্তত স্বপ্ন দেখাবে, আমি আশাবাদী হব। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে যে সকল পরিকল্পনা থাকা চাই তারও কোন বাস্তব পরিকল্পনা চোখে পড়ল না।
দেশের শিক্ষার অধিকাংশ অর্থাৎ ৯০ শতাংশ সেবা দিয়ে আসছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষকরা। তাদের খবর কোথায়, কে, কখন নেন আমার জানা নাই। যেখানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক মূল বেতনের প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান সেখানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাড়িভাড়া মাত্র ১০০ টাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ২টি উৎসব বোনাস পান মূল বেতনের সমান, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পান মূল স্কেলের ২৫ শতাংশ। এছাড়াও বেসরকারি বিদ্যালয়ে আছে প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক, যার ফলে একজন শিক্ষক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ ক্লাস করছেন। এছাড়াও রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যেকার নানামুখী সমস্যা ও অন্তহীন ঘাপলা। তাহলে এবারের শিক্ষক দিবসের বক্তব্যটি একটি অবাস্তব, কল্পনাপ্রসূত, উচ্চবিলাসী বক্তব্য বলে প্রমাণিত হবে না? বর্তমান সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অন্তত. কয়েক দফা বলেছেন, ‘শিক্ষকরা হলেন শিক্ষার নেয়ামক। তাঁদের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে। শিক্ষকদেরও নিবেদিত প্রাণ হিসাবে কাজ করতে হবে।’
শিক্ষামন্ত্রীর ৩টি বক্তব্যই ঠিক। তিনি শিক্ষার নেয়ামক হিসাবে শিক্ষকদের উপস্থাপন করেছেন, যা সঠিক। অপরদিকে এই নেয়ামক শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে তাদের যথার্থ সুযোগ সুবিধা দরকার এটাও ঠিক। সুযোগ সুবিধা পেলে তাদেরকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে এটা আরো ঠিক। সুতরাং এর বাস্তব প্রতিফলনটাই এখন খুব জরুরি। ‘শিক্ষকরাই জাতির মেরুদণ্ড’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে আমি শিক্ষাকে এভাবে বর্ণনা করেছিলাম, ‘শিক্ষা হল সমাজবদ্ধ মানবতার বীজ বপনের বুদ্ধিদীপ্ত হাতিয়ার।’
একটি ভাল বীজ কেবল মাত্র একটি ভাল ফসল উৎপাদন করতে পারে। আর বীজকে গাছ এবং ফসলে পরিণত করতে পারে একজন শিক্ষক। শিক্ষকরা পারে অনাবাদি জমিতে আবাদ সৃষ্টি করতে, অফসলী গাছে ফসল ফলাতে। সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন কেবল শিক্ষাতেই সম্ভব। শিক্ষাকে বাদ দিয়ে সমাজে সার্বিক উন্নয়নের যে চিন্তা যেখানেই হয়েছে সেখানেই সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অবক্ষয়ে ঝরে পড়া সমাজ, অসুন্দরে লিপ্ত পৃথিবীকে শিল্পীর মন ও মানস দিয়ে একমাত্র শিক্ষরাই যুগে যুগে উন্নত করেছে। তাই শিক্ষকদের মধ্যে থাকা দরকার আধুনিকতা, নান্দনিকতা, নতুন চিন্তা শক্তি ও মঙ্গলের কথা। আজকাল এখানেই যত সমস্যা। শিক্ষকদের কাছে আজ জ্ঞান বিতরণের চেয়ে অর্থ উপার্জরের দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও দেশের উন্নতির আগে নিজের উন্নতির কথাই বেশি ভাবতে হচ্ছে। কারণ তারাও অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতই জীবন যাপন করতে অভ্যস্থ। তাদের অন্য গ্রহের মানুষ মনে করার যে প্রবণতা তাও সরকার ও সমাজকে ভাবতে হবে।
জাতির মেরুদণ্ড নিয়ে নানা আলোচনা দীর্ঘদিন শুনে আসছি। আজ আমি বলছি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এই কথাটি যথার্থ নয়। প্রকৃত অর্থে ‘শিক্ষকরাই’ জাতির মেরুদণ্ড এই কথাটি যথার্থ, সময়োপযোগী ও ন্যায় সঙ্গত। তবে প্রশ্ন কোন শিক্ষক ? অবশ্যই আদর্শ শিক্ষক। একজন আদর্শ শিক্ষক কেমন হবেন- তাঁর কি কি গুণাবলী থাকবে- তিনি দেখতে কেমন হবেন নানা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তিনি ছাত্রদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করবেন-তার মন মানস দিয়ে। শিক্ষার্থীর প্রতিভা জাগ্রত করার এই মহান কাজটি শুধু তিনিই করতে পারেন যিনি শিল্পী। শিল্পীর মন ও মানস না থাকলে কখনও এই কাজটি করা সম্ভব নয়। অথচ শিক্ষককে বলা হয় ‘কারিগর’। একজন কারিগর আর একজন শিল্পীর তফাৎ বুঝার সময় এসে গেছে। শিক্ষক কারিগর এই কথা সনাতন। শিক্ষকরা শিল্পী এই কথাই যথার্থ-যুপোযোগী। আর শিল্পীকে যথার্থভাবে ভরণ পোষণ করতে হবে, বাঁচতে হবে, সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে তাকে চলতে হবে তাহলে কেবল বক্তব্যটি সঠিক হবে।
জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষা হলেও আজ যাদের দিয়ে মেরুদণ্ড ঠিক করার কথা তারা অবহেলিত, বঞ্চিত। স্বাধীনতার এতটা সময় পার হলেও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার মুখ আমরা যেমন দেখিনি তেমনি আবার শিক্ষকদের প্রতিও রয়েছে হাজার বঞ্চনা। অথচ ‘পরিতুষ্ট শিক্ষকের ওপর শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ নির্ভরশীল।’ মনে রাখতে হবে প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে যারা শ্রেণি কক্ষে পড়াতে যাবে তাদেরও বেঁচে থাকতে হবে। তাই এই বিষয়টির এখানে শেষ হলে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের জন্য তো বটে তবে জাতির জন্য আরো বেশি মঙ্গল। গত পর্বে ‘জাতির মেরুদণ্ড’ এবং ‘কারিগর’ নিয়ে যে ভ্রিভান্তি রয়েছে তার দূর করার চেষ্টা করলাম। মনে রাখতে হবে শিক্ষকরাই পারেন সমাজকে বদলে দিতে কারণ এই কাজটি তাদেরই। আর তা করবে সরকার।
১৯৯৫ সাল আমি তখন অনার্স ক্লাসের ছাত্র। পত্রিকার পাতায় দেখলাম আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের মর্যাদানের জন্য বিশ্বব্যাপী আজকের দিনে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে গত ১৯৯৪ সাল থেকে। পত্রিকার এই লাইটি আমাকে শিক্ষক হতে উৎসাহিত করল, আমার কাছে মনে হল শিক্ষকদের সম্মান অনেক বেশি। আমি ভাবলাম বিশ্ব মা দিবস, শিশু দিবস, জাতিসংঘ দিবসসহ নানা দিবস পালিত হচ্ছে। আমি যদি আমলা, ব্যাংকার বা সরকারি অন্য কোন চাকুরীজীবী বা ব্যবসায়ী হই তো আমার কর্মের কোন বিশ্ব দিবস থাকবে না, শ্রদ্ধাবোধ থাকবে না। কিন্তু শিক্ষক হলে অন্তত এই একটি দিনতো সম্মানের জন্য থাকবে, আমার কর্মের স্বীকৃতি নিয়ে অন্তত একদিন হলেও দিবস পালিত হবে এই বোধ থেকে সম্মান পাওয়ার জন্যই আমি শিক্ষকতাকে পেশা হিসবে নিয়েছি। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও উদ্যোক্তা হিসাবে ২০০৯ সালে আমি স্বীকৃতিও পেয়েছি। আর জীবনে কি পেয়েছি, আর কি পাইনি এটা জানি না। জীবনের হিসাবে তা কোনদিন যোগও করিনি তবে আমি হতাশ নই। আমার অনেক ছাত্র আছে, অভিভাবক ও হিতাকাঙ্ক্ষী আছে তারা তো আমাকে ভাল হিসাবে জানে এটি আমার জীবনের জন্য কম পাওয়া নয়। শিক্ষক হিসাবে এখানেই সফলতা।
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)

x