শিক্ষকদের অবস্থান শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে

শনিবার , ৫ অক্টোবর, ২০১৯ at ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
49

উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শিক্ষা। আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে টেকসই উন্নয়নের পথে পরিচালিত করে শিক্ষিতরাই। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে টিকিয়ে রাখতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈষম্যহীনভাবে পরিচালিত করা। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা পত্রের ২৬ ধারায় বলা হয়েছে ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক হবে’। প্রচলিত ধারণা এই যে, শিক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ওই ধারণাটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে যথাযথভাবে স্বীকৃত নয়। এসব দেশের নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মতো মানবাধিকার থেকে নানাভাবে বঞ্চিত করা হয়।
তবে শিক্ষার লক্ষ্য ও আদর্শকে নিজ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে পারলে আন্তর্জাতিকতাবাদ তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের মানবতা ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে হবে। পাওলো ফ্রেইরি বলেন, লিটারেসি ইজ নট রিডিং দ্য ওয়ার্ড, ইট ইজ রিডিং দ্য ওয়ার্ল্ড। সুতরাং শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্ব নাগরিক গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে এই শিক্ষাকে যারা এগিয়ে নিয়ে যান, তাঁরা হলেন শিক্ষক। আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালের এই দিনে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আন্তঃসরকার সম্মেলনে আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠনগুলো এবং জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অব এডুকেশনের যৌথ উদ্যোগে শিক্ষকদের পদমর্যাদা সংক্রান্ত এক সুপারিশমালা গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা উপলব্ধি করেন শিক্ষকেরা যেন শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে পাঠদান করতে পারেন এবং তাঁরা যেন আত্মমর্যাদার সঙ্গে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতেই এই সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সেই সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যরা ও সংস্থাগুলো কিছু সুপারিশ পেশ করেন। গৃহীত সেই সুপারিশমালা প্রতিপালনে সকল সদস্য ও সংস্থা দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং সেগুলো যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারেও পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে সমাজে শিক্ষকের আসন মর্যাদা ও সম্মানের। ছাত্রের মনের সুপ্ত প্রতিভা জাগানো, জ্ঞানের আলোয় তাদের অন্তর আলোকিত করা, তাদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মহান দায়িত্ব শিক্ষকের। তাই শিক্ষকতা নেহায়েত চাকরি নয়, একটি মিশন। এটি একটি মহান পেশা। ছাত্রদের যথাযথ মান এবং মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা বহুলাংশে শিক্ষকের ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। সেদিক থেকে শিক্ষকের অবস্থান শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতেই। অন্যদিকে, শিক্ষকের মহৎ সাহচর্য, নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে ছাত্রছাত্রীরা প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত করে। নিজের জীবন বিকাশ, সদগুণাবলী অর্জন এবং ব্যক্তিত্বের জাগরণ শিক্ষকের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ ও সম্পর্কের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। বলা হয়ে থাকে, শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষকরা হচ্ছেন জ্ঞানের আলো। শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল জাগানো ও কৌতূহল নিবৃত্ত করা শিক্ষকের কাজ। তবে দুঃখের বিষয়, সেই মহান শিক্ষকেরা এখনো উপেক্ষিত। আন্তর্জাতিক মৌলিক মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার লংঘন করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় শর্ত ও অঙ্গীকার উপেক্ষা করে এখনো শিক্ষকদের নির্যাতিত, নিপীড়িত হতে দেখা যায়। ‘শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদা সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া ইউনেস্কো, আইএলও এবং বিশ্ব শিক্ষক সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে গৃহীত সনদের উল্লিখিত ধারার একটি। আজকের এদিনে আমাদের প্রত্যাশা- শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের জন্য যেমন আমাদের অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে, তেমনি শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতেও আমাদের হতে হবে সচেষ্ট। শিক্ষকেরা যাতে কোন অবস্থাতেই নিপীড়ন ও অপমানের শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

x