শিকারীদের উৎপাতে বিপন্ন বুনো তিতির

সমির মল্লিক : খাগড়াছড়ি

সোমবার , ৭ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৩:৪৩ পূর্বাহ্ণ
190

পাহাড়, গভীর বন, ঝিরি, জলপ্রপাত আর সবুজ উপত্যকা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিস্তৃত এই বৃহত্তর সবুজ অরণ্যে একসময় নানা প্রাণীর বিচরণ ছিল। অতীতে এখানে বুনো তিতির, ভাল্লুক, সাম্বার হরিণ, হাতি, বন মোরগ, শিয়াল, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণী ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর ও অগভীর অরণ্যে । কিন্তু্তু ক্রমাগত বন ধ্বংস ,বৃক্ষ নিধন এবং জুম চাষের জন্য পাহাড় পোড়ানোর কারণে ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে অনেক বনের পশু পাখি। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন পাবলাখালী অভয়ারণ্যে একসময় সাম্বারহরিণ, গন্ডার, হাতি, বানরসহ বিভিন্ন পশু থাকলেও এখন কেবল দেখা মেলে বানর আর বুনো হাতির ।
বন্য প্রাণী বিলুপ্তির জন্য শুধু বন ধ্বংস আর জুমের আগুনই দায়ী নয় বরং বাজারের চড়া মূল্যের কারণে শিকারীরা বন থেকে পশু শিকার করা এর জন্য দায়ী। শিকারীদের উৎপাতের কারনে আশংকাজনকভাবে খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে মানুষের খাদ্য তালিকায় থাকা বন্য প্রাণীগুলো শিকার করছে শিকারীরা। বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়ের গভীর অরণ্যেরবাঘ, ভাল্লুক, হাতি, গয়াল, সাম্বার হরিণ হারিয়ে গেলেও সজারু, হরিণ, বনমোরগসহ প্রভৃতি বন্য প্রাণী জঙ্গলে টিকে আছে ।
তবে শিকারীদের উৎপাতে দিন দিন বিপন্ন হচ্ছে বুনো তিতির। পাহাড়ের হাটে প্রকাশ্যে চলছে এসব বন্য প্রাণীর বিকিকিনি। বন্য প্রাণী বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলে বন বিভাগের উদাসীনতার কারণে শিকারীরা দেদারছে বন্যপ্রাণী শিকার ও বিক্রি করছে। বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ির সদর হাটে বুনো তিতির বিক্রি করতে আসে এক শিকারী। তিনি জানান, ‘অনেক গভীর জঙ্গল থেকে এক জোড়া বুনো তিতির শিকার করেন তিনি। বাজারে নিয়ে তিতির দুইটি প্রায় ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেন তিনি।’ মাংস সুস্বাদু হওয়ায় শিকারীরা বুনো তিতির শিকার করে। এছাড়া খাগড়াছড়ির শহরের মধুপুর বাজার,স্বনির্ভর,মাটিরাঙ্গা,দিঘীনালা,মাচালং সহ বিভিন্ন হাটে প্রকাশ্যে বিক্রি হয় বন্যপ্রাণী ও বন্যপ্রাণীর মাংস। স্থানীয়রা বলেন, এক সময় হরিনসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী থেকে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় প্রাণীজ আমিষের অভাব পূরণ হত । কিন্তু বর্তমানে বাজারের সাথে স্থানীয়দের যোগাযোগ স্থাপিত হ্‌ওয়ায় হরিণ, বুনো তিতির, বনমোরগ শিকার করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। অনেকে শিকার করাকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে নিয়েছে ।
কালো তিতির বনে থাকে। এরা মূলত: ভূচর পাখি। প্রতিটির ওজন প্রায় ১ কেজি পর্যন্ত হয়। এদের দৈর্ঘ্য ৩৪ সেমি। এরা দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ায়। বুনো তিতির পুরুষ ও স্ত্রী চেহারা আলাদা। তিতিরের রঙ ঘন কালচে। পুরুষ তিতির পিঠে ছোপ ছোপ সাদা রঙ থাকে। এদের ঝুটি লালচে।
কালো তিতির ঘন ঝোপের পাহাড়ে বিচরণ করে বেশি। শিকারীরা গভীর জঙ্গলে ফাঁদ পেতে এদের শিকার করে। এরা সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়ায়।শিকারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এরা পালকের সাহায্যে উড়ে বেড়ায়। শিকারীদের উৎপাতের কারণে কমে যাচ্ছে বুনো তিতিরের প্রজনন। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এদের প্রজনন মৌসুম। স্ত্রী তিতির ডিম দেওয়ার পর ১৮-২০ দিন পর ফুটে বাচ্চা জন্মায়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় হরিণ, বনমোরগ,বানরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী সংরক্ষণ খুব জরুরি। তা না হলে একদিন প্রাণী শূন্য হবে পার্বত্য অঞ্চল। পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িতরা বলেন, ‘মানুষের রুচির পরিবর্তন হলে বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ হবে না, একই সাথে বন্যপ্রানী রক্ষা ও বন্য প্রাণী শিকার নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে ।

x